আল্লাহ্‌র স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

যাহারা বিশ্বাস করে এবং আলাহর স্মরণে যাহাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জানিয়া রাখ, আলাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।

— সুরা রা’দ, আয়াত ২৮

ব্যাখ্যাঃ

‘যারা বিশ্বাস করে এবং আলাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়’ একথার অর্থ- আলাহ অভিমুখী যারা, তাদের চিত্তে (কলবে) বিশ্বাস দৃঢ়বদ্ধ হয়। সকল সন্দেহের অবসান ঘটে এবং আলাহর স্মরণে তাদের হৃদয় হয় পরিতৃপ্ত ।

এখানে ‘জিকির’ অর্থ কোরআন মজিদ এবং ‘ইত্মিনান’ অর্থ ইমান। উল্লেখ্য, অপবিত্রতা ও অপবিশ্বাস হচ্ছে হৃদয়ের অস্বস্তি ও চাঞ্চল্য। আর হৃদয়ের প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তি হচ্ছে ইমান। অথবা আল্লাহর স্মরণে চিত্ত প্রশান্ত- হয় কথাটির অর্থ হবে আলাহর জিকির দ্বারা হৃদয় থেকে দূরীভূত হয় শয়তানের প্ররোচনা। এমতাবস্থায় জিকিরের অর্থ হবে আল্লাহর স্মরণ।

রসুলেপাক স. বলেছেন, মানুষের অন্তঃকরণে (ক্বলবে) রয়েছে দুটি প্রকোষ্ঠ। একটিতে থাকে ফেরেশতা এবং অপরটিতে থাকে শয়তান। অন্তরে জিকির উত্থিত হলে শয়তান পালিয়ে যায়। আর জিকির না থাকলে শয়তান ক্বলবে অনুপ্রবেশ করিয়ে দেয় তার চিন্ত। এভাবেই সে মানুষকে প্ররোচিত করে।

‘মুনসিফ’ গ্রন্থে হজরত আবদুলাহ ইবনে শাকীক থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইবনে শায়বা এবং হজরত ইবনে আব্বাস থেকে মারফুরূপে প্রলম্বিত সূত্র সহযোগে বর্ণনা করেছেন বোখারী।

হজরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় এসেছে, শয়তান দলিত মথিত করতে থাকে মানুষের অন্তর। সে যখন জিকিরে রত হয়, তখন শয়তান পশ্চাদপসরণ করে, আর অমনোযোগী হলে অন্তরে ঢেলে দেয় কুমন্ত্রণা । আলোচ্য বাক্যের মর্ম এরকমও হতে পারে যে, আলাহর জিকিরে চিত্ত প্রশান্ত হয়- যেমন সলিলাভ্যন্তরে প্রশান্তি লাভ করে মৎস্য, উন্মুক্ত আকাশে বিহঙ্গ এবং অরণ্যে অরণ্যবাসীরা। পক্ষান্তরে জিকির বিস্মৃত অন্তরে সৃষ্টি হয় অশান্তি, যেমন অশান্তি ভোগ করে পানির সাথে সম্পর্কচ্যত মাছ। পানিতে নিমজ্জিত স্থলচর প্রাণী এবং পিঞ্জিরায় আবদ্ধ পাখি। এই বিষয়টি সুফী সাধকগণের অনুসারীদের নিকটে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সত্যনিষ্ঠ পীর-মোর্শেদগণের খানকায় গমনকারীরা এর প্রত্যক্ষদর্শী। অতএব এখানে ‘যারা বিশ্বাস করে’ কথাটির মর্মার্থ হবে ওই সকল সুফী দরবেশ, যাদের অন্তর পবিত্র ও জিকিরময়।

‘জেনে রেখো, আলাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়’ কথাটির অর্থ- পবিত্র হৃদয় বিশিষ্ট যাঁরা, তাঁদের চিত্ত প্রশান্ত হয় আলাহর স্মরণে। এ সম্পর্কে একটি সন্দেহ ও তার নিরসনের উলেখ করেছেন বাগবী। সন্দেহটি এরকম- এক আয়াতে (সুরা আনফাল, আয়াত ২) বলা হয়েছে ‘বিশ্বাসবান তারাই, আলাহর জিকির করা হলে যাদের হৃদয় আল্লাহর ভয়ে কম্পমান হয়’। আর এখানে বলা হলো ‘আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়’ এখন প্রশ্ন হলো ভয় ও প্রশান্তির সহঅবস্থান কি সম্ভব?

এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারে, শাস্তির বিষয় উলেখ করা হলে বিশ্বাসীদের অন্তরে জেগে ওঠে শংকা। আর আলাহর অপার করুণা ও ক্ষমার কথা মনে হলে অন্তরে আগমন করে প্রশান্তি। ভয় ও প্রশান্তি পরস্পরবিরোধী দুটো বিষয়। তাই এ দুটো একই সঙ্গে হৃদয়ে অবস্থান করতে পারে না। একটি এলে অপরটি অপসারিত হয়। আমি বলি, প্রশান্তি ও ভীতির মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো বৈপরীত্য নেই। প্রশান্তি সৃষ্টি হয় ‘উনস’ বা অনুরাগ থেকে। আর অনুরাগ বর্তমান থাকে ভয়ের সময়েও। এভাবে একই সঙ্গে হৃদয়ে সঞ্চারিত হতে থাকে ভয় ও আশা।


হজরত আনাস বর্ণনা করেছেন, অন্তিম যাত্রা কালে এক যুবকের শয্যাপাশে উপস্থিত হলেন রসুলেপাক স.। বললেন, তোমার মনের অবস্থা এখন কেমন?

যুবক বললো, আমি আলাহর ক্ষমার আশা রাখি আবার তাঁর ভয়ে আমি ভীতও। তিনি স. বললেন, পৃথিবী পরিত্যাগের প্রাক্কালে যার অন্তরের অবস্থা এরূপ হয়, আল্লাহ্‌ তাকে দান করেন তার কাম্যবস্তু এবং রক্ষা করেন ভয়ভীতি থেকে।

— তিরমিজি, ইবনে মাজা

তথ্যসূত্র

  • আল্লাহ্‌র জিকির (লেখকঃ মুহাম্মাদ মামুনুর রশীদ)