আল হিদায়া

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
আল হিদায়া বই ডাউনলোড করুন

ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের জগতে, বিশেষতঃ হানাফি ফিকাহ্‌র পরিমণ্ডলে আল-হিদায়া একটি মৌলিক ও বুনিয়াদি গ্রন্থ । এক কথায় এ মহাগ্রন্থকে হানাফী ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের বিশ্বকোষ বলা যায় । বস্তুতঃ সুদীর্ঘ অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহতভাবে এ মহাগ্রন্থ ইসলামী ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের হানাফী মাজহাবের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে । এমন কি পাক-ভারত উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনকালেও বিচার বিভাগে আল-হিদায়াকে সিদ্ধান্তমূলক গ্রন্থের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে । পৃথিবীর বহু প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আল-হিদায়ার ইংরেজি অনুবাদ অতি গুরুত্বের সাথে পড়ানো হয়ে থাকে । এ গ্রন্থ প্রকাশিত হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের বিদ্যাঙ্গনে আল-হিদায়া আবশ্য-পাঠ্য গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত রয়েছে । এ মহাগ্রন্থকে কেন্দ্র করে ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের উপর এ পর্যন্ত যত গবেষণা কর্ম সম্পন্ন হয়েছে এবং যত ব্যাখ্যা, ভাষ্য, টীকা ও পর্যালোচনা গ্রন্থ রচিত হয়েছে তা অন্য কোন ফিকাহ্‌ গ্রন্থের ক্ষেত্রে হয় নি ।

গবেষক ও আধ্যাত্নিক সূক্ষ্মদর্শী আলিমগণ আল-হিদায়ার এ অসাধারণ জন-প্রিয়তার দু'টি কারন উল্লেখ করেছেন । প্রথমতঃ কিতাবের নিজস্ব গুণ ও বৈশিষ্ট্য । সাহিবুল হিদায়া নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, হানাফী ফিকাহ্‌র 'মতন' (বা মূলগ্রন্থ) গুলোর মাঝে প্রামাণ্যতা, ব্যাপকতা, সার্বিকতা ও সুসংক্ষিপ্ততার দিক থেকে مختصر القدورى এবং الجمع الصغير ছিল শীর্ষস্থানীয় । তাই তিনি এদুটোকে সামনে রেখে بداية المبتدى নামে একটি متن (বা মূল গ্রন্থ) সঙ্কলন করেছন । ফলে তাতে দু’টি মূল গ্রন্থের যাবতীয় গুন ও পূর্নতার সমাবেশ ঘটেছে । এরপর তিনি প্রায় আশি খন্ডে উক্ত মূল গ্রন্থটি সুবিশদ ও সুবিস্তৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রণয়ন করেন । كفاية المنتهى নামক এই সুবিশাল ব্যাখ্যা গ্রন্থে তিনি ইসলামী ফিকাহ্‌ -ভাণ্ডারের যাবতীয় গবেষণালব্ধ ও ইজতিহাদভিত্তিক আলোচনার অবতারণা করেন । এই সুবিশাল গ্রন্থ বর্তমানে যদিও বিলুপ্ত কিন্তু তাঁর সম-সাময়িক যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ্‌গণ অতি উচ্ছ্বাসিত ভাষায় এর আশি খণ্ডের এই সুবিশাল গ্রন্থের মহাসমুদ্রের নির্যাস নিয়ে তিনি সঙ্কখিপ্ত কলেবরে চার খণ্ডের এ গ্রন্থখানি সঙ্কলিত করেছেন । এখানিই এখন উম্মতের সম্মুখে আল-হিদায়া নামে বিদ্যমান । চার খণ্ডের এ আল-হিদায়া প্রণয়নে তিনি সুদীর্ঘ তের বছর ব্যয় করেছেন; তিনি এর রচনায় কী অসাধারণ সাধনা করেছেন, এতেই তা প্রতীয়মান হয় । যার অমর ফসল রূপে আল-হিদায়ার মত মহামূল্য ‘হাদিয়া’ উম্মতের সম্মুখে উপস্থাপিত । তাছাড়া ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের জগতে আল-হিদায়া হচ্ছে একমাত্র ব্যাখ্যা গ্রন্থ যেখানে পক্ষ-বিপক্ষ প্রত্যেক ইমামের প্রতিটি মাসআলার সমর্থনে دلاءل عقلية অর্থাৎ উৎস-ভিত্তিক প্রমাণের পাশাপাশি دلاءل نقلية অর্থাৎ যুক্তিগত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে । এবং তাতে এর যাবতীয় সূত্র ও পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে । ফলে স্বাভাবিক কারনেই কিতাবখানি সকল মহলে গ্রহণযোগ্য হয়েছে । এ প্রসঙ্গে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ্‌ কাশ্মীরী (রহঃ) এর একটি মন্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে । তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, আল-হিদায়ার বিশ্ববিখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল কাদীরের মত উঁচুমানের কিতাব রচনা তাঁর পক্ষে সম্ভব কিনা । তিনি বললেন, খুবই সম্ভব । পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হলো, আল-হিদায়ার মত কোন কিতাব লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব কিনা । তিনি পরিষ্কার ভাষায় জবাব দিলেন, আমার পক্ষে এর এক ছত্র লেখাও সম্ভবপর নয়

বলাবাহুল্য যে, যুগশ্রেষ্ঠ ইমামের এ মন্তব্য মোটেই অতিশয়োক্তি নয়, বরং এ ছিলো এ গ্রন্থের যথার্থ মূল্যায়ন।

দ্বিতীয় যে কারণটি আলিম, ফকিহ্‌ ও বিদগ্ধ সমাজে বহু শতাব্দীব্যাপী অনন্য সাধারন জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতা এনে দিয়েছে তা হলো গ্রন্থকারের অনন্য সাধারণ ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহ প্রেমে পূর্ন আত্ননিবেদন । একটি মাত্র ঘটনা থেকে সাহিবুল-হিদায়ার জীবনের এই অত্যুজ্জ্বল দিক সম্পর্কে ধারনা করা যেতে পারে ।

আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী (রহঃ) বলেন, আল-হিদায়া কিতাবের মাকবূলিয়াত ও সর্বস্বীকৃতির গূঢ়-রহস্য এই যে, সুদীর্ঘ তের বছর তিনি বিরতিহীন সিয়াম পালনে রত থেকে এ গ্রন্থ রচনায় নিমগ্ন ছিলেন । তাছাড়া তিনি তার সিয়াম পালন এমনভাবে গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন যাতে তার নিজস্ব খাদিমও তা জানতে না পারে । খাদিম যখন খানা নিয়ে আসতো তখন তিনি বলতেন, রেখে যাও । পরে কোন তালিবুল ইল্‌ম, মুসাফির কিংবা আশে-পাশের কোন ফকির মিসকীনকে ডেকে সে খাবার দিতেন । খাদিম যথা সময়ে ফিরে এসে শূন্য বর্তন নিয়ে যেতো এবং ভাবতো যে, তিনি খেয়ে নিয়েছেন ।

এই হলো সলফে সালেহীন এবং বর্তমান যুগের লেখক গবেষক ও পন্ডিতদের মধ্যে পার্থক্য । আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নদভী এ গূঢ় রহস্য এ বলে ব্যক্ত করেছেনঃ কী যেন একটা তাদের মধ্যে ছিলো আর কী যেন একটা আমাদের মাঝে নাই

আল হিদায়া সম্পর্কে অজ্ঞতা বশতঃ এরুপ সমালোচনা করা হয় যে, সাহিবুল হিদায়া হানাফী মাযহাবের পক্ষে প্রমাণরুপে পেশকৃত হাদীছের মধ্যে দূর্বল হাদিছও রয়েছে । এতে মনে হয়, হাদীছ শাস্ত্রে তার গভীর জ্ঞানের অভাব ছিল । এই অভিযোগের উত্তরে হাদীছ শাস্ত্রের বহু ইমাম আল-হিদায়ার হাদীছসমূহের ‘তাখরীজ’ বিষয়ক বিভিন্ন মূল্যবান গবেষনাগ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন এবং মূল সূত্র ও উৎস উল্লেখ করে প্রতিটি হাদিছের প্রামাণিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরেছেন ।