ইবনে যিয়াদের নিষ্ঠুর আচরণ

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
কারবালার ইতিহাস



























  • ইবনে যিয়াদের নিষ্ঠুর আচরণ




রাত অতিবাহিত হওয়ার পর সকাল হলো। ইবনে যিয়াদ সভাগৃহে আগমন করল এবং তাকে কারবালার তথাকথিত বিজয় সম্পর্কে অবহিত করল। হাওলা বিন ইয়াযীদ হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর মস্তক মুবারক নিয়ে একটা পাত্রের উপর রেখে তা ইবনে জিয়াদের সামনে রাখল। তখন ইবনে যিয়াদের হাতে একটি ছড়ি ছিল। সে ছড়ির মাথা হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর ঠোঁট মুবারকের উপর লাগাল এবং দাঁত মুবারকের সাথে ঘষতে লাগল। সেই সময় তার সভাগৃহে নবী পাক (সঃ)এর একজন বৃদ্ধ ছাহাবী হযরত যায়িদ বিন হাসান (রাঃ) উপস্থিত ছিলেন। তিনি এ বেয়াদবী দেখে কেঁদে ফেললেন এবং বলে উঠলেন, ‘হে ইবনে যিয়াদ! যে ঠোঁট এবং দাঁত মুবারকের উপর তুমি আঘাত হানছো, খোদার কছম করে বলছি- আমি স্বয়ং দেখেছি, সে দাঁত ও ঠোঁট মুবারকের উপর নবী করীম (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুমু দিতেন। আর আজ তুমি সে ঠোঁট এবং দাঁত মুবারকের সাথে বেয়াদবী করছ?’ ভর মজলিসে এ কথাগুলো বলার কারণে ইবনে যিয়াদ খুবই রাগান্বিত হল এবং বলল, এ বৃদ্ধকে এখান থেকে বের করে দাও। বৃদ্ধ না হলে আমি এ মুহূর্তে গর্দান দ্বিখন্ডিত করে ফেলতাম। হযরত যায়িদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, ‘তোমার জন্য আফসুস! তুমি আমাকে বৃদ্ধ হিসেবে সহানুভূতি দেখালে, কিন্তু রসূলুল্লাহ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর শরাফতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলে না! আমি বৃদ্ধ বলে তুমি আমাকে রেহাই দিলে, কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) নবী পাক (সঃ)এর কলিজার টুকরা ও দৌহিত্র হওয়া সত্ত্বেও কোন সমীহ করলে না!’ উনার কথার প্রতি কোনরূপ কর্ণপাত না করে ইবনে জিয়াদের অনুচরেরা তাঁকে বেত্রাঘাত করে দরবার থেকে বের করে দিল। (নাঊযুবিল্লাহ)

ইবনে যিয়াদ দরবারে দাঁড়িয়ে কয়েকটি দাম্ভিকতাপূর্ণ কথা বলল। যেমন- ‘সব প্রশংসা সেই আল্লাহ’র জন্যে, যিনি দুশমনকে নাজেহাল করেছেন, নাঊযুবিল্লাহ! যিনি দুশমনকে পরাজিত করেছেন, নাঊযুবিল্লাহ! এবং ইবনে যিয়াদকে বিজয় দান করেছেন, নাঊযুবিল্লাহ! এ ধরনের কথা সে বলছিল। সেই সময় খায়বর বিজয়ী বীরের কন্যা হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম সেখানে কয়েদী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠলেন- ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ পাক উনার জন্যে, যিনি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক (ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম)এর বংশধর হওয়ার কারণে আমাদের সম্মানিত করেছেন। আর যিনি আমাদের সম্পর্কে আয়াতে কারীমা নাযিল করেছেন এবং আমাদের পূত-পবিত্রতার কথা ঘোষণা করেছেন।’ ইবনে যিয়াদ বলে উঠল, তুমি কি এখনও সেই কথা বলছো! তুমি কি দেখনি তোমার ভাইয়ের কি পরিণতি হয়েছে? হযরত যয়নাব (রাঃ) কেঁদে দিলেন এবং কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘হে ইবনে যিয়াদ! সেই সময় বেশি দূরে নয়, যখন হাশরের ময়দানে একদিকে নবীয়ে দো’জাহান হুযূর পাক (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থাকবেন আর একদিকে হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) থাকবেন; তখন তুমি দেখবে যালিমদের কী পরিণতি হয়। আমাদের আরজি আল্লাহ তায়ালা’র দরবারে পেশ করেছি’ এ কথাগুলো বলে তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।

ইত্যবসরে হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন (রাঃ)এর প্রতি ইব্নে জিয়াদের চোখ পড়ল। সে জিজ্ঞাসা করলো, এ কে? ইয়াযীদ বাহিনীরা বলল, এ হলো হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) উনার ছেলে। ইব্নে যিয়াদ বলল, তোমরা একে কেন রেখে দিয়েছ? একে কেন কতল করোনি? ওরা বলল, এ অসুস্থ ছিল এবং আমাদের সাথে মোকাবেলা করতে আসেনি। এজন্য আমরা একে কতল করিনি। ইবনে যিয়াদ বলল, একেও কতল করে দাও। আমি চাই না যে, এদের একজনও বেঁচে থাকুক। পাপিষ্ঠ ইবনে যিয়াদ এ কথাগুলো বলার সাথে সাথে জল্লাদ তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে আসলো। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম হযরত যাইনুল আবিদীন (রাঃ) আলাইহিকে জড়িয়ে নিলেন এবং বললেন, ওহে যালিমেরা! আমাদের সাথে কোন পুরুষ মাহরাম (আপনজন) নেই। এ একমাত্র আমাদের মাহরাম। যদি তোমরা একেও কতল করো, আমাদের সাথে কোন মাহরাম থাকবে না। তাই তোমরা এটা জেনে রেখো, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমাকে কতল না করবে, এর আগে তোমরা এর কাছেও পৌঁছতে পারবে না। যদি একে কতল করতে চাও তাহলে প্রথমে আমাকে কতল করো। ওহে যালিমেরা! একে বাঁচতে দাও। যদি তোমরা একেও কতল করে ফেল, তাহলে আওলাদে রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর ‘সিলসিলা’ কিভাবে জারি থাকবে? এ কথাগুলো বলার পর আল্লাহ তায়ালা ইব্নে জিয়াদের অন্তরে এমন এক ভীতি সৃষ্টি করে দিলেন, শেষ পর্যন্ত সে তার এ ঘৃণিত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রইলো।

এরপর ইবনে যিয়াদ কূফা শহরে সাধারণ সমাবেশের আয়োজন করলো এবং সমবেত লোকদের ধমকী ও হুমকী দিয়ে বলল, দেখ! যারা ইয়াযীদের বিরোধিতা করেছে, তাদের কী পরিণতি হয়েছে। তোমরাও যদি ইয়াযীদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলো, তাহলে তোমাদেরও একই পরিণতি হবে। সে নির্দেশ দিল, শহীদদের মস্তকসমূহ বর্শার অগ্রভাগে নিয়ে এবং আহলে বাইতের সদস্যদেরকে উটের পিঠে উঠিয়ে কূফার অলিতে-গলিতে যেন ঘুরানো হয়, যাতে লোকেরা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আগামীতে ইয়াযীদের বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ করার সাহস না পায়। নির্দেশ মুতাবিক মহান শহীদগণের পবিত্র মস্তকসমূহ বর্শার অগ্রভাগে উঠিয়ে কূফার অলিতে-গলিতে ঘুরানো হলো এবং সাথে আহলে বাইতের সেই পর্দানশীন সম্মানিতা মহিলাগণও ছিলেন, যাদের দোপাট্টা পর্যন্ত লোকেরা আগে কখনও দেখার সুযোগ পায়নি। দুঃখের বিষয়! আজ তাদেরকে বেপর্দাভাবে কুফার অলিতে-গলিতে ঘুরানো হচ্ছে! যখন তাঁদেরকে ঘুরানো হচ্ছিল তখন ঐসমস্ত কূফাবাসী, যারা চিঠি লিখে হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)কে দাওয়াত দিয়েছিল, যারা হযরত ইমাম মুসলিম (রাঃ)এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল এবং যারা বড় বড় শপথ করে বলেছিল, ‘জান-মাল উৎসর্গ করে দিব তবুও আপনার সঙ্গ ত্যাগ করবো না।’ যারা আহলে বাইতের মুহব্বতের বড় দাবিদার ছিল, যারা নিজেদেরকে আহলে বাইতের প্রেমিক বলতো, সেই কূফাবাসীরা, পবিত্র মস্তকসমূহ বর্শার অগ্রভাগে নিয়ে এবং আহলে বাইতের সদস্যগণকে একান্ত অমানবিকভাবে কূফার অলিতে-গলিতে যখন ঘুরাতে দেখলো, তখন তারা নিজেদের ঘরের ছাদের উপর দাঁড়িয়ে, কেউ ঘরের জানালার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল।

যখন হযরত যয়নাব (রাঃ) তাদের এ কান্না ও চিৎকার করতে দেখলেন, তখন তিনি উটকে থামাতে বললেন এবং ওদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে কুফাবাসী! আজ তোমরা কেন মাতম করছো? হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর কাছে চিঠি প্রেরণকারী ছিল কারা? উনাকে কূফায় আসার জন্য দাওয়াত দানকারী ছিল কারা? হযরত ইমাম মুসলিমকে যখন প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়েছিল, তখন তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল কারা? এবং মুখে বড় বড় কথা বলে শপথ করে জান-মাল কুরবানী করার নিশ্চয়তা দানকারী ছিল কারা? জালিমেরা! তোমরাইতো চিঠি লিখেছিলে, তোমরাইতো নবী পাক (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর দৌহিত্রকে দাওয়াত করে এনেছিলে। এরপর তোমরাইতো বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলে এবং উনাদেরকে যালিমদের হাতে সোপর্দ করেছিলে, ফলে নবী পাক (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর দৌহিত্রকে একান্ত অমানবিকভাবে শহীদ হতে হলো। আর এখন তোমরা অশ্রুপাত করছ! বিশ্বাসঘাতকের দল! তোমরা কি মনে করেছো, তোমাদের এ অশ্রুপাতের ফলে তোমাদের কপাল থেকে আহলে বাইতের রক্তের দাগ মুছে যাবে? না! না! কক্ষনো তা হবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তোমরা কাঁদতে থাকলেও তোমাদের ললাট থেকে এ রক্তের দাগ মুছবে না। আমি আল্লাহ পাকের নিকট ফরিয়াদ করছি, তোমরা কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে কাঁদতে ও চিৎকার করতে থাক। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম কথাগুলো বলে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

তথ্যসূত্র

  • কারবালা প্রান্তরে(লেখকঃ খতিবে পাকিস্তান হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ শফী উকাড়বী(রহঃ))