এই সুন্নিপিডিয়া ওয়েবসাইট পরিচালনা ও উন্নয়নে আল্লাহর ওয়াস্তে দান করুন
বিকাশ নম্বর ০১৯৬০০৮৮২৩৪

ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) * কারবালার ইতিহাস * পিস টিভি * মিলাদ * মাযহাব * ইলমে গায়েব * প্রশ্ন করুন

বই ডাউনলোড

ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামর শুভাগমনের দিন কেবল মুসলমান নয় সৃষ্টিজগতের সকলের জন্য আনন্দের ও রহমতের। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন-আমি আপনাকে জগতসমূহের রহমত করে প্রেরণ করেছি। তাই সৃষ্টির সূচনা কাল থেকে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপিত হয়ে আসছে। যেহেতু ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলো মুসলিম জাতির আনন্দের দিন, সেহেতু সারা বিশ্বের মুসলিমগণ অত্যন্ত ভক্তি ও মর্যাদার সাথে রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করে থাকেন। কিন্তু এক দল লোক এটিকে অবৈধ ও বিদয়াতে সাইয়্যিআহ (মন্দ বিদআত) বলে প্রচার করছে। অথচ এটি একটি শরিয়ত সম্মত পুণ্যময় আমল, যা কুরআন, সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। অত্র প্রবন্ধে আমরা এটি শরিয়ত সম্মত হবার বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দলীল, সাহাবায়ে কিরামের স্বীকৃতি, সালফে সালেহীন, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফিকাহবিদগণের দৃষ্টিভঙ্গি তোলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি।

ঈদে মিলাদুন্নবী পরিচিতি

ক.শাব্দিক পরিচয়

‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ শব্দটি যৌগিক শব্দ। যা তিনটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত।

  • এক, ঈদ
  • দুই, মিলাদ
  • তিন, নবী।
প্রথমত

ঈদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ উৎসব, আনন্দ, খুশি।

বিশ্ববিখ্যাত অভিধান প্রণেতা ইবনু মনযুর বলেন-

ﺍﻟﻌﻴﺪ ﻛﻞ ﻳﻮﻡ ﻓﻴﻪ ﲨﻊ

‘সমবেত হবার প্রত্যেকদিনকে ঈদ’ বলা হয়।

— ইবনু মনযুর, লিসানুল আরাব, দারু সাদির, বৈরুত, ১ম সংস্করণ, খ. ৩য়, পৃ.৩১৫

মুফতি আমীমূল ইহসান আলাইহির রাহমাহ বলেন-

ﺍﻟﻌﻴﺪ ﻛﻞ ﻳﻮﻡ ﻓﻴﻪ ﲨﻊ ﺍﻭ ﺗﺬﻛﺎﺭ ﻟﺬﻱ ﻓﻀﻞ

কোন মর্যদাবান ব্যক্তিকে স্মরণের দিন বা সমবেত হবার দিনকে ঈদের দিন বলা হয়।

— মুফতি আমীমূল ইহসান, কাওয়ায়িদুল ফিকহ, আশরাফি বুক ডিপু, ভারত, ১ম সংস্করণ, ১৩৮১ হিজরী, পৃ.৩৯৫

দ্বিতীয়ত

মিলাদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ: জন্মকাল, জন্মদিন। এ অর্থে মাওলিদ (ﻣﻮﻟﺪ) শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় অত্যোধিক।

তৃতীয়ত

নবী, এখানে নবী বলতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। কারণ মুসলিম জাতি ও পুরো সৃষ্টিজগত তাঁর আগমণের শোকরিয়া আদায় করে। সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ অর্থ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র শুভাগমনের আনন্দ উৎসব।

খ.‘মিলাদুন্নবী’ শব্দের প্রচলন

‘মিলাদুন্নবী’ শব্দের মধ্যে ‘মিলাদ’ শব্দটি কারো জন্ম বা জন্মকাল বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। এ অর্থে শব্দটির ব্যবহার রয়েছে হাদিস শরিফে, অভিধান গ্রন্থে, ইতিহাস গ্রন্থে, এমনকি অনেক কিতাবের নামেও। এটি নতুন কোন শব্দ নয়। এর কয়েকটি ব্যবহার নিম্নে উলে­খ করা হল।

১.অভিধান গ্রন্থ

আল্লামা ইবনু মনযুর তার সুপ্রসিদ্ধ আরবি অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এ লিখেছেন-

ﻣﻴﻼﺩ ﺍﻟﺮﺟﻞ: ﺍﺳﻢ ﺍﻟﻮﻗﺖ ﺍﻟﺬﻱ ﻭﻟﺪ ﻓﻴﻪ

লোকটির মিলাদ- "যে সময়ে সে জন্ম গ্রহণ করেছে সে সময়ের নাম"।

— ইবনু মনযূর, প্রাগুক্ত, খ. ৩য়, পৃ.৪৬৮, আল্লামা ইসমাঈল বিন হাম্মদ জাওহারী, আস-সিহাহ, দারুল ইলম, বৈরুত, ১৪০৪ হিজরী, খ.১ম, পৃ.৩০৬

২.হাদিস গ্রন্থ

ইমাম তিরমিযী আলাইহির রাহমাহ তাঁর ‘আল জামেউস সহীহ’ গ্রন্থের একটি শিরোনাম হল-

ﺑﺎﺏ ﻣﺎ ﺟﺎﺀ ﰲ ﻣﻴﻼﺩ ﺍﻟﻨﱯ

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম সম্পর্কে বর্ণিত বিষয়ের অধ্যায়।

— ইমাম তিরমিযী, আল-জামেইস সহীহ, দারুল গারব আল ইসলামী, বৈরুত,লেবানন, ১৯৯৮ইং, খ. ৫ম, পৃ.৫৮৯।

হযরত উসমান বিন আফ্ফান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বনী ইয়ামর বিন লাইসের ভাই কুরাছ বিন উশাইমকে জিজ্ঞেস করলেন-

ﺃﺍﻧﺖ ﺃﻛﱪ ﺃﻡ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﷲ ﺻﻠﻰ ﺍﷲ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻘﺎﻝ : ﺭﺳﻮﻝ ﺍﷲ ﺃﻛﱪ ﻣﲏ ﻭﺃﻧﺎ ﺍﻗﺪﻡ ﻣﻨﻪ ﰲ ﺍﳌﻴﻼﺩ

‘আপনি বড় নাকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার চেয়ে বড়। আর আমি জন্মের মধ্যে তার চেয়ে অগ্রজ।

নোটঃ
  • ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত;
  • ইমাম তাবারী, তারিখুল উমাম ওয়াল মূলুক, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন, ১৪০৭ হি. খ. ১ম, পৃ.৪৫৩,
  • ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন, ১৪১৯ হিজরী, খ.২য়. পৃ.২১৬,
  • মিয্যী, তাহযীবুল কামাল, মুয়াস সাসাতুর রিসালা, বৈরুত, লেবানন, ১৪০০হিজরী, খ. ২৩, পৃ.৪৬৭,
  • আহমাদ বিন আমর শায়বানী, আল-আহাদ ওয়াল মাছানী, দারুর রাইয়া, রিয়াদ, সৌদি আরব, ১৪১১হিজরী, খ. ১ম, পৃ.৪০৭।

৩. ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরতের সময় ‘সাওর’ গুহায় আশ্রয় নেন। এদিকে মক্কার কুরাইশরা তাকে খুঁজতে খুঁজতে ‘সাওর’ গুহা মুখে পৌছলে তাদের একজন বলল-

ﺃﻥ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﻌﻨﻜﺒﻮﺕ ﻗﺒﻞ ﻣﻴﻼﺩ ﺍﻟﻨﱯ ﺻﻠﻰ ﺍﷲ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﺎﻧﺼﺮﻓﻮﺍ

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মের পূর্ব থেকে এ গুহামুখে মাকড়শার জাল রয়েছে। অতঃপর তারা চলে গেল।

নোটঃ
  • ইবনে সাদ, আত্ তাবকাতুল কুবরা, দারু বৈরুত লিত্-তাবয়া ওয়ান নশর, বৈরুত, লেবানন, ১৩৯৮ হি. খ.১ম,পৃ.২২৮,
  • ইমাম সুয়ূতী, আল-খাছায়িছুল ক্বুবরা, মাকতাবাতু নূরিয়্যা রিজকিয়্যা, ফয়সালাবাদ, পাকিস্তান, ১৯৯৮ ইং, খ.১ম, পৃ.৩০৫

ইবনু আউন (রহ.) বলেন-

হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ৯১ বছর বয়সে শহীদ হন। তিনি জন্মের ক্ষেত্রে রাসুলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অগ্রজ ছিলেন।

— ইবনে সাদ, প্রাগুক্ত, খ. ৩য়, পৃ. ৩৫৯

হযরত ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন-

ﻭﻛﺎﻥ ﺑﲔ ﻣﻴﻼﺩ ﻋﻴﺴﻰ ﻭﺍﻟﻨﱯ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ ﲬﺲ ﻣﺎﺋﺔ ﺳﻨﺔ ﻭﺗﺴﻊ ﻭﺳﺘﻮﻥ ﺳﻨﺔ

আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের মাঝখানে ৫৬৯ বছর ব্যবধান ছিল।

নোটঃ
  • ইবনু সাদ, প্রাগুক্ত, খ. ১ম, পৃ.৫৩,
  • ইমাম তাবারী, প্রাগুক্ত, খ. ১ম, পৃ.৪৯৫,
  • ইমাম কুরতুবী, আল-জামেঈ লিআহকামিল কুরআন, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবী, বৈরুত, লেবানন, খ.৬ষ্ঠ, পৃ.১২২।

আল্লামা ইবনু হাজর আসক্বালানী আলাইহির রাহমাহ বলেন-

তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জন্মের কিছুকাল পরে জন্ম গ্রহণ করেছেন।

— আল্লামা ইবনু হাজর আসকালানী, ফতহুল বারী, দারু নশরিল কুতুবিল ইসলামিয়্যাহ, লাহর, পাকিস্তান, ১৪০১হি. খ.৬ষ্ট, পৃ.৫৫৭।

উপরিউক্ত উদ্ধৃতি থেকে বুঝা গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জন্ম বুঝানোর জন্য ‘মিলাদুন্নবী’ শব্দটির ব্যবহার সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে অদ্যাবধি রয়েছে; এ যুগের নবসৃষ্ট কোন শব্দ নয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে যে ‘মিলাদুন্নবী’ একটি ইদানিং সময়ের শব্দ, যা আদৌ সঠিক নয়। আবার কেউ কেউ ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ ‘জন্ম’ না নিয়ে অন্যঅর্থ নেয়ার চেষ্টা করে, যা কোন অভিধান প্রণেতা উলে­খ করেননি।

গ. ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’র পরিচয়

‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতে বুঝায়-এ ধরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনে আনন্দিত হওয়া এবং এ অদ্বিতীয় নিয়ামত পাবার কারণে সৎকাজ ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা।

তথ্যসূত্র

  • মাসিক তরজুমান, ১৪৩৬ হিঃ রবিউল আউয়াল সংখ্যা