তোমরা বিনীতভাবে এবং গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

হাসান বসরী র. বলেছেন, উচ্চঃস্বরের দোয়া ও নিম্নরের দোয়ার মধ্যে সত্তর হাজার গুণ পার্থক্য রয়েছে। প্রথম যুগের মুসলমানগণ দীর্ঘ সময় ধরে দোয়া করতেন। তাঁদের ওই দোয়ার সামান্য আওয়াজও শোনা যেতো না। শুধু শোনা যেতো ওষ্ঠ সঞ্চালনের শব্দ। কেননা আলাহ্তায়ালা এরশাদ করেছেন―

তোমরা বিনীতভাবে এবং গোপনে তোমাদের প্রভুপালককে ডাক।

— সুরা আ’রাফ, আয়াত ৫৫

নবী জাকারিয়া সম্পর্কে অন্যত্র এরশাদ করেছেন―

যখন সে তাহার প্রভুপালককে আহবান করিয়াছিল নিভৃতে।

— সুরা মার্‌য়াম, আয়াত ৩

হজরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, উত্তম জিকির হচ্ছে জিকরে খফি (নীরব জিকির) এবং উত্তম জীবিকা হচ্ছে ঐ জীবিকা, যা ন্যূনতম সামর্থের অন্তর্ভূত।

— আহ্‌মদ, ইবনে হাব্বান, বায়হাকী

হজরত আবু মুসা আশআরী বর্ণনা করেছেন, খয়বর যুদ্ধের সময় একটি প্রান্তর অতিক্রমকালে মুসলিম সৈন্যরা উচ্চঃস্বরে তক্‌বীর উচ্চারণ করেছিলেন। রসুলেপাক স. তখন বলেছিলেন, শান্ত হও। তোমরা কোনো অনুপস্থিত স্বত্বা তো আহবান করছো না তোমরা ওই সত্তাকে ডাকছো, যিনি সর্বশ্রোতা এবং নিকটতম।

আমি বলি, বাগবী বর্ণিত এই হাদিসটির মাধ্যমে জিক্‌রে খফির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। কিন্তু এখানে এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, রসুলেপাক স. এখানে উচ্চঃস্বরে তক্‌বীর ধ্বনিকে নিষিদ্ধ করেননি। বলেছেন, শান্ত হও। তাই এই হাদিসের মাধ্যমে জিক্‌রে খফির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হওয়ার সাথে সাথে একথাও প্রমাণিত হয় যে, নীরব ও সরব উভয় প্রকার জিকির সিদ্ধ।

জিকির তিন প্রকার-
১. চিৎকার করে জিকির করা। আলেমগণের ঐকমত্যানুসারে এরকম জিকির সকল অবস্থায় মাকরুহ্। তবে বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে যদি অধিকতর উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, পরিস্থিতিগত কারণে আলেমগণ যদি সাময়িকভাবে এরকম জিকিরকে কল্যাণময় মনে করেন, তবে তাকে অসিদ্ধ বলা যাবে না। বরং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যুচ্চ আওয়াজে জিকির করাই উত্তম। যেমন- আজান, হজ্বের তালবিয়া ইত্যাদি। চিশতিয়া তরিকার কোনো কোনো পীর ও মোর্শেদ প্রাথমিক অবস্থায় মুরিদগণকে উচ্চঃস্বরে জিকির করতে বলেন। শয়তান বিতাড়ন, আলস্য দূরীকরণ, ঔদাসীন্য অপসারণ, অন্তর উত্তপ্তকরণ, অনুপ্রেরণা ও অনুরাগের উজ্জীবন ইত্যাদির উদ্দেশ্যে চিশতিয়া তরিকার পীরগণ প্রাথমিক সালেকদের জন্য এরকম জিকির নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আত্মপ্রসাদ এবং যশলাভের উদ্দেশ্যে অত্যুচ্চ আওয়াজে জিকির করা থেকে বিরত থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়।
২. রসনা সঞ্চালনের মাধ্যমে অত্যন্ত অনুচ্চ আওয়াজে জিকির করা। রসুলেপাক স. বলেছেন, সকল সময় আলাহ্‌র জিকিরে তোমরা রসনাকে সিক্ত রাখো। ইমাম আহমদ ও তিরমিজির বর্ণনায় রয়েছে, একবার রসুললাহ্ স.কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আলাহ্‌র রসুল! সর্বাপেক্ষা উত্তম আমল কোনটি? তিনি স. বললেন, পৃথিবী পরিত্যাগের সময় আলাহ্‌র জিকির দ্বারা রসনাকে সরস রাখা।
৩. জিহ্‌বা সঞ্চালন ব্যতীত কেবল কলব, রূহ ও নফস দ্বারা গোপনে জিকির করা। এই জিকিরকে বলে জিক্‌রে খফি। আমল লেখক ফেরেশতারা এই জিকির সম্পর্কে অজ্ঞাত।

উম্মত-জননী হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. থেকে আবু ইয়ালী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, সরব জিকির অপেক্ষা নীরব জিকির সত্তর হাজার গুণ অধিক মর্যাদাপূর্ণ। শেষ বিচারের দিন ফেরেশতারা যখন মানুষের আমলনামা উপস্থিত করবে, তখন আলাহ্‌পাক এক লোককে দেখিয়ে বলবেন, ভালো করে দ্যাখো আমার এই বান্দার কোনো পাপ পুণ্য লেখা বাদ পড়লো কিনা! ফেরেশতারা বলবে, আমরা যা কিছু জেনেছি, শুনেছি ও দেখেছি― সবকিছুই আমলনামায় লিখে নিয়েছি। কোনো কিছুই পরিত্যাগ করিনি। আলাহ্‌তায়ালা বলবেন, আমার এই বান্দার গোপন আমলও রয়েছে, যার কথা তোমরা জানো না। সেই আমল হচ্ছে জিক্‌রে খফি।

আমি বলি, এই জিক্‌রে খফি বা কলবী জিকিরের ধারাবাহিকতা কখনো ছিন্ন হয় না। শারীরিক ক্লান্তি, শ্রান্তি ও আলস্য গোপন জিকিরের প্রতিবন্ধক নয়। জিকিরে জাগ্রত ক্বলবে তাই প্রতিটি মুহূর্তে চলতে থাকে আলাহ্‌র জিকির। [1]

তথ্যসূত্র

  1. আল্লাহ্‌র জিকির (লেখকঃ মুহাম্মাদ মামুনুর রশীদ)