নবী করিম (দঃ) এর দেহ মোবারক নূর নাকি মাটি ?

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিস্তারিত জীবনী

  • নবী করিম (দঃ) এর দেহ মোবারক নূর নাকি মাটি ?

















সাহাবী জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত মরফু হাদীস- অর্থাৎ স্বয়ং নবী করিম (দঃ)-এর জবানে বর্ণিত হাদীস দ্বারা হুযুর (দঃ) নূরের সৃষ্টি বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাটি, পানি, আগুন, বায়ু- এই উপাদান চতুষ্টয় যখন পয়দাই হয়নি, তখন আমাদের প্রিয় নবী (দঃ) পয়দা হয়েছেন। সুতরাং তিনি যে মাটির সৃষ্টি নন এবং মাটি সৃষ্টির পূর্বেই পয়দা- একথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো।

কিন্তু আমলে নাছুত- অর্থাৎ পৃথিবীতে আত্মপ্রকাশের সময় যে বশরী সুরত বা মানব শরীর ধারণ করেছেন, তা কিসের তৈরি- এ নিয়ে বিভিন্ন মতামত লক্ষ্য করা যায়। যেমন- তাবেয়ী হযরত কা'বে আহবার (রহঃ) এবং সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত কথিত দুটি হাদীস বা রেওয়ায়াতে দেখা যায় যে, নবী করিম (দঃ)-এর দেহ মোবারক মদিনা শরীফের রওযা মোবারকের খামিরা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ দু'খানা রেওয়ায়াতকে পুঁজি করে একদল ওলামা বলেন- হুযুর (দঃ) মাটির তৈরি। বাতিলপন্থী কোনো কোনো আলেম আবার ঠাট্টা করে বলেন- তিনি তো সাদা মাটির তৈরি (নাউযুবিল্লাহ)। জনৈক মাওলানা মুহাম্মদ ফজলুল করিম রচিত 'তাওহীদ রিসালাত ও নূরে মোহাম্মদী সৃষ্টি রহস্য' নামক বইখানা দ্রষ্টব্য। উক্ত বইয়ে আল্লাহকেও নূর বলে অস্বীকার করা হয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)।

আবার সহি রেওয়ায়াতে দেখা যায় যে, হুযুর (দঃ) নূর হয়েই আদম (আঃ)-এর সাথে জগতে তাশরীফ এনেছেন এবং আল্লাহর কুদরতে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঐ নূর এক দেহ হতে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হতে হতে অবশেষে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর পৃষ্ঠ হতে ঐ পবিত্র নূর সরাসরি হযরত আমেনা (রাঃ)-এর গর্ভে স্থান লাভ করেছেন এবং যথাসময়ে নূরের দেহ ধারণ করে মানব আকৃতি নিয়ে দুনিয়াতে তাশরীফ এনেছেন।

পর্যালোচনা

উক্ত দুই মতবাদের মধ্যে কোন্টি সঠিক- তা যাচাই-বাছাই করলে দেখা যাবে যে, ইলমে হাদীসের নীতিমালার আলোকে দ্বিতীয় মতবাদটিই সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়। তাই প্রথমে মাটির রেওয়ায়াত দুটি উসুলে হাদিসের নীতিমালার আলোকে পর্যালোচনা করা দরকার। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত কথিত হাদীসখানা নিম্নরূপ :

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ (দঃ) বলেন- নবজাত প্রত্যেক শিশুর নাভিতে মাটির একটি অংশ রাখা হয়। সেখানেই সে সমাধিস্থ হয়। তিনি আরো বলেন- আমি, আবু বকর ও ওমর একই মাটি হতে সৃজিত হয়েছি এবং সেখানেই সমাধিস্থ হবো।

— তাফসীরে মাযহারী ও খতীবে বাগদাদীর আল মুত্তাফিক ওয়াল মুফতারিক

উক্ত হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মোহাদ্দিসগণের মতামত
  • খতীবে বাগদাদী (রহঃ) এই রেওয়ায়াতটি তাঁর গ্রন্থে বর্ণনা করে বলেন- হাদীসটি গরীব। গরীব হাদীস বলা হয় প্রতি যুগে মাত্র একজন বর্ণনাকারীই উক্ত রেওয়ায়াতটি বর্ণনা করেছেন- দ্বিতীয় কোনো বর্ণনাকারী নেই। গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে গরীব হাদিস দ্বারা কোনো আইনী বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। (উসুলে হাদীস দ্রষ্টব্য)
  • হাদীস শাস্ত্র বিশারদ আল্লামা ইবনে জওযী বলেন- এই হাদীসটি মওযু ও বানোয়াট। এই দুটি মতামত মাআরেফুল কোরআন-এর বাংলা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, সৌদী আরব ছাপা, পৃষ্ঠা ৮৫৬-এ উল্লেখ করা হয়েছে। রেওয়ায়াত হিসেবে প্রত্যেক লেখকের কিতাবেই এটি পাওয়া যায়। কিন্তু-এর নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করেন হাদীসের জোরাহ ও তাদীল বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ। ইবনে জওযীর মতামতের গুরুত্ব প্রত্যেক হাদীস বিশারদের নিকটই স্বীকৃত।

সুতরাং একটি গরীব, জাল, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট রেওয়ায়াতের উপর নির্ভর করে রাসুলে পাকের (দঃ) দেহ মোবারককে মাটির দেহ বলা যে অসঙ্গত- তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। জাল হাদীস তৈরিতে রাফেযী ও বাতিল ফের্কাগুলি ঐ যুগে তৎপর ছিল। তারা সাহাবী ও তাবেয়ীগণের নাম ব্যবহার করে ভিত্তিহীন হাদীস তৈরি করতো।

কা'ব আহবারের রেওয়ায়াত বিশ্লেষণ 

হযরত কা'ব আহবার (তাবেয়ী) বলেন : যখন আল্লাহ পাক হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ)কে (দেহকে) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি জিবরাইল (আঃ) কে এমন একটি খামিরা নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ করলেন- যা ছিল পৃথিবীর কলব, আলো ও নূর (মাটি নয়)।

এই নির্দেশ পেয়ে জিবরাইল (আঃ) জান্নাতুল ফেরদাউস এবং সর্বোচ্চ আসমানের ফিরিস্তাদের নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করলেন। অতঃপর রাসুলে পাকের রওযা শরীফের স্থান থেকে এক মুষ্ঠি খামিরা নিয়ে নিলেন। উহা ছিল সাদা আলোময় নূর। পরে উক্ত খামিরাকে বেহেস্তে প্রবাহিত নহর সমূহের মধ্যে তাছনীম নামক নহরের পানি দিয়ে গুলিয়ে সেটি এমন একটি শুভ্র মুক্তার আকার ধারণ করলো, যার মধ্যে ছিল বিরাট আলোশিখা। অতঃপর ফিরিস্তারা প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে উক্ত মুক্তা আকৃতির আলোময় খামিরা নিয়ে আরশ, কুরছি, আসমান-জমিন, পাহাড়-পর্বত ও সাগর-মহাসাগরের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করলেন। এভাবে ফিরিস্তাকুল ও অন্যান্য সকল মাখলুক হযরত আদম (আঃ)-এর পরিচয় পাওয়ার পূর্বেই আমাদের সর্দার ও মুনিব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ)-এর ফযিলত সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করলো। (মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া)

হাদীসখানার পর্যালোচনা

উপরোক্ত কা'ব আহবার (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতখানার বিচার বিশ্লেষণ করলে নীচের জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো বের হয়ে আসে। যথা-

১) কা'ব আহবার (রাঃ) পূর্বে একজন বড় ইহুদী পণ্ডিত ছিলেন। রাসুলের (দঃ) যুগে তিনি মুসলমান হননি। সুতরাং সাহাবী নন। তিনি হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে মুসলমান হয়ে তাবেয়ীনদের মধ্যে গণ্য হন। সাহাবীর বর্ণিত হাদীস রাসুলের জবান থেকে শ্রুত হলে তাকে মারফু মোত্তাসিল বলা হয়। আর রাসুলের সূত্র উল্লেখ না থাকলে সাহাবীদের বর্ণিত হাদীসকে মাওকুফ বলা হয়। তাবেয়ীর বর্ণিত হাদীস- যার মধ্যে সাহাবী ও রাসূলের সূত্র উল্লেখ নেই, তাকে বলা হয় মাকতু। উক্ত হাদীসখানা তাঁর নিজস্ব ভাষ্য। সাহাবী বা রাসুল বর্ণিত হাদীস নয়।

হাদীসের প্রত্যেক শিক্ষার্থীই এই সূত্র ভালোভাবে জানেন যে, তাবেয়ীর মাকতু হাদীস যদি রাসুলের বর্ণিত মারফু হাদীসের সাথে গরমিল বা বিপরীত হয়, তাহলে রাসূলের বর্ণিত মারফু হাদীসই গ্রহণযোগ্য হবে। কা'ব আহবারের খামিরার হাদীসখানা তাঁর নিজস্ব ভাষ্য এবং তৃতীয় পর্যায়ের। পূর্বে হযরত জাবেরের বর্ণিত নূরের হাদীসখানা ১ম পর্যায়ের। গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ১ম পর্যায়ের হাদীসই অগ্রগণ্য। সুতরাং উসুলের বিচারে কা'ব আহ্বারের হাদীসখানা দুর্বল ও মোরসাল এবং সহী সনদেরও খেলাফ। সোজা কথায়- তাবেয়ীর বর্ণিত মাকতু হাদীস রাসূল বর্ণিত মারফু হাদীসের সমকক্ষ হতে পারে না।

২) আল্লামা যারকানী বলেন- কা'ব আহবার পূর্বে ইহুদী পণ্ডিত ছিলেন। সম্ভবতঃ তিনি পূর্ববর্তী কোনো গ্রন্থে ইসরাইলী বা ইহুদী বর্ণনার মাধ্যমে এই তথ্য পেয়ে থাকবেন। এই সম্ভাবনার কারণে ইসরাইলী বা ইহুদী বর্ণনা আমাদের শরীয়তে গ্রহণযোগ্য হবে না- যদি তা অন্য হাদীসের বিপরীত হয়। কা'ব আহ্বারের বর্ণিত হাদীসটি হযরত জাবেরের বর্ণিত হাদীসের পরিপন্থী। তাই ইহা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
৩) তদুপরি ত্বিনাত শব্দটির অর্থ মাটি নয়-বরং খামিরা। এই খামিরার ব্যাখ্যা করা হয়েছে পৃথিবীর কলব, আলো ও নূর-তথা নূরে মোহাম্মদী (যারকানী)। সুতরাং জিবরাইলের সংগৃহীত খামিরাটি মাটি ছিল না- বরং রওযার মাটিতে রক্ষিত নূরে মোহাম্মদীর খামিরা (যারকানী)। খামিরা সূরতের এই নূরে মোহাম্মদীকেই পরে বেহেস্তের তাছনীম ঝরনার পানি দিয়ে গুলিয়ে এটাকে আরো অনু-পরমাণুতে পরিণত করা হয়েছিল। যেমন পানি হতে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়। তাই বলে বিদ্যুৎকে পানি বলা যাবে না। নবী করিম (দঃ)-এর দেহ মোবারক ছিল সৃষ্টি জগতের মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্মতম। এ মর্মে একখানা হাদীস মিলাদে মোহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী নামক বাংলা গ্রন্থে উল্লেখ আছে। বইখানার লেখক ফুরফুরার খলিফা মেদিনীপুরের মরহুম মাওলানা বাশারাত আলী সাহেব। হাদীসখানা হচ্ছে-

রাসুল (দঃ) বলেন, আমরা নবীগণের শরীর হলো ফিরিস্তাদের শরীরের মত নূরানী ও অতিসূক্ষ্ম। তাইতো নবী করিম (দঃ) সূক্ষ্মতম শরীর ধারণ পূর্বক আকাশ ও ফিরিস্তা জগত, এমন কি আলমে আমর তথা আরশ-কুরছি ভেদ করে নিরাকারের দরবারে কাবা কাওছাইনে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। মাটির দেহ ভারী এবং তা লক্ষ্যভেদী নয়। মাটির শরীর হলে ভস্ম হয়ে যেতো।

উপরের দুখানা হাদীস পর্যালোচনা করলে ইবনে মাসউদ (রাঃ)- বর্ণিত প্রথম হাদীসখানা জাল এবং কা'ব আহ্বারের ভাষ্যটি ইসরাইলী বা ইহুদী সূত্রে প্রাপ্ত- যা সরাসরি হাদীসে মারফুর খেলাফ। তদুপরি- কা'ব আহবারের হাদীসখানায় বিভিন্ন তাবিল বা ব্যাখ্যা করার অবকাশ রয়েছে। ইহা মোহকাম বা সংবিধিবদ্ধ নয়। সুতরাং হযরত জাবের (রাঃ)-এর মারফু হাদীস ত্যাগ করে কাবে আহবারের বর্ণিত মাকতু রেওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আবার নূর ও মাটির উভয় হাদীস গ্রহণ করে নবীজীর দেহ মোবারককে নূর ও মাটির সমন্বিত রূপও বলা যাবে না। যেমন- বলেছেন অনেক জ্ঞানপাপী মুফতী। হাদীসের বিশ্লেষণ না জানার কারণেই তারা এরূপ ফতোয়া দিয়েছেন। কা'ব আহবারের বর্ণিত খামিরাটি ছিল নূরে মোহাম্মদীর ঐ অংশ- যা দ্বারা দুনিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ঐ অংশই রওযা মোবারকের স্থানে রক্ষিত ছিল- (যারকানী দেখুন)।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)