নূরে মোহাম্মদীর (দঃ) সৃষ্টি রহস্য ও প্রকৃতি

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিস্তারিত জীবনী
  • নূরে মোহাম্মদীর (দঃ) সৃষ্টি রহস্য ও প্রকৃতি


















অনাদি ও অনন্ত স্বত্বা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন একা ও অপ্রকাশিত ছিলেন, তখন তাঁর আত্মপ্রকাশের সাধ ও ইচ্ছা জাগরিত হলো । তখন তিনি একক সৃষ্টি হিসেবে নবী করিম (দঃ) এর নূর মোবারক পয়দা করলেন এবং নাম রাখলেন মোহাম্মদ (দঃ) । (কাঞ্জুদাকায়েক - ইমাম গাযালী (রহঃ))

সেই নূরে মোহাম্মদীর সৃষ্টি হিসেবে নবী করিম (দঃ) মারফু মুত্তাসিল হাদিসের মাধ্যমে পরিস্কার ব্যাখ্যা করে গেছেন । উক্ত হাদীসটি বর্নিত হয়েছে রাসূলে পাক (দঃ)-এর একান্ত একনিষ্ঠ খাদেম ও মদিনার ৬ নং সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) কর্ত্রিক । উক্ত হাদীসটি প্রথম সঙ্কলিত হয়েছে “মোসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক” নামক হাদীসগ্রন্থে । মোহাদ্দেস আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন ইমাম বোখারী (রহঃ)-এর দাদা ওস্তাদ এবং ইমাম মালেকের শাগরিদ ।

পরবর্তীতে উক্ত গ্রন্থ হতে অনেক হাদীস বিশারদগণ নিজ নিজ গ্রন্থে হাদীসখানা সঙ্কলিত করেছেন । যেমন- ইমাম কাস্তুলানী (রহঃ) তাঁর রচিত নবী করিম (দঃ) এর জীবনী গ্রন্থ ‘মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া’ তে উক্ত হাদীসখানা উল্লেখ করেছেন । নবী করিম (দঃ)-এর সৃষ্টি সম্পর্কে এই হাদীসখানা সুবিখ্যাত এবং বিস্তারিত । তাই বিজ্ঞ পাঠকদের সামনে আমরা উক্ত হাদীসখানা অনুবাদসহ তুলে ধরছি । এ রেওয়ায়েত ছাড়া অন্যান্য রেওয়ায়াত অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট ও খন্ডিত এবং উসুলে হাদীসের মাপকাঠিতে অনির্ভরযোগ্য বা মারজুহ্‌ । হাদীসখানা নিম্নরুপঃ

ইমাম আবদুর রাজ্জাক (ইমাম বোখারীর দাদা ওস্তাদ) মোয়াম্মার হতে, তিনি ইবনে মুন্কাদার হতে, তিনি হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন: হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসুল (দঃ)! আপনার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীত হোক, আল্লাহ তায়ালা সমস্ত বস্তুর পূর্বে সর্বপ্রথম কোন্ বস্তু সৃষ্টি করেছেন?

তদুত্তরে নবী করিম (দঃ) বললেন "হে জাবের, আল্লাহ তায়ালা সমস্ত বস্তুর পূর্বে সর্বপ্রথম তাঁর 'নিজ নূর হতে' তোমার নবীর নূর পয়দা করেছেন। তারপর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছানুযায়ী ঐ নূর (লা-মাকানে) পরিভ্রমণ করতে থাকে। কেননা ঐ সময় না ছিল লাওহে-মাহফুজ, না ছিল কলম, না ছিল বেহেস্ত, না ছিল দোযখ, না ছিল ফিরিস্তা, না ছিল আকাশ, না ছিল পৃথিবী, না ছিল সূর্য, না ছিল চন্দ্র, না ছিল জ্বীন জাতি, না ছিল মানবজাতি।

অতঃপর যখন আল্লাহ্ তায়ালা অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করার মনস্থ করলেন-তখন আমার ঐ নূরকে চারভাগে বিভক্ত করে প্রথম ভাগ দিয়ে কলম, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে লাওহে-মাহফুয এবং তৃতীয় ভাগ দিয়ে আরশ সৃষ্টি করলেন।

অবশিষ্ট এক ভাগকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করে প্রথম ভাগ দিয়ে আরশ বহনকারী ফিরিস্তা, দ্বিতীয় অংশ দিয়ে কুরসি এবং তৃতীয় অংশ দিয়ে অন্যান্য ফিরিস্তা সৃষ্টি করলেন।

দ্বিতীয় চতুর্থ ভাগকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করে প্রথমভাগ দিয়ে আকাশ, দ্বিতীয়ভাগ দিয়ে জামিন (পৃথিবী) এবং তৃতীয় ভাগকে দিয়ে বেহেস্ত ও দোযখ সৃষ্টি করলেন।

তৃতীয়বার অবশিষ্ট ভাগকে পুনরায় চার ভাগে বিভক্ত করে প্রথমভাগ দিয়ে মোমেনদের নয়নের নূর-(অন্তর্দৃষ্টি), দ্বিতীয়ভাগ দিয়ে মুমিনদের কলবের নূর-তথা আল্লাহর মা'রেফাত এবং তৃতীয়ভাগ দিয়ে মুমিনদের মহব্বতের নূর-তথা তাওহীদী কালেমা 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ' সৃষ্টি করেছেন।" (২৫৬ ভাগের এক ভাগ থেকে অন্যান্য সৃষ্টিজগত পয়দা করলেন)।

— মাওয়াহেব লাদুনি্নয়া ও মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক- (আল জুযউল মাফকুদ অংশ)

ব্যাখ্যাঃ

উক্ত হাদীসে বর্ণিত “মিন-নূরিহী” বা তার “নিজ নূর” হতে শব্দটির ব্যাখ্যায়

  • বিশ্ব বিখ্যাত আল্লামা হযরত মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) মিরকাত শরীফে লিখেছেন- “আয়-মিন লামআতে নূরিহী”- অর্থাৎ- আল্লাহ তায়ালা তার আপন যাতি নূরের জ্যোতি দিয়ে নবীজীর নূর সৃষ্টি করেছেন।
  • মুজাদ্দেদে আলফেসানী (রহঃ) মাকতুবাত শরীফের ৩য় খন্ড ১০০ নম্বরের মাকতুবে বলেছেন “আল্লাহ তায়ালা তাহাকে স্বীয় খাস নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন”।
  • হযরত যারকানী (রহঃ) “মিন-নূরিহী” এর ব্যাখ্যায় বলেছেন – “মিন নূরিন হুয়া যাতুহু” অর্থাৎ আল্লাহর যাত বা স্বত্বা হলো নূর-সেই যাতি নূরের জ্যোতি হতেই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নূরের সৃষ্টি” এবং
  • হযরত আশরাফ আলী থানবীও একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার “নশরুত ত্বীব” গ্রন্থের ৫ম পৃষ্ঠায়।

অন্য এক হদীসে হযরত আলী ইবনে হোসাইন ইবনে আলী (রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) তার পিতা ও দাদার সূত্রে নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন

আমি আদম সৃষ্টির চৌদ্দ হাজার বৎসর পূর্বে আমার প্রতিপালকের নিকট নূর হিসেবে বিদ্যমান ছিলাম।

উল্লেখ্য

ঐ জগতের একদিন পৃথিবীর এক হাজার বৎসরের সমান। অংকের হিসাবে ৫১১০০০০০০০ বৎসর হয়। (বিদায়া ও নিহায়া এবং আনওয়ারে মুহাম্মাদীয়া গ্রন্থসূত্রে এই হাদীসখানা উদ্ধৃত করা হয়েছে।)

তাফসীরে রুহুল বয়ানে সূরা তাওবার আয়াত

‘লাক্বাদ জা আ কুম রাসুলুম্মিন আনফুসিকুম’

অর্থ “তোমাদের নিকট এক মহান রাসূলের আগমন হয়েছে”

এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে নবী করিম (দঃ) কোথা হতে আসলেন- সে সম্পর্কে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে নিম্নোক্ত হাদীস বর্ননা করা হয়েছেঃ

একদিন নবী করিম (দঃ) কথা প্রসঙ্গে হযরত জিব্রাইল (আঃ)কে তাঁর বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন- হে জিব্রাইল ! তোমার বয়স কত ? তদুত্তরে জিব্রাইল (আঃ) বললেন- আমি শুধু এতটুকু জানি যে, নূরের চতুর্থ হিজাবে একটি উজ্জ্বল তারকা ৭০ হাজার বৎসর পর পর একবার উদিত হতো । (অর্থাৎ সত্তর হাজার বৎসর উদিত অবস্থায় এবং সত্তর হাজার বৎসর অস্তমিত অবস্থায় ঐ তারকাটি বিরাজমান ছিল) । আমি ঐ তারকাটিকে ৭২ হাজার বার উদিত অবস্থায় দেখেছি । তখন নবী করিম (দঃ) বললেন- “খোদার শপথ, আমিই ছিলাম ঐ তারকা” ।

— তাফাসীরে রুহুল বয়ান, ৩য় খন্ড ৫৪৩ পৃঃ সূরা তাওবা এবং সীরাতে হলবিয়া, ১ম খন্ড ৩০ পৃষ্ঠা

নবী করিম (দঃ) এর এই অবস্থানের সময় ছিলো ঐ জগতের হিসাবে একহাজার আট কোটি বৎসর । পাঁচশত চার কোটি বৎসর ছিলেন উদীয়মান অবস্থায় এবং পাঁচশত চার কোটি বৎসর ছিলেন গায়েবী অবস্থায় । দুনিয়ার হিসাবে কত হাজার কোট বৎসর হবে- তা আল্লাহ্‌-ই জানেন । হযরত জিব্রাঈল (আঃ) শুধু দেখেছেন হুযুরের বাহ্যিক রুপ । বাতেনী দিকটি ছিল তাঁর অজানা ।

রাসূল করীম (দঃ) এর সৃষ্টি রহস্য এত গভীর যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেহই প্রকৃত অবস্থা জানেনে । দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা কাসেম নানুতবী সাহেব নবী করিম (দঃ) এর বাহ্যিক আবরণের ভিতরে যে প্রকৃত নূরানী রুপটি লুক্কায়িত ও রহস্যাবৃত রয়েছে, তা মুক্তকন্ঠে স্বীকার করেছেন এভাবেঃ

হে প্রিয় নবী (দঃ)! আপনার প্রকৃত রুপটি তো বশরিয়তের আবরনে ঢাকা পড়ে আছে । আপনাকে আপনার প্রভু (ছাত্তার) ছাড়া অন্য কেহই চিনতে পারেনি ।

এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, রাসূল করীম (দঃ) এর রুপ বা অবস্থা তিনটি । যথা- ছুরতে বাশারী, ছুরতে মালাকী ও ছুরতে হক্কী । (তাফসীরে রুহুল বয়ান ও তাফসীরে কাদেরী) । সাধারণ মানুষ শধু দেখতে পায় বশরী ছুরতটি । অন্য দুটি ছুরত বা অবস্থা খাস লোক ছাড়া দেখা বা অনুধাবন করা সম্ভব নয় ।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)