নূরে মোহাম্মদীর (দঃ) স্থানান্তরঃ আদম (আঃ) এর ললাটে

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিস্তারিত জীবনী



  • নূরে মোহাম্মদীর (দঃ) স্থানান্তরঃ আদম (আঃ) এর ললাটে















হযরত আদম আলাইহিস সালাম-এর দেহ পৃথিবীর মাটি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। বিবি হাওয়া (আঃ) হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পাঁজরের হাঁড় দ্বারা পয়দা হয়েছেন। হযরত ঈসা (আঃ) শুধু রুহের দ্বারা পয়দা হয়েছেন। সাধারণ মানব সন্তান পিতা-মাতার মিলিত বীর্যের নির্যাস দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী ও আল্লাহর প্রিয় হাবীব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নূর হতে পয়দা হয়েছেন। কোরআন ও হাদীসের দ্বারাই এ সত্য প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং সকল মানুষই মাটির সৃষ্টি-এরূপ দাবি করা গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই নয়। মিনহা খালাক্নাকুম আয়াতের ব্যাখ্যা দেখুন।

পৃথিবীর চল্লিশ হাজার বছরের সমান ঐ জগতের চলি্লশ দিনে হযরত আদম (আঃ)-এর খামিরা শুকানো হয়েছিল। তারপর হযরত আদমের (আঃ) দেহে রুহ্ ফুঁকে দেয়া হয়েছে। বর্ণিত আছে-প্রথমে আদম (আঃ)-এর অন্ধকার দেহে রুহ্ প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ললাটে হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ)-এর নূর মোবারকের অংশবিশেষ স্থাপন করা হয় এবং এতে দেহের ভেতরে আলোর সৃষ্টি হয়। তখনই আদম (আঃ) মানবরূপ ধারণ করেন এবং হাঁচি দিয়ে আল্হামদুলিল্লাহ পাঠ করেন। আমাদের প্রিয় নবী (দঃ)ও সৃষ্টি হয়েই প্রথমে পাঠ করেছিলেন আল্হামদুলিল্লাহ। তাই আল্লাহতায়ালা মানব জাতির প্রথম প্রতিনিধি হযরত আদম (আঃ) এবং বিশ্ব জগতের প্রতিনিধি হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ)-এর প্রথম কালাম 'আল্হামদুলিল্লাহ' দিয়ে কোরআন মাজিদ শুরু করেছেন (তাফসীরে নঈমী)।

এভাবে ঐ জগতের একহাজার আট কোটি বছর পর মোহাম্মদী নূর হযরত আদম (আঃ)-এর দেহে স্থানান্তরিত হয়। প্রথমে ললাটে, তারপর ডান হাতের শাহাদত অঙ্গুলিতে এবং পরে পৃষ্ঠদেশে সেই নূরে মোহাম্মদীকে (দঃ) স্থাপন করা হয়। এরপর জান্নাতে, তারপর দুনিয়াতে পাঠানো হয় সে নুরকে। ১০৬ মোকাম পাড়ি দিয়ে তিনি অবশেষে মা আমেনার উদর হতে মানব সূরতে ধরাধামে আত্মপ্রকাশ করেন।

হযরত আদম (আঃ)কে বলা হয় প্রথম বশর অর্থাৎ প্রকাশ্য দেহধারী মানুষ। এর পূর্বে কোনো বশর ছিল না। আমাদের প্রিয় নবী (দঃ) তো হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির লক্ষ-কোটি বছর পূর্বেই পয়দা হয়েছিলেন। তখন তিনি বশরী সুরতে ছিলেন না এবং তাঁর নামও বশর ছিল না। তাঁর বশরী সুরত প্রকাশ হয়েছে দুনিয়াতে এসে। এটা উপলব্ধি করা এবং হৃদয়ঙ্গম করা ঈমানদারের কাজ-(জাআল হক-বশর প্রসঙ্গ)। তাই তাঁকে 'ইয়া বাশারু' বলে ডাকা হারাম (১৮ পারা)।

হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির পূর্বে নবীজী ছিলেন নূরে মোজাররাদ এবং নবী খেতাবে ভূষিত-(মাওয়াহেব ও মাদারেজ)। মৌলুদে বরজিঞ্জি নামক বিখ্যাত আরবি কিতাবের লেখক ইমাম ও মোজতাহেদ আল্লামা জাফর বরজিঞ্জি মাদানী (বহঃ) লিখেন-

যখন আল্লাহ তায়ালা হাকিকতে মোহাম্মদী প্রকাশ করার ইচ্ছে করলেন-তখন হযরত আদম (আঃ)কে পয়দা করলেন এবং তাঁর ললাটে হযরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর পবিত্র নূর স্থাপন করলেন

আহসানুল মাওয়ায়েয কিতাবে উল্লেখ আছে- একদিন আল্লাহর কাছে হযরত আদম (আঃ)- নূরে মোহাম্মদী (দঃ) দর্শনের জন্য প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান হাতের শাহাদাত অঙ্গুলীর মাথায় নূরে মোহাম্মদী প্রদর্শন করালেন। মধ্যমা অঙ্গুলীতে হযরত আবু বকর, অনামিকায় হযরত ওমর, কনিষ্ঠায় হযরত ওসমান ও বৃদ্ধাঙ্গুলীতে হযরত আলী (রাঃ)-এই সাহাবী চতুষ্টয়ের দেদীপ্যমান নূরও প্রদর্শন করালেন। অতঃপর সেই নূর স্থাপন করলেন হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে- যাঁর দেদীপ্যমান ঝলক চমকাতো তাঁর ললাটে। আল্লামা ইউসুফ নাবহানীর আনওয়ারে মোহাম্মদী নামক জীবনী গ্রন্থের ১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।

যখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদমকে পয়দা করলেন, তখন ঐ নূরে মোহাম্মদী তাঁর পৃষ্ঠে স্থাপন করলেন। সে নূর তাঁর ললাটদেশে চমকাতো।

বেদায়া ও নেহায়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদিন নবী করীম (দঃ)-এর খেদমতে আরয করলেন-

ইয়া রাসুলাল্লাহ (দঃ), হযরত আদম (আঃ) যখন জান্নাতে ছিলেন, তখন আপনি কোথায় ছিলেন ? হুযুর পুরনূর (দঃ) মুচকি হাসি দিয়ে বললেন- আদমের ঔরসে। তারপর হযরত নূহ (আঃ) তাঁর ঔরসে আমাকে ধারণ করে নৌকায় আরোহন করেছিলেন। তারপর হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে। তারপর পবিত্র (ঈমানদার) পিতা মাতাগণের মাধ্যমে আমি পৃথিবীতে আগমন করি। আমার পূর্ব পুরুষগণের মধ্যে কেহই চরিত্রহীন ছিলেন না

— বেদায়া-নেহায়া ২য় খণ্ড ২৫ পৃষ্ঠা

সুতরাং হযরত আদম (আঃ) ও তাঁর বংশধরগণ ছিলেন প্রিয় নবীর বাহন মাত্র।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে- নিজের আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করা আল্লাহ প্রদত্ত ইলমে গায়েব ছাড়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুযুর (দঃ)-এর আদি জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা করার প্রথা তিনি নিজেই চালু করেছেন। মিলাদ মাহফিলের মূল প্রতিপাদ্যই হলো নবী জীবনী আদি-অন্ত আলোচনা করে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করা। হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত নবীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ছিল নবী করীম (দঃ)-এর জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা। হযরত ইসা (আঃ) তো নবী করিম (দঃ)-এর বেলাদতের ৫৭০ বছর পূর্বেই মিলাদ মাহফিল করেছেন বনী ইসরাঈলের লোকজন লোকজন নিয়ে। কোরআন মজিদের ২৮ পারা সূরা সাফ-এর মধ্যে আল্লাহ তায়ালা হযরত ঈসা (আঃ)-এর এই সম্মিলিত মিলাদ মাহফিলের বর্ণনা দিয়েছেন। বেদায়া ও নেহায়া গ্রন্থের ২য় খণ্ডে ২৬১ পৃষ্ঠায় ইবনে কাছির হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন

হযরত ঈসা (আঃ) সে সময় কেয়াম অবস্থায় মিলাদ মাহফিল করেছিলেন ।

সুতরাং মিলাদ মাহফিল নতুন অনুষ্ঠান নয়। ফিরিস্তা এবং নবীগণের অনুকরণেই পরবর্তী যুগে বুযুর্গানেদ্বীন কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান মিলাদ মাহফিল প্রচলিত হয়েছে। মিলাদ কিয়াম ভিত্তিহীন নয়। যারা ভিত্তিহীন বলে- তাদের কথারই কোনো ভিত্তি নেই। মিলাদ মাহিফলের বৈধতার উপর তিন শতের উপর কিতাব রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে মওলুদে বরজিঞ্জি গ্রন্থখানী আরব আজমের সর্বত্র অধিক সমাদৃত হয়ে আসছে। পাক-ভারত উপমহাদেশে শেখ আবদুল হক মোহাদ্দেছ দেহলভী (রাঃ)-এর মাদারিজুন্নবুয়ত ও আল্লামা কাজী ফযলে আহমদ (লুধিয়ানা) লিখিত আন্ওয়ারে আফতাবে সাদাকাত গ্রন্থদ্বয় মিলাদ শরীফের বৈধতার প্রামাণিক দলীল।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)