প্রশ্নঃ শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত, ও ইলমে মারেফত, এ সমস্ত কুরআন সুন্নাহ সম্মত কি না?

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
সম্পূর্ন প্রশ্নঃ

শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত, ও ইলমে মারেফত, এ সমস্ত কুরআন সুন্নাহ সম্মত কি না? এবং এ সমস্ত নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠত করা যাবে কি না? বর্তমান আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বক্তাগন ওয়াজ মাহফেলে বক্তব্য দিয়ে থাকেন যে শরীয়ত, তরীকত, হাকিকত ও মারেফত বলে কুরআন ও হাদিস শরীফে কোথাও কোন কিছু নেই। উক্ত বক্তারা বলে থাকেন যে ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করার জন্য রাছুলুল্লাহ (ছাঃ) এর পথ ও মত ছেড়ে দিয়ে উক্ত পদ্ধতি ধরেছে এবং আরও তারা বলে থাকেন যে, পীর সাহেবদের কাছে মুরিদ বা বাইয়্যাত হওয়া নাজায়েজ।

উত্তরঃ

এ প্রসঙ্গে প্রথমে আমি মহান কুরআন পাকের পবিত্র আয়াত শরীফে উল্লখ্য করছি। আল্লাহ পাক বলেনঃ

লাকাদ মান্নাল্লাহু আলাল মোমিনীনা ইঁজ বা ' আছা ফীহিম রাছুলাম মিন আনফুছিহিম ইয়াতলু আলাইহিম আ-ইয়াতিহী ওয়া ইয়ূজাক্কিহিম অয়া ইয়ূ আল্লীমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাহ অয়া ইন কানু মিন কাবলু লাফী দ্বালা-লিম মুবীন।

— সূরা আল এমরান, আয়াত ১৬৪

অর্থ্যাৎ মুমিনদের প্রতি আল্লাহ পাকের বড়ই ইহসান যে তাদের মধ্যে হতে তাদের জন্য একজন রসূল প্রেরন করেছেন, তিনি আল্লাহ পাকের আয়াতগুলি তিলায়াত করে শুনাবেন তাদেরকে তাজকিয়া (পরিশুদ্ধ) করবেন এবং কিতাব ও হিকমত (আধ্যাতিক) জ্ঞান শিক্ষা দিবেন। যদিও তারা পূর্বে হেদায়েত প্রাপ্ত ছিল না। অনুরূপ সুরা বাকারা ১২৯ ও ১৫১ নং আয়াত শরীফে উপরোক্ত আয়াত শরীফের সমর্থবোদক আয়াত শরীফে উল্লেখ আছে। মূলতঃ উল্লেখিত আয়াত শরীফে বিশেষভাবে চারটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তন্মধ্যে আয়াত শরীফ তেলাওয়াত করে শুনানো এবং কেতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়া এ তিনটি বিষয় হচ্ছে এলমে জাহির বা ইলমে ফিকাহ এবং ইলমে মারেফতের অন্তর্ভূক্ত। যা এবাদাতে জাহের বা দ্বীনের যাবতীয় বাহ্যিক হুকুম আহকাম পালন করার জন্য ও দৈনন্দিক জীবন যাপনের জন্য হালাল কামাই করার জন্য প্রয়োজন। আর চতুর্থ হচ্ছে তাজকিয়ায়ে "ক্বলব" অর্থ্যাৎ অন্তর পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ করা। মুফাসসিরীনে কিরামগন "ইউযাক্কীহিম" এর ব্যাখ্যায় প্রসি্দ্ধ তাফসীরের কিতাব যেমন তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে কামালাইন, বায়হাকী, ইবনে কাছীর, রুহুল বয়ান, তাফসীরে মাজহারী, মারেফুল কোরআন সহ আরও অনেক তাফসীরে তাজকিয়ায়ে কলব বা অন্তকরন পরিশুদ্ধ করাকে ফরজ বলেছেন এবং তজ্জন্যে এলমে তাসাউফ অর্জন করাকে ফরজ বলেছেন। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মুফাসসিরে ফকিহুল উম্মত হযরত মাওলানা শায়েখ ছানাউল্লাহ পানি পথি (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে মাজহারীতে উল্লেখ করেন যে সকল লোক ইলমে লা-দুন্নী বা ইলমে তাছাউফ হাছিল করে তাদেরকে সূফি বলে। তিনি ইলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ আইন বলেছেন। কেননা ইলমে তাছাউফ মনকে বা অন্তর করনকে গায়রুল্লাহ হতে ফিরিয়ে আল্লাহ পাকের দিকে রুজু করে দেয়। সর্বদা আল্লাহ পাকের হুজুরী পয়দা করে দেয় এবং ক্বলব্ বা মন থেকে বদ খাছলত সমূহ দূর করে নেক খাছলত সমূহ পয়দা করে অন্তরটা পরিশুদ্ধ করে দেয়।

আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য ইলমে তাসাউফ যে ফরজ এ প্রসঙ্গে খাতিমুল মুফাসসিরীন আল্লামা হযরত ইসমাইল হাক্কি (রহঃ) তাঁর তাফসীরে রুহুল বয়ানে উল্লেখ করেন যে, দ্বিতীয় প্রকার ইলেম হচ্ছে ইলমে তাছাউফ যা ক্বলব বা অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ইলমে অর্জন করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফরজ।

এলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ হওয়া সম্পর্কে জামিউল উসুল নামক কেতাবে উল্লেখ আছে যে, এলমে তাছাউফ যা বদ খাছলত সমূহ হতে নাজাত বা মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। পক্ষান্তরে আল্লাহ প্রাপ্তি রিপু বিনাশ ও সংযম শিক্ষার একমাত্র পথ। এই জন্য ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করা ফরজে আইন।

মূলতঃ শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মারেফত এ সব প্রত্যেকতটিই কোরআন সুন্নাহ সম্মত এবং তা মানা ও বিশ্বাস করে কায্যে পরিনত কোরআন সুন্নাহরই নির্দেশের অর্ন্তভূক্ত।

আল্লাহপাক তাঁর কালাম পাকে এরশাদ করেন

লি-কুল্লিন-জ্বায়াল না মিনকুম শির আতাউ ওয়া মিনহাজ।

অর্থ্যাৎ আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি জীবন বিধান বা শরীয়ত অপরটি তরীকত সম্পর্কিত বিশেষ পথ নির্ধারন করে দিয়েছি

— সূরা মায়ীদা, আয়াত ৪৮

আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে

শরীয়ত একটি বৃক্ষ স্বরূপ তরীকত তার শাখা প্রশাখা মারিফত তার পাতা এবং হাকিকত তার ফল

— সিসরুল আসরার

হাদীস শরীফে আরও এরশাদ হয়েছে

শরীয়ত হলো আমার কথা সমূহ (আদেশ নিষেধ), তরীকত হলো আমার কাজ সমূহ (আমল), হাকিকত হলো আমার গুপ্ত রহস্য।

উল্লেখ্য যে, উক্ত শিক্ষা বা এলমে তাছাউফ অর্জন করার ও এছলাহে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কোন কামিল মোকাম্মেল পীর সাহেবের নিকট বাইয়ত হওয়া যিনি ফয়েজ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এখন প্রশ্ন হলো এছলাহে নাফ্স বা আত্মশুদ্ধি লাভ করা ফরজ হয় আর তা লাভ করার মাধ্যমে বাইয়াত হয় তবে বাইয়াত হওয়া নাজায়েজ হয় কি করে?

তরীকত যথাযথ ভাবে পালন করতে হলে দ্বীনে এলেম অর্জন করতে হবে যা ফরজ। এ এলেম দু'প্রকার

  1. ইলমে ফিকাহ
  2. ইলমে তাছাউফ।
  • ইলমে ফিকাহ ইলমে ফিকাহ দ্বারা এবাদাত জাহিরা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়।
  • ইলমে তাছাউফ যার দ্বারা ইলমে তাছাউফ যার দ্বারা এবাদাত বাতিনা বা আভ্যন্তরীন অবস্থা পরিশুদ্ধ হয়ে ইখলাছ অর্জিত হয়ে।

এ মর্মে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে

আল এলমে এলমানে ইলমুল ফিল ক্বালবে ফাজাকাল ইলমুল নাফেউ ওয়া ইলমুল আলাল লেছান ফাজাকা হুজ্জাতুল্লাহে আলা এবনে আদামা"।

এলেম দু'প্রকার (১) ক্বালবী এলেম। এটা হলো উপকারী এলেম। (২) লিসানী বা জবানী এলেম। এটা হলো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে আদম সন্তানদের প্রতি দলিল স্বরূপ।

— মিশকাত শরীফ

আর এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মালিকী মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম, ইমামুল আইম্মা রঈসুল মুহাদ্দিসীন ফকরুল ফুকাহা শাইখুল উলামা হযরত ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন

যে ব্যক্তি এলেম ফিকাহ (জবানী এলেম) অর্জন করলো কিন্তু এলেম তাছাউফ (ক্বালবী) এলেম করলো না সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাউফের দাবী করে কিন্তু শরীয়ত স্বীকার করেনা সে ব্যক্তি যিন্দীক (কাফের) আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকার এলেম অর্জন করলো সে ব্যক্তি মুহাক্কিক তথা মুমিনে কামেল।

— মিরকাত

অর্থ্যাৎ এলমে ফিকাহ ও এলমে তাছাউফ উভয় প্রকার এলেম অর্জন করতঃ দ্বীনের উপর সঠিকভাবে চলার ফোশেশ করা প্রত্যেকের জন্য ফরজ। বর্তমান পীর সাহেবদের কাছে আসল সত্য জিনিস বা শিক্ষা না থাকাতে মানুষ প্রকৃত মুমিন হতে পারছে না। কেবল মাত্র ক্বলব নামক অমূল্য রতনটা হস্তগত করতে জীবনের সব সময়ই চলে যায় তবে মানুষ খাঁটি ঈমানদার হবে কবে। এ জন্য আমারা চিন্তা ফিকির করি না। তরীকতের এমন সরল সহজ পথ অবলম্বন করার দরকার যাতে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে উক্ত নেয়ামত পেতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য যে, উক্ত নেয়ামত বা এলমে তাছাউফ অর্জন করার ও এছলাহে নফ্স বা আত্মশুদ্ধি লাভ করার একমাত্র মাধম হচ্ছে কোন কামিল মোকাম্মেল পীর সাহেবের কাছে বাইয়াত হওয়া। এখন প্রশ্ন হলো তাছকিয়াহ নাফ্স বা আত্মশুদ্ধি লাভ করা যদি ফরজ হয় আর তা লাভ করার মাধ্যম বাইয়াত হয় তবে বাইয়াত হওয়া নাজায়েজ হয় কি করে? কেননা উছুলই রয়েছে যে আমলের দ্বারা ফরজ পূর্ন হয় এবং সেই ফজরকে পূর্ন করার জন্য সেই আমল করা ও ফরজ। উদাহরন দিলে বুঝতে পারবেন যেমন এ প্রসঙ্গে "দুররুল মুখতার" কেতাবে উল্লেখ আছে যে আমল ব্যতীত ফরজ পূর্ন হয় না বা আদায় হয় না সে ফরজ আদায় করার জন্য সেই আমলটাও ফরজ। যেমন উদাহরন স্বরূপ বলা যায় নামাজ আদায় করা ফরজ। আর এই নামাজ আদায় হওয়ার একটি শর্ত হচ্ছে পবিত্রতা অর্জন করা অর্থ্যাৎ ওজু। যখনই যে নামাজ আদায় করবে তখনই তার জন্য ওযু করা ফরজ হয়ে যাবে। যেহেতু ওজু ছাড়া নামাজ হবে না ঠিক তদ্রুপই এলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ। আর বাইয়াত হওয়াও ফরজ। আর হাদীস শরীফে ভাষায় এ ধরনের ফরজ সমূহকে অতিরিক্ত ফরজ বলে গন্য করা হয়েছে। কাজেই উক্ত হাদিসে বর্ণিত অতিরিক্ত ফরজের অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে মাজহাব মানা বাইয়াত হওয়া ইত্যাদি।"

মূলতঃ পীর মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হতে হবে। এটা মহান আল্লাহ পাকের কালামে অসংখ্যা আয়াত দ্বারাই প্রমানিত। যদি এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মহাজ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ গন যদি নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার জন্য না মানেন তবে কার কি বলার আছে। তাদেরকে যতই বুঝানো হউক না কেন কিছুতেই তাঁরা বুঝাবার চেষ্টা করবে না। বা বুঝিতে সক্ষম হয় না। তাদের ক্বালবে সীল মহর মারা আছে।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তাঁর পবিত্র কালামে এরশাদ করেন "ইয়া আইয়্যুহাল্লাজীনা আ-মানুত্তাক্কুলা-হা অ-কুনু মা আছ্ছা-দি-কীন"। অর্থ্যাৎ "হে ঈমানদারগন! তোমরা আল্লাহ পাককে ভয় কর। আর ছাদেকিনদের সঙ্গী হও" (সূরা তওবা, আয়াত-১১৯)। এই আয়াত পাকে আল্লাহ পাক মূলতঃ পীর মাশায়েক গনের সঙ্গী বা সোহ্ বত এখতিয়ার করার কথায় বলেছন। কারন হক্কানী মুর্শিদগনই হাক্কিকি ছাদেকীন। আল্লাহ পাক তাঁর পাক কালামে আরো বলেন "ইয়া আইয়্যূলহাল্লাজীনা আ-মানুত্তা কুল্লাহা অবতাগু ইলা ইল অছিলাতা অ জ্বা-হিদু ফি ছাবিলিহী লা আল্লাকুম তুফলিহুন"। অর্থ্যাৎ "হে ঈমানদারগন তোমরা আল্লাহপাককে ভয় কর। আর তাঁর সন্তষ্টি লাভের জন্য উছিলা গ্রহন কর (সুরা মায়িদা, আয়াত-৩৫)। মুফাসিরীনগন বলেন উল্লিখিত আয়াত শরীফে বর্ণিত উছিলা দ্বারা তরীকতের মাশায়েকগনকে বুঝানো হয়েছে। যদিও অনেকে নামাজ রোজা হজ্ব যাকাত দান সদকা জিহাদ ইত্যাদিকে উছিলা বলে উল্লেখ করেছ। কিন্তু হাকিকতে পীরগনই হচ্ছেন প্রধান ও শ্রেষ্ঠতম উছিলা। কারন পীর সাহেবদের নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত তাজকেয়া নাফ্স বা আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয় না। আর আত্মশুদ্ধি ব্যতীত নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত জিহাদ তাবলীগ কোন কিছুই আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হয় না বা নাজাতের উছিলা হয় না। তাই দেখা যাবে অনেক লোক নামাজ রোজা হজ্ব যাকাত দান ছদকা জিহাদ তাবলীগ করে এক চানছে জাহান্নামে যাবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেন, "ফাওয়াইলুল্লিলমুছাল্লিন"। অর্থ মুসুল্লীদের জাহান্নাম (সূরা মাউন, আয়াত-৭)। কোন মুসুল্লী জাহান্নামে যাবে- যে মুছল্লী তাজকেয়াহ নাফসের মাধ্যমে অন্তর থেকে রিয়া দূর করে "ইখলাছ" হাছিল করেনি তাই সে মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করেছে। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্য নামাজ আদায় করেনি। আল্লাহ বলেন "আল্লাজিনা হুম ইউরা-উন"। অর্থ তারা ঐ নামাজী যারা রিয়ার সহিত নামাজ আদায় করেছে (সূরা-মাউন, আয়াত-৬)।

আমি একটি বড় হাদীস শরীফ উল্লেখ করলাম তাহলে আপনারা বেশ বুঝিতে পারবেন। মুসলিম শরীফের ছহীহ হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে কেয়ামতের দিন শহীদ, দানশীল ও দ্বীন প্রচারকারী আলেম এই তিন প্রকার লোক থেকে কিছু লোককে সর্ব প্রথম জাহান্নামে নিক্ষপ করা হবে। যেহেতু তারা এখলাছের সাথে জিহাদ তাবলীগ দান ছদকা করেনি। যে আলেম Stage এ উঠে বলে থাকে কোরআন শরীফে বর্ণিত উছিলা হচ্ছে নামাজ রোজা হজ্ব যাকাত জিহাদ ইত্যাদি তাদের কাছে আমার প্রশ্ন তা হলে নামাজ আদায় করে জিহাদ করে ইলিয়াছ তাবলীগ করেও বান্দা জাহান্নামে যাবে কেন? কেনো উক্ত আমল সমূহ তার জন্য নাযাতের উছিলা হলো না। নিশ্চয়ই আপনারা বলবেন তাদের এখলাছ ছিল না। কেন এখলাছ ছিল না? তারা কামেল ও মোকাম্মেল পীরের নিকট বাইয়াত হয়ে এলমে তাছাউফ আমলের মাধ্যমে তাজকিয়াহ নফস না করে আত্মশুদ্ধি লাভ করতঃ এখলাছ অর্জন করেনি। তা'হলে বুঝা গেল, পীর সাহেবই হচ্ছেন প্রধান ও শ্রেষ্টতম উছিলা। তথা উছিলা সমূহের উছিলা। কারন তাদের কাছে বাইয়াত হওয়ার উছিলাতেই এছলাহ লাভ হয়, এখলাছ অর্জিত হয়। যার ফলে নামাজ রোজা জিহাদ তাবলীগ দান খয়রাত কবুল হয় বা নাজাতের উছিলা হয়।

কামেল ও মোকাম্মেল পীর সাহেবদের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন "মাই ইয়াহদিল্লাহু ফাহুঅল মুহতাদ অমাই ইয়ুদ্বলিল ফালান তাজিদালাহু ওলিইয়্যাম মুর্শেদা"। অর্থ্যাৎ যে ব্যক্তি হেদায়েত চায় আল্লাহ পাক তাকে হেদায়ত দেন আর যে ব্যক্তি গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ় থাকে সে কখনও ওলিয়ে কামেল মুর্শিদ খুঁজে পাবে না (সূরা-কাহাফ, আয়াত-১৭)। উক্ত আয়াত শরীফের দ্বারা মূলতঃ এটাই বুঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি কোন কামেল মোকাম্মেল পীর সাহেবদের নিকট বাইয়াত হয়নি সে ব্যক্তি গোমরাহ"।

হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত আওফ বিন মালেক আশজায়ী (রাঃ) বলেন, আমরা ৯ জন কিংবা ৮ অথবা ৭ জন নবী করীম (ছাঃ) এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। হযরত নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমরা কি আল্লাহর রছুলের হাতে বাইয়াত হবে না? আমরা নিজ নিজ হাত প্রসারিত করে দিলাম এবং বললাম হে আল্লাহ পাকের রাছুল (ছাঃ) কোন বিষয়ের বাইয়াত হব? নবীজি পাক (ছাঃ) বললেন, এই বিষয়ের উপর যে তোমরা আল্লাহ পাকের এবাদত করবে। তাঁর সহিত কাহাকেও শরীক করবে না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েম করবে এবং যাবতীয় হুকুম আহকাম শুনিবে ও মান্য করিবে। (মুসলিম, আবু দাউদ ও নাছাই শরীফ) পীর মাশায়েখ গনের মধ্যে বাইয়াত করার যে প্রথা প্রচলিত তার সার মর্ম হইল জাহেরী ও বাতেনী আমলের উপর দৃঢ়তা অবলম্বন করা এবং গুরুত্ব প্রদান করার অঙ্গীকার করা। তাদের পরিভাষার ইহাকে বাইয়াতে তরীকত অর্থ্যাৎ তরিকতের কাজ বা আমল করার অঙ্গীকার করা। কোন কোন স্থুল দৃষ্টি সম্পন্ন আন্তর্জাতিক বক্তাগন এই বাইয়াতকে নাজায়েজ বলে থাকেন। কারন হিসাবে বলেন যে হুজুর পাক (ছাঃ) হতে ইহা বর্ণিত নাই। তখন শুধু কাফের দিগকে ইসলামের বাইয়াত করার দরকার ছিল। কিন্তু উল্লেখিত হাদীশ শরীফে এই বিষয়ের স্পষ্ট প্রমান বিদ্যমান রয়েছে। তাই অনেক ইমাম মুজতাহিদ আলেমগন বলেছেন "মান লাযছা লাহু শায়েখুন ফা-শায়েখুশ শয়তান"। (ইমাম গাজ্জালী)। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ), হযরত জোনায়েত বাগদাদী (রহঃ) অর্থ্যাৎ যে ব্যক্তি কোন হাক্কানী পীর বা শায়েখ গ্রহন করেনী তার শায়েখ বা ওস্তাদ হয় শয়তান। শয়তানই তাকে গোমরাহ বা বিভ্রান্ত করে দেয়। কাজেই গোমরাহী থেকে বাঁচা যেহেতু ফরজ সেহেতু পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত তা সম্ভব নয়। তাই পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ও ফরজ। আর ঠিক এ কথাটি বলেছেন আমাদের হানাফী মজহাবের ইমাম, ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ)। তিনি বলেন, “লাওলা ছানাতানি লাহা লাকা আবু নোমান”। অর্থ্যাৎ“আমি নোমান বিন ছাবিত দু’টি বছর না পেতাম তবে হালাক হয়ে যেতাম”। অর্থ্যাৎ যদি আমি আমার পীর সাহেব ইমাম বাকের ও ইমাম জাফর সাদেক (রহঃ) এর নিকট বাইয়াত হয়ে দু’টি বছর অতিবাহিত না করতাম তবে আত্মশুদ্ধি লাভ না করার কারনে গোমরাহ ও হালাক হয়ে যেতাম। আর বিখ্যাত কবি, দার্শনিক ও আলেমকুল শিরোমনি বিশিষ্ট সুফি সাধক হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রহঃ) বলেন আমি মাওলানা রুমী ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ ওয়ালা হতে পারেনী যতক্ষন পর্যন্ত আমার পীর হযরত শামছে তাবরীজ (রহঃ) এর নিকট বাইয়াত হয়ে এলমে তাছাউফ আমল করে এখলাছ হাছিল না করেছি অর্থ্যাৎ এলমে তাছাউফ আমলের মাধ্যমে এখলাছ অর্জন করার পরই আমি হাকিকী মুমিন হতে পেরেছিলাম, তিরমিজি ইত্যাদি।

তাই কাদেরীয়া তরীকার ইমাম হযরত গাওছুল আযম মাহবুবে ছোবহানী কুতুবে রব্বানী গাওছে সামদানী শায়েখ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদের জীলানী (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত কেতাব “সিররুল আসরার” এর ৫ম অধ্যায়ে তওবার বয়ানে লিখেছেন ক্বলব বা অন্তরকে জীবিত বা যাবতীয় কু-রিপু হতে পবিত্র করার জন্য আহলে তালকীন অর্থ্যাৎ পীরে কামেল গ্রহন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ। হাদীস শরীফে যে এলেম অর্জন করা ফরজ বলা হয়েছে তদ্বারা এলমে মারিফত ও কোরবতকেই বুঝানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও অন্যান্য সর্বজন মান্য ও সর্বজন স্বীকৃত ইমাম মুজতাহিদ ও আওলিয়া ই- কিরাম গন (রহঃ) পীর সাহেবদের নিকট বাইয়াত গ্রহন করা ফরজ বলে ফতওয়া দিয়েছেন।

যেমন হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) তাঁর ইহইয়াউল উলুমুদ্দীন ও কিমিয়া সায়াদাত কিতাবে হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি আজমেরী (রহঃ) তাঁর লিখিত আনিসুল আরওয়াহ কিতাবে ইমামুশ শরীয়াত ওয়াত তরীকত শায়েখ আবুল কাশেম কুশাইরী (রহঃ) রিছালায়ে কুশাইরিয়া কিতাবে হযরত মাওলানা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথি (রহঃ) মালাবুদ্দা মিনহু ও এরশাদুত্তালেবীন কিতাবে শাহ আব্দুল আজিজ মহাদ্দিস দেহলভী (রহঃ) তাফসীরে আজিজ নামক কেতাবে হাফিজে হাদিস আল্লামা রুহুল আমীন (রহঃ) তাছাউফ তত্ত্ব বা তরীকত দর্পন নামক কেতাবে, আল্লামা শামী (রহঃ) রদ্দুল মুহতার কেতাবে, ইমাম ফকরুদ্দীন রাজী (রহঃ) তার তাফসীরে কবীর কেতাবে, কাইয়্যুমে আউয়াল আফজালুল আউলিয়া হযরত ইমাম মোজাদ্দেদ আলফে ছানী (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত আলোড়ন সৃষ্টিকারী মকতুবাদ শরীফে, হযরত ইমাম আহমদ রেফায়ী (রহঃ) তাঁর বুনইয়ানুল মুশাইয়্যদ কেতাবে, হযরত ইসমাঈল হাক্কি (রহঃ) তাফসীরে রুহুল বয়ানে সরাসরি পীর গ্রহন করা ফরজ বলে ফতুয়া দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে হাদিয়ে বাঙ্গাল মুজাহিদে আজম শায়খুল মাশায়েখ আল্লামা কারামত আলী জৌনপুরী (রহঃ) তাঁর যদুত তাকাওয়াতে লিখেছেন যে এলমে তাছাউফ ব্যতিত ইলমে শরীয়তের উপর যথাযথ আমল করা কিছুতেই সম্ভব নহে। সুতরাং্ত ছাবেত হলো যে এলমে মারেফত চর্চা করা সকলের জন্যই ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। আর এই এলেমে তাছাউফ পারদর্শী মুর্শিদে কামেল এর সোহবত ও তালীম ব্যতীত তা অর্জন করা কখনও সম্ভব নয়।

হাট হাজারী খারিজিদের মুরুব্বী মুফতী মাওলানা শফি সাহেব স্বয়ং নিজেই মা-আরেফুল কুরআনে সূরা বাকারায় উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে লেখেন আত্মশুদ্ধি অর্জিত হবে না যতক্ষন পর্যন্ত এছলাহ প্রাপ্ত কোন বুর্যুর্গ বা পীরে কামেলের অধীনে থেকে তালীম ও তরবিয়াত হাসিল না করবে। আমল করার হিম্মত তাওফিক কোন কেতাব পড়া ও বুঝার দ্বারা অর্জিত হয় না তাও তা অর্জন করার একটি পথ তা হলো ওলি গনের সোহবাত। খাঁটি অলীর সোহবত হাদীস শরীফ অনুসারে মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে ক্বালব জারী হওয়া বুঝতে পারা।

পীর সাহেব গনই হচ্ছেন হাকিকী আলেম। কেননা পীর সাহেব গনই এলমে শরীয়ত ও মারেফত এই উভয় প্রকার এলমের অধিকারী। আর উক্ত উভয় প্রকারের এলমের অধিকারীগনই হচ্ছেন প্রকৃত আলেম বা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। যেমন এ প্রসঙ্গে ইমামে রব্বানী মাহবুবে সুবহানী কাইয়ূমে আওয়াল সুলতানুল মাশায়েখ হযরত মোজাদ্দেদ আলফে ছানি (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত কেতাব মকতুবাত শরীফে উল্লেখ করেন আলিমগন নবী গনের ওয়ারিছ। এ হাদীস শরীফে বর্ণিত আলেম তারাই যাঁরা নবীগনের রেখে যাওয়া এলমে শরীয়াত ও এলমে মারিফত এই উভয় প্রকার এলমের অধিকারী। অর্থ্যাৎ তিনিই প্রকৃত ওয়ারিছ স্বত্বাধিকারী। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র এক প্রকারের এলমের অধিকারী সে ব্যক্তি নবীগনের প্রকৃত ওয়ারিশ নয়। কেননা পরিত্যক্ত সম্পত্তির সকল ক্ষেত্রে অংশিদারী হওয়াকেই ওয়ারিছ বলে। আর যে ব্যক্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তির কোন নির্দিষ্ট অংশের অধিকারী হয় তাকে গরীম বলে। অর্থ্যাৎ সে ওয়ারিছ নয়। গরীমের অন্তর্ভূক্ত। পক্ষান্তরে যারা পীর সাহেব নয় অর্থ্যাৎ শুধু এলমের শরীয়াতের অধিকারী এলমে তাছাউফ শুন্য তারা আলেম তো নয়ই বরং চরম ফাসিক।

এতএব, প্রমানিত হলো হককানী পীর সাহেব গনই হচ্ছেন প্রকৃত বা খাঁটি আলেমে দ্বীন। ক্বলব জারী করতে হলে তাদের কাছে যেতে হবে। যে ব্যক্তি কোন পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হয়ে আত্মশুদ্ধি লাভ করতঃ খিলাফত প্রাপ্ত হয়নি তার নিকট বাইয়াত হওয়া হারাম।

এতএব, আত্মশুদ্ধি ও এলমে তাছাউফ অর্জন করা যেহেতু ফরজে আইন। আর কামেল পীর সাহেব ব্যতীত এলমে তাছাউফ বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয় সেহেতু একজন কামেল পীর সাহেব অন্বেষন করা বাইয়াত গ্রহন করা ফরজ। এটাই গ্রহন যোগ্য বিশুদ্ধ ও দলিল ভিত্তিক ফতওয়া। এর বিপরীত মত পোষন কারীরা বাতিল ও গোমরাহ।[1]

তথ্যসূত্র

  1. তাফসীরে খাযেন, বাগবী, কুরতবী, ফতহুল কাদীর, এবনে কাসীর, তাবারী দুররে মানছুর, রুহুল বয়ান, রুহুল মায়ানী, মরেফুল কোরআন, বায়হাকি, মুসলিম তিরজিমি ইত্যাদি।

বহিঃসংযোগ