ফতোয়ায়ে আলমগীরী

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
ফতোয়ায়ে আলমগীরী

যদিও সম্রাট আওরঙ্গজেব (আলমগীর) এর শাসনকালের পূর্বে মুসলিম বিশ্বে ফিক্‌হ এর বেশ কয়েকটি প্রামাণিক গ্রন্থ প্রচলিত ছিল, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও গোটা মুসলিইম জাহানে হানাফী ফিক্‌হ এর এমন কোন সহজবোধ্য একক মৌলিক গ্রন্থ বর্তমান ছিলনা, যাহা হইতে একজন সাধারণ মুসলমান অনায়াসে কোন মুফ্‌তাবিহী (যাহার উপর ফতোয়া দেওয়া হয় এমন) মাসআলা সম্পর্কে অবহিত হইতে পারে এবং শারীয়াতের বিধিবিধান সম্যক জ্ঞান লাভ করিতে সমর্থ হয় । স্বয়ং সম্রাট আওরঙ্গজেব (আলমগীর) এর বিশেষ আগ্রহ ছিল যাহাতে সকল মুসলমান ঐ সমুদয় মাসআলার উপর আমল করিতে পারে, যাহা হানাফী মাযহাবের আলিমগণ অবশ্য পালনীয় মনে করিয়া থাকেন । কিন্তু সমস্যা ছিল যে, উলামা ও ফুকাহা-ই কিরামের মতভেদের দরুন এইসব মাসআলা ফিকহী কিতাব ও ফতোয়া গ্রন্থসমূহে এমনভাবে মিশ্রিত হইয়া গিয়াছিল যে, একজন লোক যতক্ষণ পর্যন্ত ফিক্‌হশাস্ত্রে পরিপূর্ণ পারদর্শিতা লাভ করিতে না পারে এবং অনেকগুলি সুবৃহৎ গ্রন্থ সংগ্রহ করিতে সমর্থ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সুস্পষ্ট সত্য, মুফতাবিহী-মাসআলা ও বিশুদ্ধ নির্দেশ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা তাহার পক্ষে অসম্ভব ছিল । সম্রাট আলমগীর তাহার এই আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানী দিল্লী ছাড়াও সম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চল হইতে ফিক্‌হ শাস্ত্রে পারদর্শী আলিমগণকে একত্র করিলেন । তিনি তাহাদিগকে নির্দেশ দিলেন যেন বিভিন্ন কিতাবের সাহায্য এমন একখানি প্রামাণিক ও পূর্নতর গ্রন্থ প্রণয়ন করা হয় যাহাতে অত্যন্ত তাহকীক ও বিচার-বিশ্লেষণ সহকারে সমস্ত মাসআলা সন্নিবেশিত থাকিবে । ফলে বিচারক (কাযী) ও মুফতী এবং অন্যান্য সকল মুসলমানকে ফিক্‌হশাস্ত্রের বহু সংখ্যক কিতাবের পাতা উল্টাইতে না হয় ।

উলামা’র এই পরিষদ কমবেশি আট বৎসর সময়সীমার মধ্যে ফতোয়ার একখানি সুবৃহৎ গ্রন্থ প্রণয়ন করিলেন । সম্রাটের নামানুসারে ইহার নাম হইল ফতোয়ায়ে আলমগীরী । এই গ্রন্থের সঙ্কলন, উলামা ও ফুকাহা-ই কিরামের বেতন এবং অন্যান্য খরচ বাবদ আলমগীরী মুদ্রার মোট দুই লক্ষ টাকা ব্যয় হইয়াছে । কিতাবখানির গুরুত্ব কতটুকু তাহা ইহা দারা অনুমান করা যাইতে পারে যে, গোটা মুসলিম জাহানে ইহা সমাদৃত হইয়াছে । হানাফী ফিকাহ্‌ আল-মারগীনানী (রহঃ) (ওফাত ৫৯৩ হিঃ) এর হিদায়া গ্রন্থের পরই ইহার মর্যাদা স্বীকৃত । আজিও ইহা অপেক্ষা অধিক বিস্তারিত, সাবলীল ও পরিপূর্ণ কোণ গ্রন্থ বর্তমান নাই । মাআছির-ই আলমগীরীর লেখক যথার্থই বলিয়াছেন,

এই গ্রন্থখানি সকল শ্রেণীর আলিম ও ছাত্রের পক্ষে একখানি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রন্থ ।

ফতোয়ায়ে আলমগীরীর সঙ্কলন ও সম্পাদনায় সম্রাট আলমগীরের শাহী গ্রন্থাগারের বিভিন্ন কিতাব হইতে সাহায্য গ্রহণ করা হইয়াছে যাহার পরিসংখ্যান ১৩০ এর অধিক বলা হইয়াছে । উহাদের মধ্যে কয়েকটি প্রসিদ্ধ কিতাবের নাম উল্লেখ করা হইলঃ

  • হিদায়াঃ,
  • কুদূরী,
  • বিকায়াঃ,
  • ইয়াহাঃ,
  • মাব্‌সূত,
  • মুহীতু বুরহানী,
  • সাগীর,
  • আল-জামিউল কাবীর,
  • ফাতহুল কাদীর,
  • বাদাইউস সানাই,
  • বাহ্‌রুর রাইক,
  • গায়াতুল বায়ান,
  • আস সিরাজুল ওয়াহ্‌হাজ,
  • দুররুল মুখ্‌তার,
  • কাফী,
  • কুন্‌ইয়াতুস সুন্‌ইয়াঃ,
  • বার্‌জান্দী,
  • ফতোয়ায়ে কাযীখান,
  • ফতোয়ায়ে তাতারখানীয়াঃ (ফতোয়ায়ে ইতাবিয়্যা),
  • আত তাজনীস ওয়াল মাযীদ ইত্যাদি ।

গ্রন্থ সঙ্কলনের কাজ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পাদিত হইয়াছে । সম্পাদনা পরিষদের সদস্যবৃন্দের দায়িত্ব ও কার্যাবলী কয়েকভাবে বিভক্ত করিয়া এক এক ভাগকে এক একজন আলিমের দায়িত্বে অর্পণ করা হয় এবং তাহাদের প্রত্যেকের সাহায্যের জন্য দশ দশজন আলিম নিযুক্ত করা হয় । শায়খ নিজামুদ্দিন বুরহানপূরী (রহঃ) এর উপর সামগ্রিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল । সম্রাট স্বয়ং সঙ্কলনের কাজে উৎসাহী ছিলেন । কিছুকাল যাবত শায়খ নিজামুদ্দীন দুই চার পৃষ্ঠা করিয়া তাহাকে নিয়মিত শুনাইতেন । তিনি মাঝে মাঝে ইহার সংশোধনী প্রদান করিতেন । এতটুকুই নহে, বরং সম্পাদনার কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর ভুলত্রুটি পরিমার্জনের জন্য সম্পূর্ণ গ্রন্থকে দ্বিতীয়বার পর্যবেক্ষণ করা হয় । এইরূপ সতর্কতার ফলাফল ইহাই দাঁড়াইয়াছে যে, একখানি সুবৃহৎ গ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও ফতোয়ায়ে আলমগিরই ভুল ত্রুটি হইতে প্রায় মুক্ত । সঙ্কলের কাজকে মোট চার ভাগে বিভক্ত করা হয় । একভাগ কাযী মুহাম্মদ হুসাইন জৌণপুরী (রহঃ), একভাগ মুল্লা মুহাম্মাদ মেছ্‌লি লাহরী (রহঃ), একভাগ সায়্যিদ জালালুদ্দীন মুহাম্মাদ মেছ্‌লী শাহ্‌রী (রহঃ) এবং একভাগ শায়খ ওয়াজীহুদ্দীন গোপামূবী (রহঃ) এর উপর অর্পন করা হয় । তাহাদের সকলের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন শায়খ নিজামুদ্দীন বুরহানপুরী (রহঃ) । প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক খাফী খাঁ (রহঃ) এর বর্ননা মুতাবিক ফতোয়ায়ে আলমগীরীর সঙ্কলে মোট সাত/আট বৎসর সময় ব্যয়িত হইয়াছে । এই হিসাবে আনুমানিক ১০৭৪/৭৫ হিঃ সালে কাজ আরম্ব হইয়া ১০৮২ হিঃ সালের কাছাকাছি সময়ে সমাপ্তিতে পৌছিয়াছে । চল্লশ পঞ্চাশজন আলিম ইহার সঙ্কলনকার্যে অংশ গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া ধারণ করা হয় । মিরআতুল এলাম এর একটি সূত্রে পরিষ্কার বলা হইয়াছে যে, শায়খ ওয়াজীহুদ্দীন এর সাহায্যার্থে দশজন বিদগ্ধ আলিমকে নিযুক্ত করা হইয়াছিল । অনুবাদের কাজ চেলেবী আবদুল্লাহ রুমীর উপর ন্যস্ত করা হইয়াছিল । তিনি সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালে রুম (তুরস্ক) হইতে হিন্দুস্তানে আগমন করিয়াছিলেন । বিভিন্ন জ্ঞানশাস্ত্রে তিনি একজন যুগশ্রেষ্ঠ আলিম ছিলেন । আরবী, ফারসি ও তুর্কী ভাষায় তিনি একজন পারদর্শী লেখক ছিলেন । সম্ভবত অনুবাদটি সমাদৃত হয় নাই যাহার ফলে আজ তাহার কোন কপি পাওয়া যায় না । অবশ্য কিতাবুল হুদুদ ও কিতাবুল জিনায়াত (ফতোয়ায়ে আলমগীরীর দুইটি অধ্যায়) এর ফারসী অনুবাদের একটি হস্তলিখিত কপি বাকীপুর লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে । কাওলিকাতাস্থ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কাউন্সিলরের নির্দেশক্রমে প্রধান বিচারপতি মুহাম্মাদ নাজমুদ্দীণ খাঁ এই অনুবাদটি করিয়াছিলেন । ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতা হইতে উহা প্রকাশিতও হইয়াছিল । অনুবাদকের লিখিত গ্রন্থ ‘কিতাবুত তাযীরাত’ও ঐ অনুবাদের সহিত ছাপা হইয়াছিল । ফতোয়ায়ে আলমগীরীকে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও ইলমী বৈদগ্ধের সহিত সঙ্কলন করা হইয়াছে ।

সমূহ মাসআলাকে হিদায়া গ্রন্থের বিন্যাস অনুযায়ী সাজান হইয়াছে । উহার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আলোচনা পর্যালোচনায় অত্যন্ত সতর্কতা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রহিয়াছে । মাসআলায় কোনরূপ পুনরাবৃত্তি নাই । ভাষা ও উপস্থাপনা সম্পূর্ণ বাড়তি কথামুক্ত । এই গ্রন্থে সাধারণভাবে বিরল মতামত উল্লেখ করা হয় নাই । অবশ্য কোন কোন ক্ষেত্রে অনন্যপায় হইলে নির্দিধায় উহা বর্ণনা করা হইয়াছে । ফতোয়ায়ে আলমগীরীর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হইলে যে, ইহার বরাতসমূহ প্রামাণিক গ্রন্থাদির মূল ভাষা সম্বলিত । কোন মাসআলার যদি দুই বা ততোধিক সমাধান নির্ভরযোগ্য কিতাবে উল্লিখিত হইয়া থাকে, অধিক দলীল-প্রমাণ ও আলোচনা পর্যালোচনার পর যে সমাধানটি অন্য সব মতামতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াছে তাহাই পেশ করা হইয়াছে । অধ্যা, বিভাগ ও বিষয়বস্তুর বিন্যাস খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ । মাসআলা অনুসন্ধানে আদৌ বেগ পাইতে হয় না । মানুষের জ্ঞান ও প্রচেষ্টায় যতদূর সম্ভব ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে কোনরূপ অসতর্ক ও অস্পষ্ট কথা স্থান পায় নাই । এই সব বৈশিষ্ট্যাবলীই ফতোয়ায়ে আলমগীরীকে অন্যান্য ফতোয়ার কিতাব হইতে বিশেষ মর্যাদা দান করিয়াছে ।

গ্রন্থখানি কয়েকবার মুদ্রিত হইয়াছে । ১২৮২ হিজরি সনে কায়রো হইতে ১৩১০-১৩১১ হিজরি সনে মূলাক হইতে, ১২৪৩ হিঃ সনে কলিকাতা হইতে এবং ১২৯২ হিঃ সনে লাখনৌ হইতে ইহা প্রকাশিত হইয়াছে । সাইয়্যিদ আমীর আলী মালীহাবাদী উহার একিটি উর্দূ অনুবাদ পকরিয়াছেন । নাম দিয়াছেন ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া । নওলকিশোর প্রকাশনী হইতে দশ খন্ডে উহা প্রকাশিত হইয়াছে । ইহার প্রথম খন্ড ইহতিশুদ্দীণ মুরাদাবাদী কর্তৃক অনূদিত হয় । অবশ্য সাইয়্যিদ আমীর আলী ইহা সম্পাদনা করিয়াছেন । ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে মিঃ বেলি ইংরেজি বাসায় A Digest of Moohammedan Haneefea and Islamia law in India নামে ফতোয়ায়ে আলমগীরীর একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করিয়াছিলেন । বৃটিশ ভারতে আদালতে দীর্ঘদিন যাবত ফতোয়ায়ে আলমগীরীর অনুসরণে শারঈ মামলা মুকাদ্দামার সমাধান দেওয়া হইত । এই গ্রন্থের অস্তলিখিত কপি বহির্ভারতের বিভিন্ন লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে । ১১০৯ হিঃ সালে এইরূপ একটি প্রাচী কপি বাহীরা (পাঞ্জাব) এর একটি ব্যক্তিগত পাঠাগারে আছে ।

সঙ্কলকমণ্ডলীঃ
১) শায়খ নিজামুদ্দীন বুরহানপুরী (রহঃ)
২) কাজী মুহাম্মাদ হুসাইন জৌনপুরী (রহঃ)
৩) শায়খ ওয়াজীহুদ্দীন গোপামুঈ (রহঃ)
৪) মোল্লা হামীদ জৌনপুরী (রহঃ)
৫) মোল্লা মুহাম্মদ আকরাম লাহোরী (রহঃ)
৬) জালালুদ্দীন মুহাম্মাদ (রহঃ)
৭) সাইয়্যিদ মুহাম্মাদ কান্নূজী (রহঃ)
৮) শায়খ রাদিয়্যুদ্দীন ভাগলপুরী (রহঃ)
৯) মুহাম্মাদ জামিল সিদ্দিকী (রহঃ)
১০) কাজী আলী আকবর এলাহাবাদী (রহঃ)
১১) শায়খ নিজামুদ্দীন ঠাঠ্‌ঠুবী (রহঃ)
১২) শায়খ আবুল খায়র ঠাঠ্‌ঠুবী (রহঃ)
১৩) আল্লামা আবুল ওয়াইজ হারগামী (রহঃ)
১৪) শায়খ আহমাদ ইবন আবূ মান্সূর গোপামুঈ (রহঃ)
১৫) শায়খ মুহাম্মাদ গাছ কাকূরাবী (রহঃ)
১৬) ফাসীহুদ্দীন জাফর ফুলোয়ারী (রহঃ)
১৭) আব্দুল ফাত্তাহ সামদানী (রহঃ)
১৮) কাজী ইসমাতুল্লাহ লাখনৌবী (রহঃ)
১৯) কাজী মুহাম্মাদ দাওলাত ফাত্‌হপুরী (রহঃ)
২০) মুহাম্মাদ সাঈদ সিহালুবী (রহঃ)
২১) কাজী আব্দুস সামাদ জৌনপুরী (রহঃ)
২২) মুফতী আবুল বারাকাত দিহলাবী (রহঃ)
২৩) কাজী সাইয়্যিদ ইনায়াতুল্লাহ মুঙ্গীরী (রহঃ)
২৪) শায়খ মুহাম্মাদ শাফী (রহঃ)
২৫) শায়খ ওয়াজীহুর রাব্ব (রহঃ)
২৬) মাওলানা সাইয়্যিদ মুহাম্মাদ ফাইক (রহঃ) প্রমুখ
অনুবাদক মণ্ডলীঃ
১) কাজী নাজমুদ্দীন খা কাকূরী (রহঃ)
২) সাইয়্যিদ আমীর আলী মালীহাবাদী (রহঃ) প্রমুখ

তথ্যসূত্র

ইসলামী বিশ্বকোষ - ১৪তম খন্ড - ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ