এই সুন্নিপিডিয়া ওয়েবসাইট পরিচালনা ও উন্নয়নে আল্লাহর ওয়াস্তে দান করুন
বিকাশ নম্বর ০১৯৬০০৮৮২৩৪

ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) * কারবালার ইতিহাস * পিস টিভি * মিলাদ * মাযহাব * ইলমে গায়েব * প্রশ্ন করুন

বই ডাউনলোড

ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করা

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

মধ্যপন্থা অবলম্বন করা ইসলামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কোরআন ও হাদিসে অতি উদারতা ও অতি রক্ষণশীলতা পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, অতি উদারতা ও অতি রক্ষণশীলতার কারণে এ উম্মতের ওপর কখনো কখনো বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর মূল কারণ, ব্যক্তিবিশেষের ভিন্নমত সাধারণ উন্মতের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

যেমন একটি মাসয়ালা হলো ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করা। কিছু লোকের অতি রক্ষণশীলতার কারণে এটি মতানৈক্যপূর্ণ মাসয়ালার রূপ ধারণ করেছে। কোরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে এটি একটি সুন্নাত আমল। এটিকে বিদ'আত বলার কোনো অবকাশ নেই। ফরজ নামাজের পর দোয়া করা হাদিসের ছয়টি নির্ভরযোগ্য কিতাব অর্থাৎ সিহাহ সিত্তার মাধ্যমে প্রমাণিত। অন্যদিকে দোয়ার সময় হাত তোলার কথাও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ নেই, যাতে ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করাকে হারাম কিংবা নিষেধ করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের জামানা থেকে আজ পর্যন্ত হাজার বছর ধরে ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করার নিয়ম চলে আসছে। এতে কেউ আপত্তি করেনি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এবং ইমাম আহমেদ (রহ.)-এর মতো অগণিত ফকিহ ও মুহাদ্দিস চলে গেছেন। কোনো একজন ইমামও এ বিষয়ে আপত্তি করেননি। তথাকথিত আহলে হাদিসের আলেম নাসিরুদ্দীন আলবানীর অনুকরণে বর্তমানে কিছু লা-মাজহাবি আলেম ফরজ নামাজের পর হাত তুলে মোনাজাত সম্পর্কে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যা শরিয়তের যুক্তিতে কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নাজদির উত্থানের আগ পর্যন্ত এবং পেট্রো ডলার পাওয়ার আগ পর্যন্ত ফরজ নামাজের পর হাত তুলে মোনাজাতের আমল জারি ছিল। এমনকি লা-মাজহাবিদের বড় বড় আলেমও তা সমর্থন করেছেন। যেমন সায়্যিদ নাজির হোসাইন, নাওয়াব সিদ্দিক হাসান (ভূপালি), সানাউল্লাহ, হাফেজ আব্দুল্লাহ, মাওলানা মুবারকপুরীর মতো লা মাযহাবী ইমামরাও নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করাকে বিদ'আত বলেননি। কয়েকজন লোকের ভিন্ন মতের কারণে উম্মতের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি আমলকে বিদ'আত বলা কখনো যুক্তিসংগত হতে পারে না।

হাদিসের কিতাব অধ্যয়নে দেখা যায়, দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন বা সময়ের প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে দোয়া বিষয়ক অসংখ্য হাদিস রয়েছে। এর মধ্যে ফরজ নামাজের পর অন্যতম। এ মাসয়ালাটি সমাজের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে অল্পবিস্তর আলোচনার প্রয়োজন। আমরা এ নিবন্ধে হাদিস, সলফে সালেহিনের আমল ও তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ।

কোরআন কারীম থেকে

আল্লাহ পাক পবিত্র সূরা আল ইনশিরাহ তে এরশাদ করেন

[فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ [٩٤:٧

[وَإِلَىٰ رَبِّكَ فَارْغَب [٩٤:٨


উক্ত আয়াতে কারীমার তাফসীরে জগত-বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থসমূহে কি বর্নিত হয়েছে তা এবার দেখা যাকঃ হযরত যাহ্‌হাক (রাঃ) সূরা ইনশিরাহ তথা আলাম নাশরাহ এর উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন,

عن الضحاک فإذا فرغت قال من الصلاۃ المکتوبۃ، وإلی ربک فارغب، قال في المسئلۃ والدعاء

যখন তুমি ফরজ নামায থেকে ফারেগ হবে তখন আল্লাহর দরবারে দু’আতে মশগুল হবে।

— তাফসীরে দূররে মানছূরঃ ৬/৩৬৫

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন,

(إذا فرغت من الصلاۃ المکتوبۃ فانصب في الدعاء۰ (تفسیر ابن عباس : ۵۱۴

“যখন তুমি ফরজ নামায হতে ফারেগ হও, তখন দু’আয় মশগুল হয়ে যাবে।”

— তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ), ৫১৪ পৃঃ

হযরত কাতাদাহ, যাহহাক ও কালবী (রাঃ) হতে উক্ত আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে, তাঁরা বলেন-

(والدعاء، وار غب إلیہ في المسئلۃ۰ (تفسیر مظہري : ۱/۲۹۴

‘ফরজ নামায সম্পাদন করার পর দু’আয় লিপ্ত হবে’।


— তাফসীরে মাযহারী, ১০/২৯৪ পৃঃ

সূরা নিসা আয়াত ৯৭ এবং ৯৮ এর তাফসীরে ইবনে কাসীর (রহঃ) তাঁর তাফসীর ইবনে কাছীরে বর্ননা করেন

মুসনাদ ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্নিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর কিবলাহ্‌মুখী হয়েই হাত উঠিয়ে দু'আ করতেনঃ "হে আল্লাহ ! ওয়ালীদ ইবনে ওয়ালীদকে , আইয়াশ ইবনে আবূ রাবীআকে, সালমা ইবনে হিশামকে এবং অন্যান্য সমস্ত শক্তিহীন মুসলমানকে কাফিরদের হাত থেকে রক্ষা করুন, যারা না পারে কোন উপায় করতে এবং না পায় কোন পথ ।"

— তাফসীর ইবনে কাসীর, পৃঃ ৫৩২, সূরা নিসা ৯৭-৯৮ এর তাফসীর

ইবনে কাছীর (রহঃ) উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে আরো বলেন,

তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) যোহরের নামাজের পরে উপরোক্ত প্রার্থনা করতেন । এ হাদিসটি বিশুদ্ধ, এ সনদ ছাড়া অন্যান্য সনদেও এটা বর্নিত আছে ।

— তাফসীর ইবনে কাসীর, পৃঃ ৫৩২, সূরা নিসা ৯৭-৯৮ এর তাফসীর

পবিত্র হাদীস শরীফ থেকে

দলিল ১ঃ

হযরত সালমান ফারসী রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বড় দয়ালু দাতা। যখন বান্দা তাঁর কাছে দোয়ায় হাত উঠায় তখন তিনি তা খালি ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।

— তিরমিযী শরীফ, ২/১৯৫, হাদীস নং-৩৪৭৯, হাদীস নং-১০ (ইমাম-মুক্তাদীর মুনাজাত)

ইমাম হাকেম হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। লা-মাজহাবিদের আলেম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় এটিকে সহিহ বলে মেনে নিয়েছেন। অন্যদিকে ইমাম আবু দাউদ (রহ.) এই হাদিসটি বর্ণনা করে কোনো মন্তব্য করেননি। এতে বোঝা গেল, হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহিহ।

লা-মাজহাবিদের কথিত আলেম নাসিরুদ্দীন আলবানী সহিহ ইবনে মাজাহ ও জয়িফ ইবনে মাজাহ নামে দুটি কিতাব লিখেছেন। এতে এই হাদিসটি সহিহ ইবনে মাজাহয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

লা-মাজহাবিদের আলেম মাওলানা উবাইদুল্লাহ মোবারকপুরী মিশকাত শরিফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে এ হাদিসটিকে সহিহ বলে উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা যায়, হাদিসটি সবার কাছে সহিহ এবং নির্ভরযোগ্য।

এ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে দোয়ার সময় হাত তোলার কথা উল্লেখ রয়েছে, যা কোনো বিশেষ দোয়া কিংবা বিশেষ সম্পর্কে নির্দিষ্ট নয়। বরং সর্বক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য বিধায় ফরজ নামাজের পর দোয়াতেও এটি প্রযোজ্য।

দলিল ২ঃ

হজরত ইমাম তিরমিজি (রহ.) তাঁর গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে একটি অধ্যায় লিখেছেন এভাবে- 'দোয়ার সময় হাত তোলা সম্পর্কীয় হাদিসগুলোর বর্ণনা।' তিনি এ বিষয়টিকে অধ্যায় নির্ধারণ করাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দোয়ার সময় হাত তোলা ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর কাছে হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এতে তিনি একটি হাদিস উল্লেখ করেন-

হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার সময় হাত উঠালে তা নামানোর আগে চেহারা মোবারকে মুছে নিতেন

— জামেয়ে তিরমিজি ২/১৭৬, আল মুজামুল আওসাত লিত্তাবরানি ৫/১৯৭, হাদিস: ৭০৫৩

এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেছেন, হাদিসটি সহিহ। বিশিষ্ট হাদিস বিশারদ আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) বলেন, হাদিসটি হাসান।

হজরত উমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, এ হাদিসের মধ্যে স্পষ্টভাবে দোয়ার সময় হাত তোলার কথা উল্লেখ আছে। এতে বোঝা যায়, দোয়ার সময় হাত তোলা নবীজি (সা.)-এর সুন্নাত এবং দোয়ার শেষে হাত দিয়ে মুখমণ্ডল মাসেহ করাও সুন্নাত।

দলিল ৩ঃ

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করার সময় হাতের তালু ওপর দিকে করো। হাতের তালুর উল্টো দিক করে প্রার্থনা করো না। যখন দোয়া করা শেষ হবে, দুই হাত দিয়ে মুখমণ্ডল মাসেহ করো

— আবু দাউদ ৫৫৩, আদ্দাওয়াতুল কবির লিল বায়হাকি, পৃ. ৩৯

হজরত ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত আবু দাউদ শরিফের উল্লিখিত হাদিস সম্পর্কে লা-মাজহাবি কোনো কোনো আলেম প্রশ্ন তুলেছেন যে ইমাম আবু দাউদ (রহ.) এই হাদিসের সনদে একজন বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি। সেজন্য হাদিসটি জয়িফ। এ প্রশ্নের উত্তরে লা-মাজহাবদেরই আলেম মাওলানা শামসুল হক আজিমবাদী আবু দাউদ শরিফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ আইনুল মাবুদে ওই হাদিসের ব্যাখ্যা করেছেন, ইমাম আবু দাউদ (রহ.) যে বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি, সে বর্ণনাকারীর নাম ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.) ইবনে মাজাহ শরিফে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)ও তাঁর কিতাব তাকরিবুত তাহজিবে ওই বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেছেন। ফলে হাদিসটি জয়িফ বলার কোনো অবকাশ থাকে না।

লা-মাজহাবিদের কোনো আলেমের কথা অনুযায়ী যদি ওই হাদিসটির সনদ জয়িফও ধরে নেওয়া যায়, তখনো আলোচ্য বিষয়ে হাদিসটি দলিল হওয়ার সম্পূর্ণ উপযোগী। কারণ লা-মাজহাবিদের আলেম হাফেজ আব্দুল্লাহ রওপুরী তাঁর একটি ফতোয়ায় লিখেছেন,

শরিয়তের বিধান দুই প্রকার।

এক. কোনো কিছুকে বৈধ স্বীকৃতি দেওয়া,

দুই. অবৈধ বলে স্বীকৃতি দেওয়া।'

প্রথম প্রকারের বিধানের জন্য সহিহ ও জয়িফ হাদিস দুটিই প্রযোজ্য। দ্বিতীয় প্রকারের জন্য শুধু সহিহ হাদিসই প্রযোজ্য।

ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করা প্রথম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ এটি একটি জায়েজ কাজ, হারাম কাজ নয়। তাই মাসয়ালাটি প্রমাণিত হওয়ার জন্য সহিহ ও জয়িফ উভয় প্রকারের হাদিসই প্রযোজ্য। এ ছাড়া তিনি এও মেনে নিয়েছেন, ফরজ নামাজের পর হাত তুলে মুনাজাত করা মুস্তাহাব আমল

— ফাতাওয়া উলামায়ে আহলে হাদিস ১/২২-১৯৮৭ ইং

দলিল ৪ঃ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত ছিল,

তিনি যখন হাত উঠিয়ে দোয়া করতেন, তখন নিজের হাত চেহারা মোবারকে ফেরাতেন

— আবু দাউদ (হাদিসটি মুহাদ্দিসিনের কাছে গ্রহণযোগ্য

দলিল ৫ঃ

মুহাম্মদ ইবনে আবি ইয়াহইয়া বলেন,

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) এক ব্যক্তিকে নামাজ থেকে ফারেগ হওয়ার আগে হাত তুলে দোয়া করতে দেখেন। ওই ব্যক্তি নামাজ শেষ করার পর হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) তাঁকে বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ শেষ করার আগে দোয়ার জন্য হাত ওঠাতেন না

— মাজমাউজ যাওয়ায়েদ -১০/১৬৯

এ হাদিসটি হাফেজ ইবনে হায়সাম তাবারানির হাওয়ালায় বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'ওয়া রিজালুহুস সেকাত'-এর সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।

দলিল ৬ঃ

মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বার এ হাদিসে ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে দোয়া করার ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।

হযরত জাবের ইবনে ইয়াযিদ আল আসওয়াদাল আমেরী (রা) তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ফজরের নামাজ পড়লাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাম ফিরিয়ে ঘুরে বসলেন এবং দুই হাত তুলে দোয়া করলেন।

— মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা-১/৩৩৭

দলিল ৭ঃ

হজরত ফজল ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এই বর্ণনাটি বিভিন্ন হাদিসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে হাত উঠিয়ে দোয়া করা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়।

হযরত ফযল ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নামায দুই রাকাত; প্রত্যেক দুই রাকাতে আত্ত্যাহিয়্যাতু পাঠ করতে হয়। ভয়-ভক্তি সহকারে কাতরতা ও বিনীতভাবে নামায আদায় করতে হয়। আর (নামায শেষে) দুই হাত তুলবে এভাবে যে, উভয় হাত আল্লাহ তাআলার দিকে উঠাবে এবং চেহারা কিবলামুখী করবে। অতপর বলবে, হে আল্লাহ! হে আল্লাহ ! (এভাবে দোয়া করবে।) যে ব্যক্তি এরুপ করবে না, সে অসম্পূর্ণ নামাযী।

— তিরমিযী শরীফ, ১৮৭, হাদীস নং-৩৫১

এ হাদিসে প্রমাণিত হয়,

নামাজ একাগ্রতা বা খুশুখুজুর সঙ্গে পড়া এবং এরপর দুই হাত তুলে হাতের তালু চেহারার সামনে রেখে দোয়া করা

— তিরমিজি, নাসায়ি

মুহাদ্দিসিন ও ফকিহদের দীর্ঘ যাচাই ও আলোচনার পর হাদিসটি নির্ভরযোগ্য বলেই বিবেচিত হয়েছে।

দলিল ৮ঃ

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি নামাজের পর হাত বিস্তৃত করে এই দোয়া করবে- 'হে আল্লাহ! যিনি আমার এবং ইবরাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব (আ.)-এর খোদা, জিবরাইল, মিকাইল, ইসরাফিল (আ.)-এরও খোদা, আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, আমার দোয়া কবুল করুন। কারণ আমি মুখাপেক্ষী, পেরেশান এবং অপারগ। আমাকে দ্বীনের সঙ্গে হেফাজত করুন, গুনাহ থেকে বাঁচান, অভাব দূর করে দিন। তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর দুই হাতকে খালি ফেরাবেন না

— আমলুল ইয়াওমি ওয়াল্লায়লাতি ৪৮, ৪৯, কানজুল উম্মাল ২/৮৪

এ হাদিসের দুজন বর্ণনাকারী সম্পর্কে কিছু কথা থাকলেও ইবনে মুইন বলেছেন, হাদিসটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করায় কোনো সমস্যা নেই। একই মন্তব্য করেছেন ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান। সুতরাং হাদিসটি নির্ভরযোগ্য।

দলিল ৯ঃ

ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর কিতাব আদ্দাওয়াতে 'বাবু রাফয়িল ইয়াদায়ি ফিদ দোয়া'য় হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন-

রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন, দোয়ার মধ্যে উভয় হাত এটুকু উঠিয়েছেন, যাতে তাঁর হাতের পাতার শুভ্রভাগ দেখা গিয়েছে।

এ ছাড়া ইমাম বুখারি (রহ.) এ অধ্যায়ে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.), হজরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত দুটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। এ তিনটি হাদিসের আলোকে বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) লেখেন,

প্রথম হাদিসটি তাঁদের জবাব, যাঁরা বলেন হাত তুলে দোয়া করা শুধু ইসতিস্কার নামাজের জন্যই খাস। দ্বিতীয় হাদিসদ্বয় তাঁদের জবাব, যারা বলেন, ইসতিস্কার দোয়া ছাড়া অন্য কোনো দোয়ায় হাত উঠানো যাবে না

— ফতহুল বারি ১১/১১৯

এ মাসয়ালার সমর্থনে হজরত ইবনে হাজার (রহ.) আল আদাবুল মুফরাদ, বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, নাসায়ি ও হাকেমের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো কিছু বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তা থেকে কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করছি।

দলিল ১০ঃ

এরপর তিনি উল্লেখ করেন, এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফর করে এবং খুব পেরেশান ও মলিন বদনে আসমানের দিকে হাত তুলে দোয়া করেন, হে আল্লাহ!... তখন সে ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হয়

— রাফউল ইয়াদাইন ১৮, সহিহ মুসলিম কিতাবুদ দোয়া

দলিল ১১ঃ

রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করার সময় বুক পর্যন্ত হাত তুলতেন এবং দোয়া শেষে হাত মোবারক চেহারায় ফেরাতেন

— মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ২/২৪৭

দলিল ১২ঃ

নামাজ শেষ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের ডান হাত কপালের ওপর ফেরাতেন...

— ইবনে সানি ৩৯

সিহাহ সিত্তার অনেক হাদিস থেকে এ কথা তো দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন ক্ষেত্রে দোয়ার সময় হাত উঠিয়েছেন এবং হাত মুখে ফিরিয়েছেন।

হক্কানী ওলামাগণের অভিমত

ইমাম নববী (রহ.) মুহাজজাবের ব্যাখ্যা গ্রন্থ 'আল মাজমু' গ্রন্থে দোয়ার মধ্যে হাত উঠানো এবং হাতের তালু মুখে ফেরানোর ব্যাপারে ৩০টি হাদিস উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি এর বিধান সম্পর্কে মন্তব্য করেন, দোয়ায় হাত উঠানো মুস্তাহাব (আল মাজমু ৪৪৮-৪৫০)

সব শেষে ইমাম নববী (রহ.) লেখেন,

যারা এসব হাদিসকে কোনো সময় বা স্থানের সঙ্গে নির্দিষ্ট করে, তারা বড়ই ভ্রান্তির মধ্যে আছে।

তিনি কিতাবুল আজকারে নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করার বিষয়টি জায়েজ বলে উল্লেখ করেছেন। এবং এর প্রমাণে তিরমিজি শরিফে বর্ণিত হজরত উমর (রা.)-এর বর্ণনা এবং আবু দাউদ শরিফে বর্ণিত হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদিস উল্লেখ করেছেন (কিতাবুল আজকার ২৩৫)।

বিষয়টি নিয়ে হজরত ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফতহুল বারি ১১/১১৮ এবং বুলুগুল মুরামে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন হাদিস উল্লেখ করে দোয়ায় হাত উঠানো মুস্তাহাব প্রমাণ করেছেন। এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হলো, হাত তুলে দোয়া করা মুস্তাহাব এবং নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করাও উত্তম কাজ।

লা-মাজহাবীদের অভিমত

বর্তমানে লা-মাজহাবি যারা নামাজের পর দোয়া করাকে সরাসরি বিদ'আত বলে হক্কানি উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন, তাঁদের বিজ্ঞজনদের এ ব্যাপারে মতামত কী, দেখা যাক।

তাদের নির্ভরযোগ্য কিতাব নজলুল আবরার। তাতে স্পষ্ট লেখা আছে-

দোয়াকারী দোয়ার সময় হাত উঠাবে। কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলবে। এটি দোয়ার আদব। কারণ এটি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে স্বীকৃত।

এরপর লেখেন,

যে দোয়াই হোক, যখনই হোক, চাই তা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরে হোক বা অন্য সময়, তাতে হাত তুলে দোয়া করা উত্তম আদব। হাদিসের মর্মবাণী এর প্রমাণ বহন করে। মূলত নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করার বিষয়টি নিতান্তই স্বাভাবিক এবং সবার জানা হওয়ায় সে ব্যাপারে ভিন্নভাবে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না

— নাজলুল আবরার ৩৬

মাওলানা আব্দুর রহমান মোবারকপুরী তুহফাতুল আহওয়াজিতে লেখেন,

নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করা জায়েজ।

— তুহফাতুল আহওয়াজি ২/২০২, ১/২৪৪

জামেয়া সালাফিয়া বেনারস থেকে প্রকাশিত 'আলমুহাদ্দিস' জুন ১৯৮২ সালে মাওলানা উবাইদুল্লাহ মোবারকপুরী একটি ইস্তিফতার জবাবে লেখেন-

ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করাও রাসুল (সা.) থেকে স্বীকৃত বিষয়।

— মুহাদ্দিস, জুন ১৯৮২

তিনি আরো লেখেন,

আমাদের মতে ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর বাধ্যবাধকতা ছাড়া ইমাম ও মুক্তাদি হাত উঠিয়ে অনুচ্চস্বরে দোয়া করা জায়েজ। এটি একাকী হোক বা সামষ্টিকভাবে হোক, আমাদের আমলও এটি

— মুহাদ্দিস, জুন ১৯৮২

পরিশেষে

মোদ্দাকথা, নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করার বিষয়টি বিদ'আত বলা মুসলমানদের মধ্যে নতুন ফিতনা সৃষ্টির প্রয়াস ছাড়া কিছু নয়।

এছাড়াও দেখুন

  • তাফসীরে ইবনে কাছীর,সুরা নিসাঃ ৯৭, ৯৮ নং আয়াতের তাফসীর।
  • তিরমিজি শরীফ,কিতাবুস সালাতঃ হাঃ ৩৮৫
  • আবু দাউদ,খঃ ১ পৃঃ ১৮৩
  • নাসাঈ,সুনানে কুবরাঃ খঃ১ পৃঃ ২১২, ৪৫১
  • ইবনে মাজাহ, কিতাবু ইকামাতিস সালাত ওয়াস সুন্নাতি ফিহাঃ হাঃ ১৩২৫
  • মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা,খঃ ১ পৃঃ ২৬৯
  • সহীহ ইবনে খুযায়মা, খঃ ২ পৃঃ ২২০, ২২১
  • মুসনাদে আহমাদ, খঃ ৪ পৃঃ ১৬৭
  • সুনানে দারুকুৎনী, খঃ ১ পৃঃ ৪১৮
  • বায়হাকী, সুনানে কুবরাঃখঃ ২ পৃঃ ৪৮৮
  • আমালুল য়াওম ওয়াল লায়লা, খঃ ১পৃঃ ৫২
  • মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খঃ ১০ পৃঃ ১৬৯
  • ইবনে আসাকির, খঃ ১৬ পৃঃ ৩৮৩
  • আল মুগনী,ইবনে কুদামাঃ খ ১ পৃঃ ৩২৮
  • তুহফাতুল আহওয়াজী, খঃ ২পৃঃ ১০০, ১৭১
  • দায়লামি শরীফ, খঃ ১পৃঃ ৪৮১
  • কানযুল উম্মাল, খঃ ২ পৃঃ ১৩৪
  • আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খঃ ৬ পৃঃ ৩৪৭
  • তারিখে তাবারি জিকরে খবারি, খঃ ২ পৃঃ ২৮৮
  • মিরকাত শরহে মিশকাত, খঃ ২ পৃঃ ৪৮৪
  • ফতহুল বারী, খঃ২ পৃঃ ৩৯৯
  • প্রাগুক্ত, খঃ ১১ পৃঃ ১৪৫
  • ফয়জুল বারী, খঃ ২ পৃঃ ১৬৭, ৪৩১
  • ঐ, খঃ ৪ পৃঃ ৪১৭
  • উরফুজ শাজী, খঃ ১ পৃঃ ৮৬
  • মাআরেফুস সুনান, খঃ৩ পৃঃ ১২৩
  • ইলাউস সুনান, খঃ ৩ পৃঃ ২০৫, ২০৯, ২১১, ২১২
  • আল কাওকাবুদ দুরারী, খঃ ১ পৃঃ ১৭১
  • কাশফুল বারী, খঃ ৬ পৃঃ ৪৮৯
  • আল আবওয়াব ওয়াত তারাজিম লি সহিহীল বুখারী, খঃ ২ পৃঃ ৩০৪

তথ্যসূত্র