মহিলাদের মসজিদে যাওয়া জায়েয - ভুল ফতোয়া

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
সারাবিশ্বে প্রতিক্রিয়া
প্রশ্নঃ মুসলমান মহিলারা কিভাবে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি পাবে?
জাকির নায়েকের উত্তরঃ

কুরআনে এমন কোন দলিল নেই যা মহিলাদের মসজিদে যেতে নিষেধ করে। এমনকি কোন হাদীসেও এমন নেই যেখানে বলা হয়েছে যে, মহিলারা মসজিদে যেতে পারবে না। বরং এর বিপরীতে অনেক হাদীস আছে। সহীহ বুখারী শরিফে আছে, যখন তোমার স্ত্রী মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চায় তখন তাদের নিষেধ করো না। ( হাদীস নং ৮৩২) এমনকি সহীহ বুখারীতে আছে, যদি তোমার স্ত্রী রাতের বেলায়ও মসজিদে যেতে চায় তাহলে তাকে অনুমতি দাও।( হাদীস নং ৮২৪) মুসলিম শরিফে আরো আছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মহিলাদের জন্য মসজিদে সবচেয়ে ভাল স্থান হচ্ছে তারা প্রথম কাতারে দাঁড়াবে আর পুরুষরা শেষ লাইনে দাঁড়াবে। অথবা পুরুষরা প্রথম লাইনে দাঁড়াবে আর মহিলাদের জন্য ভাল হলো শেষ লাইনে দাঁড়ানো। ( বুখারী শরীফ ১ম খন্ড, হাদীস নং ৮৮১)- সূত্রঃ ডাঃ জাকির নায়েক উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর ৪/২৩৪ , পিস পাবলিকেশন্স, ঢাকা "

পর্যালোচনাঃ

এখানেও ডাঃ জাকির নায়েক বুখারী শরীফের অনুবাদ পড়ে ফতোয়া দিয়ে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কোন প্রেক্ষাপটে এই কথা বলেছিলেন , সাহাবায়ে কেরাম কিভাবে এই হাদীসের উপর আমল করেছেন সেটা তিনি আমলে না এনে অনুবাদ পড়েই নিজের মত ব্যক্ত করে দিয়েছেন। এবার আসুন ইসলাম কি বলে দেখি ।

কুরআন- হাদীসের আলোকে মহিলাদের মসজিদে গমন ও জামাআতে নামায আদায়ের হুকুমঃ

বর্তমান যুগে আমরা ফেৎনার মধ্যে বসবাস করছি। চারিদিকে শুধু ঈমান বিধংসী ষড়যন্ত্র। নেক সুরতে শয়তান আমাদেরকে ধোকা দিয়ে চলেছে। আমরা না বুঝে শয়তানের পাতা জালে আটকে যেয়ে ঈমান আমল সব বরবাদ করছি। যেটা সাওয়াবের কাজ না, সেটা নিজের পক্ষ থেকে সাওয়াবের কাজ বানিয়ে তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছি।

এমনই একটা ফেৎনা হলো মহিলাদের নামাযের জন্য মসজিদে আর ঈদগাহে যাওয়া। তথাকথিত কিছু আহলে হাদীস, বিদয়াতী এবং নফসের পূজারী ব্যক্তিবর্গ মা-বোনদেরকে সাওয়াবের রঙ্গীন স্বপ্ন দেখিয়ে জুমুয়ার জামাআত, ঈদের জামাআতে শরীক হয়ার জন্য উৎসাহিত করছে। মা-বোনরাও অধিক সাওয়াব অর্জনের আশায় গৃহকোণ ত্যাগ করে মসজিদে ঈদগাহে ছুটে যাচ্ছে। অথচ মহিলাদের উপর জুমুয়ার নামায বা ঈদের নামায কোনটিই ওয়াজিব না। তাহলে তারা কোন্‌ উদ্দেশ্যে এসব নামায আদায়ের জন্য মসজিদে ছুটে যাচ্ছেন? পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জন্য মহিলাদের মসজিদে না যেয়ে ঘরে পড়ার মধ্যে বেশি সাওয়াব। সাওয়াবের যদি নিয়ত থাকত তাহলে তারা ঘরেই নামায আদায় করতেন। তাহলে কি উদ্দেশ্যে তাদেরকে ঘর থেকে বের করা হচ্ছে?

মহিলাদের জন্য নামায ঘরে পড়া উত্তম নাকি মসজিদে যেয়ে পড়া উত্তম। এ সম্পর্কে বিশদ জানার আগে জানতে হবে মহিলাদের উপর যে পর্দা করা ফরজ করা হয়েছে সে পর্দার হাকীকত কি? স্বরণ রাখা দরকার যে, কুরআনে পাকের ৭টি আয়াতে এবং নবিয়ে করিম (সাঃ) –এর অনেক সহীহ হাদীসে মহিলাদেরকে পর্দা পালন করার তাকীদ করা হয়েছে। সে সব আয়াত ও হাদীস পর্যালোচনা করলে বুঝে আসে যে, এখানে বিশেষভাবে খাছ পর্দার কথা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যতদূর সম্ভব মহিলাদের স্বীয় গৃহে অবস্থান, একান্ত অপারগতা ও ঠেকা ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া। চাই সেটা নামাযের জন্য হোক বা দুনিয়াবী অন্য কোন কাজে হোক।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ উসুল মনে রাখা দরকার যে, ইসলাম যে সমস্ত কাজকে গোনাহে পতিত হওয়ার নিকটবর্তী কারণ বর্ণনা করে হারাম ঘোষণা করেছে সেটা চিরদিনই হারাম থাকবে। অবস্থার পরিবর্তনের কারণে তাতে কোন পরিবর্তন আসবে না। যেমন মহলাদের বেপর্দা থাকাকে গোনাহে পতিত হয়ার কারণ উল্লেখ করে পর্দা করা ফরজ এবং বেপর্দা থাকা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এখন কোন মহিলা যদি কোন পীর সাহেবের সামনে এই বলে বেপর্দায় যায় যে, পীর সাহেব তো বুযুর্গ মানুষ, তার সামনে গেলে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে কি এই মহিলার বেপর্দায় যাওয়া জায়েয হবে? হবে না। কেননা এখানে বাস্তবে কেউ গোনাহে লিপ্ত হোক বা না হোক সর্বাবস্থায় পর্দা করা ফরয।

পক্ষান্তরে যে সব জিনিসকে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার দুরবর্তী কারণ হিসেবে উল্লেখ করে হারাম বলা হয়েছে সেখানে ঐ কাজের দ্বারা যদি গোনাহে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে তা হারাম। আর যদি গোনাহে পতিত হওয়ার আশংকা না থাকে তাহলে তা হারাম নয়। অবস্থার পরিবর্তনের সাথে এ ধরণের জিনিসের হুকুম ও পরিবর্তন হতে থাকে। যেমন মহিলাদের ঘরের বাইরে বের হওয়া বোরকা বা লম্বা চাদর পরিধান করে গোনাহে পতিত হওয়ার দুরবর্তী কারণ। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর হুকুমও বদলাতে থাকবে। বোরকা পরিধান করে বা পর্দা সহকারে বাইরে বের হওয়া যদি কখনও ফেৎনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন বোরকা পরিধান করে বাইরে যাওয়াটাও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারটাও ঠিক এই মূলনীতির উপরে বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। [1]

রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর যুগে কিছু সংখ্যক মহিলারা ওয়াক্তিয়া নামাযের জন্য মসজিদে হাজির হতেন। ঈদের নামাযের জন্য ঈদগাহেও যেতেন। কিন্তু সেদটা ছিল উত্তম যুগ। কোন ধরণের ফেৎনার আশংকা ছিল না। রাসূলে করিম (সাঃ) স্বশরীরে বিদ্যমান ছিলেন। ওহী অবতীর্ণ হচ্ছিল। নতুন নতুন আহকাম আসছিল। সকলেই নতুন মুসলমান ছিলেন। নামায, রোজা, যাকাত ইত্যাদির হুকুম আহকাম জানার প্রয়োজন ছিল। তার চেয়েও বড় পাওয়া ছিল রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর পিছনে নামায পড়ার সৌভাগ্য। হূযুর(সাঃ) স্বপ্নের তাবীর বলতেন, ইলমী আলোচনা করতেন। তাই মহিলাদেরও সে সব জায়গায় উপস্থিত হওয়ার অনুমতি ছিল। তবে পুরুষদের মত তাদের এই হাজির হওয়াটা বাধ্যতামূলক ছিল না। কেননা পুরুষের মত মহিলাদের জামাআতে নামায পড়া জরুরি না। জামাআতের সাথে নামায পড়লে সাতাশ গুণ বেশি সাওয়াব। মসজিদে নববীতে নামায পড়লে প্রতি রাকাআতে এক হাজার রাকাআতের সাওয়াব।[2] এতদস্তত্বেও মহিলাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছিল বাড়ীতে নামায পড়ার জন্য।

রাসূলে আক্রাম(সাঃ) এর যুগে মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরামের যুগেই তা বন্ধ করে দেয়া হয়। হযরত উমর(রাযিঃ) তার খেলাফতের যুগে সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে মহিলাদের মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকাহ(রাযিঃ) এই ঘোষণা সমর্থন করে বলেন, আজকের যুগে মহিলাদের যে অবস্থা এটা যদি রাসূরুল্লাহ(সাঃ) দেখতেন তাহলে তিনিও মহিলাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করে দিতেন।

এখানে স্বরণীয় যে,হযরত উমর(রাযিঃ) এবং হযরত আয়েশা(রাযিঃ)-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবী দ্বারা রাসূলে কারীম(সাঃ)- এর বিরোধীতা করা বা তার হুকুমের খেলাফ করার কোন কল্পনাও করা যায় না। এতদস্বত্তেও তারা এই ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এই জন্য যে, যে সব শর্তের সাথে মহিলাদের মসজিদে যাওয়া জায়েয ছিল এখন সে সব শর্ত পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মসজিদে যাওয়ার হুকুম আপনা আপনিই রহিত হয়ে গেছে। এখানে রাসূলে কারীম(সাঃ)-এর বিরোধীতা করার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

বস্তুত কোন যুগেই মহিলাদের মসজিদে যাওয়া পছন্দনীয় ছিল না। সব সময় তাদের বাড়ীতে থাকতে এবং গৃহকোণে নামায আদায় করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। কেননা মহিলাদের জন্য পর্দা করা ফরজ। বিনা জরুরতে বাহিরে বের হলে পর্দার লংঘন হবে, ফেৎনা ছড়াবে, সে জন্য জামাআতের মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসও তাদের জন্য মাফ করে দেয়া হয়েছে।

মহিলাদের নামায সংক্রান্ত অসংখ্য হাদীস রয়েছে যাতে তাদেরকে পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে ঘরে নামায পড়তে বলা হয়েছে এবং মসজিদে আসতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আমরা প্রথমে সেসব হাদীসগুলি এখানে উল্লেখ করব। অতঃপর বিরুদ্ধ বাদীদের পেশকৃত হাদীস উল্লেখ করে তার বাস্তবতা পর্যালোচনার চেষ্টা করব।

মসজিদে না যাওয়া সম্পর্কিত হাদীসসমূহ

হাদিস ১

হযরত উম্মে হুমাইদ (রাযিঃ) একবার রাসূলে মাকবুল (সাঃ) –এর খিদমতে হাজির হয়ে আরয করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সাথে নামায পড়ার আমার খুবই ইচ্ছে হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন আমি জানি, তুমি আমার সাথে নামায পড়তে ভালবাস। কিন্তু মনে রেখ, বন্ধ ঘরে তোমার নামায পড়া খোলা ঘরে নামায পড়ার চেয়ে উত্তম। আর খোলা কামরার নামায বারান্দার নামাযের চেয়ে উত্তম। আর বারান্দার নামায মহল্লার মসজিদে নামাযের চেয়ে উত্তম। আর মহল্লার মসজিদের নামায আমার মসজিদের (মসজিদে নববী) নামাযের চেয়ে উত্তম। এই এরশাদ শ্রবণের পর হযরত উম্মে হুমাইদ (রাযিঃ) স্বীয় ঘরের সবচেয়ে নির্জন কোণে বিশেষভাবে নামাযের জায়গা তৈরী করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই নামায পড়তে থাকেন।

— মুসনাদে আহমাদ, ছহীহ ইবনে খুযাইমা, ছহীহ ইবনে হিব্বান, সূত্র, তারগীবঃ ১-১৩৫

ইবনে খুযাইমা এই হাদীস বর্ণনা করতে যেয়ে বলেন, মহিলাদের স্বীয় ঘরে নামায পড়া মসজিদে নববীতে নামায পড়ার তুলনায় হাজার গুণে উত্তম। যদিও মসজিদে নববীতে নামায পড়া অন্য মসজিদে নামায পড়ার তুলনায় হাজার গুণে উত্তম। কিন্তু এই ফযীলত শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য, মহিলাদের জন্য নয়।

হাদিস ২

হযরত উম্মে সালামা (রাযিঃ) বলেন, রাসূলে খোদা (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, মহিলাদের বদ্ধ কামরার মধ্যে নামায পড়া খোলা কামরায় নামায পড়ার চেয়ে উত্তম। আর খোলা কামরার নামায বারান্দার নামাযের চেয়ে উত্তম। আর ঘরের বারান্দার নামায মহল্লার মসজিদের নামাযের চেয়ে উত্তম।

— তাবারানী শরীফ-সূত্র-কানযুল উম্মালঃ ৮-২৬৮

হাদিস ৩

হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) রাসূলে কারীম (সাঃ)- এর ইরশাদ নকল করেন যে, নারী জাতি গোপন থাকার জিনিস। তারা যখন বারী থেকে বের হয় তখন শয়তান তাদেরকে মানুষের দৃষ্টিতে তুলে ধরে। পক্ষান্তরে মহিলারা স্বীয় বাড়ীর সবচেয়ে গোপন স্থানে আল্লাহ পাকের অধিক নৈকট্য লাভ করে থাকে।

— তাবারানী ফিল আওসাত-সূত্র-তারগীবঃ ১-১৩৬

হাদিস ৪

হযরত ইবনে সালামা (রাযিঃ) রাসূলে কারীম (সাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ হলো তাদের বারীর গোপন কক্ষ।

— ছহীহ ইবনে খুযাইমা, মুসতাদরাকে হাকেম-সূত্র-তারগীব

হাদিস ৫

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, মহিলাদের নামায তাদের ঘরে, বাড়ীর নামাযের চেয়ে উত্তম। আর ঘরের নির্জন কোণে নামায পড়া এটা ঘরে নামায পড়ার চেয়েও উত্তম।

— আবু দাউদ-ছহীহ ইবনে খুযাইমা-সূত্র তারগীবঃ ১-১৩৫

হাদিস ৬

রাসূলে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, মহিলারা গোপন থাকার বস্তু।যখন তারা বের হয় শয়তান তখন তাদের দিকে উকিঝুঁকি মারতে থাকে।

— জামে তিরমিযী, ছহীহ ইবনে খুযাইমা, ছহীহ ইবনে হিব্বান-তারগীবঃ১-২২৭

হাদিস ৭

হযরত আবুল আহওয়াস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবীয়ে কারীম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ পাকের নিকট মহিলাদের ঐ নামায সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় যা সে স্বীয় ঘরের সবচেয়ে নির্জন জায়গায় আদায় করে।

— ছহীহ ইবনে খুযাইমা, তারগীব ওয়াত তারহীব লিল মুনযিরীঃ ১-১৩৬

হাদিস ৮

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) রাসূলে খোদা (সাঃ) এর ইরশাদ নকল করেন যে, তোমরা মহিলাদের মসজিদে আসতে বাধা দিওনা তবে তাদের ঘরই তাদের জন্য উত্তম।

— আবুদাউদতারগীব১-২২৬

হাদিস ৯

আবু আমর শায়বানী বলেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) কে দেখেছি তিনি জুমুআর দিন মহিলাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিতেন এবং বলতেন তোমরা বের হয়ে যাও। তোমাদের ঘরই তোমাদের জন্য উত্তম।

— তাবারানী-তারগীবঃ ১-১৩৬

হাদিস ১০

মহিলাদের জন্য জেহাদও নাই জুমুআও নাই এবং জানাযায় শরীক হওয়া নাই

— তাবারানী ফিছ ছগীর-কানযুল উম্মালঃ ৮-২৬৪

হাদিস ১১

হযরত আয়েশা (রাযিঃ) ইরশাদকরেন, একবার রাসূলে আকরাম (সাঃ) মসজিদে বসাছিলেন এমন সময় মুযাইনা গোত্রের মহিলা সুন্দর পোষাকে সজ্জিতা হয়ে আহংকারী চালে মসজিদে এসে উপস্থিত হলো। হুযুর (সাঃ) বললেন, হেলোকসকল!তোমরা স্বীয় মহিলাদেরকে উগ্রপোষাক পরিধান থেকে এবং মসজিদে অংগভংগি করা থেকে বিরত রাখ।বনী ইসরাইলরা ততক্ষণ পর্যন্ত অভিশপ্ত হয় নাই যতক্ষণ না তাদের মহিলারা উগ্র পোষাক পরা এবং মসজিদে অহংকারী পদক্ষেপে চলা শুরু করেছে

— ইবনেমাজা

হাদিস ১২

রাসূলে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসা থেকে বাধা দিওনা, কিন্তু তারা যেন সুগন্ধি ব্যবহার ছাড়া বের হয়।

— আবু দাউদঃ ১-৮৪, কানযুল উম্মালঃ ১৬-৪১৪

হাদিস ১৩

যখন তোমাদের কেউ মসজিদে আস্তে চায় তখন যেন সুগন্ধির ধারে কাছেও না যায়।

— কানযুল উম্মালঃ ১৬-৪১৪

হাদিস ১৪

যখন কোন মহিলা সুগন্ধি লাগিয়ে বের হয় আর লোকেরা তার খুশবু পায় সেই মহিলা ব্যভিচারী হিসেবে গণ্য হয়।

— নাসাই-ইবনে খুযাইমা তারগীব তারহীব, আহকামুল কুরআন থানভীঃ ৩-৪৪৮

হাদিস ১৫

যখন তোমাদের কেউ মসজিদে আসতে চায় তখন সে যেন তার সুগন্ধি এমনভাবে ধুয়ে ফেলে যেমন (গুরুত্বের সাথে) সে ফরজ গোসল করে থাকে।

— কানযুল উম্মালঃ ১৬-৪১৪

এতক্ষণ যাবৎ আমরা যে সহীহ হাদীসগুলি উল্লেখ করলাম তার দ্বারা কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেলোঃ
(ক) রাসূলে কারীম (সাঃ)- এর যুগে মহিলাদের জন্য জামাআতে শরীক হওয়া অত্যাবশ্যকীয় ছিল না। শুধুমাত্র অনুমতি ছিল। তবে সেটাও এমন অপছন্দের সাথে এবং শর্ত সাপেক্ষে যে তারা নিজেরাই মসজিদে যেতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ত।
(খ) মহিলাদের মসজিদে যাওয়াটা ওয়াজিব, ফরয কিছুই ছিল না বরং মোবাহ ছিল। তাতে বাড়তি কোন সাওয়াব ছিল না।
(গ) হযরত উম্মে হুমাইদ (রাযিঃ) হুযুরে পাক (সাঃ)-এর ইরশাদ উপর আমল করার জন্যই মসজিদ ছেড়ে সারা জীবন বাড়ীর নির্জন প্রকোষ্ঠে নামায আদায় করেছেন। এবং সে যুগের মহিলারা সাধারণভাবে এটাই করতেন।

আজ শত আফসুস ঐ সব নব্য পণ্ডিতদের উপর যারা মহিলাদেরকে মসজিদেযাওয়ারজন্য উৎসাহিত করে রাসূলে পাক (সাঃ)-এর ইচ্ছা এবং শিক্ষার বিরোধিতা করছে। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো সেটাকে আবার সুন্নাত বলে চালিয়ে দিতে সচেষ্ট হচ্ছে। মহিলাদের জন্য মসজিদে যেয়ে নামায পপড়া যদি সুন্নাত হ্য় এবং তাতে সাওয়াবও বেশী হত তাহলে রাসূলে করিম (সাঃ) কেন বললেন যে, মসজিদে নামাযের চেয়ে ঘরের নামাযই উত্তম। তাহলে কি সুন্নাত তরক করার উপর সাওয়াবের কথা বলা হয়েছে?

এখানে স্বরণ রাখা দরকার যে, রাসূলে মাকবুল (সাঃ)-এর যুগে মহিলাদের যে মসজিদে আসার অনুমতি ছিল সেটা কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে ছিল। যথা-

(ক) সেজে গুজে খুশবু লাগিয়ে আসতে পারবে না।
(খ) বাজনাদের অলংকার চুড়ি ইত্যাদি পরে আসতে পারবে না।
(গ) কাজকামের সাধারণ ময়লা কাপড় পড়ে আসতে হবে। যাতে কেউ আকৃষ্ট না হয়।
(ঘ) অংগভংগি এবং অহংকারী চালে চলতে পারবে না। সর্বোপরি তাদের এই বের হওয়া, ফেৎনার কারণ না হতে হবে।

উল্লেখ্য যে,রাসূলে আকরাম (সাঃ) – এর অফাতের কিছুদিন পর থেকেই যখন শর্তগুলি বিলুপ্ত হতে শুরু করল এবং মহিলাদের মধ্যে স্বাধীনচেতা ভাব দেখা দিল তখন মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার হুকুমও অটোমেটিকভাবে রহিত হয়ে গেল। হযরত উমর ফারুক (রাযিঃ) স্বিয় খেলাফতের যুগে যখন মহিলাদের এই অবস্থা দেখলেন এবং ফেৎনার আশংকাও দিন দিন বাড়তে লাগল তখন তিনি এবং বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম আদেশ জারি করলেন মহিলাদের মসজিদে না আসার। অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এই ঘোষণাকে স্বাগত জানালেন। কেননা তারা জানতেন যে, মহিলাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আদেশের বিরোধিতা করা হয় নাই বরং তার ইচ্ছার উপরেই আমল করা হয়েছে।

ফতোয়ার বিখ্যাত গ্রন্থ বাদায়িউস সানায়িতে বলা হয়েছে,

যুবতী মহিলাদের মসজিদে যাওয়া মুবাহ নয় ঐ রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে যা হযরত উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি যুবতী মহিলাদেরকে বাইরে বের হতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। কেননা মহিলাদের ঘর থেকে বের হওয়া ফেৎনা। আর ফেৎনা হারাম। সুতরাং যে জিনিস হারাম পর্যন্ত নিয়ে যায় সেটাও হারাম।

— বাদায়িউস সানায়ি ১/১৫৭

এই ফেৎনার কথা উপলব্ধি করেই হযরত আয়িশা (রাযিঃ) বলেছিলেন,

যদি রাসূলে খোদা (সাঃ) মহিলাদের এই (দুঃখজনক) অবস্থা দেখতেন তাহলে অবশ্যই তাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করে দিতেন। যেমন নাকি বনী ইসরাইলের মহিলাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল।

— বুখারী শরীফঃ ১-১২০

আল্লামা আইনী (রহঃ) বলেন, আর আজকের যুগ! খোদার পানাহ। আজকের যুগে মহিলারা যে বিদ’আত আর নিষিদ্ধ জিনিস অবলম্বন করছে, পোষাক পরিচ্ছদ আর রূপচর্চায় তারা যে নিত্যনতুন ফ্যাশন আবিষ্কার করছে, বিশেষ করে মিশরের মহিলারা। যদি হযরত আয়েশা (রাযিঃ) এই দৃশ্য দেখতেন তাহলে আরো কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতেন। এর পরে আল্লামা আইনী (রহঃ) বলেন, হযরত আয়েশা (রাযিঃ) উক্ত মন্তব্য তো রাসূলে কারীম (সাঃ)-এর ইন্তেকালের কিছুদিন পরের মহিলাদের সম্বন্ধে। অথচ আজকের যুগের মহিলাদের উগ্রতা আর বেহায়াপনার হাজার ভাগের এক ভাগও সেকালে ছিল না। তাহলে এ অবস্থায় তিনি কি মন্তব্য করতেন? [3]

আল্লামা আইনী (রহঃ) হিজরী নবম শতাব্দীর মহিলাদের সম্বন্ধে এই কথা বর্ণনা করেছেন। তাহলে চিন্তা করুন আজ হিজরী পঞ্চদশ শতাব্দীর এই সূচনা লগ্নে সারা বিশ্ব যে অশ্লীলতা আর উলংগপনার দিকে ছুটে চলেছে, বেপর্দা আর বেহায়াপনার আজ যে ছড়াছড়ি, মেয়েরা যখন ছেলেদের পোষাক পরছে, বব কাটিং করছে, পেট পিঠ খুলে পার্কে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছে, সমানাধিকার শ্লোগান কুদ্রতী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে ঠিক সেই মুহূর্তে এই ফেৎনা ফাসাদের মধ্যে অবলা মা-বোনদেরকে সাওয়াবের রঙ্গিন স্বপ্ন দেখিয়ে মদজিদে আর ঈদগাহে টেনে আনার অপচেষ্টা ইসলামের চিহ্নিত শত্রুদের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ দলিল দেয়া হয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগের মহিলাদের দ্বারা। তাহলে সেই যুগের মহিলাদের মত আপনি কি এই যুগের মহিলাদের জন্য এই নিশ্চয়তা দিতে পারবেন যে, তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দৃষ্টি অবনত রেখে, খুশবু পাউডার না লাগিয়ে, সাধারণ পোষাক পরিধান করে, শয়তান বদমাশদের কুদৃষ্টি এড়িয়ে, পুরুষের জটলার মধ্যে না যেয়ে, সর্বোপরি কোন ফেৎনার কারণ না হয়ে মসজিদে বা ঈদগাহে আসবে? তাছারা এই যুগের পুরুষদের সম্বন্ধেও কি আপনি এই নিশ্চয়তা দিতে পারবেন যে, তারাও পুরাপুরি পবিত্রতা বজায় রাখতে পারবে। ফেৎনার মধ্যে পতিত হবে না!!

মসজিদে যাওয়া সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ এবং তার ব্যাখ্যা

মহিলাদের মসজিদে কিংবাঈদগাহে যাওয়া সম্পর্কে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সার কথা তিনটি হাদীসের মধ্যে এসে যায়। এজন্য আমরা পৃথক পৃথকভাবে সব হদীসগুলি উল্লেখ না করে সেই তিনটি হাদীস উল্লেখ করব এবং সাহাবায়ে কেরামসহ পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসীন এবং হাদীস ব্যাখ্যাকারীগণ তার কি অর্থ বুঝেছেন সেটা আলোচনা করব।

এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, হাদীসের শব্দ বা তরজমা দেখে হাদীসের মতলব বুঝতে যাওয়া বা সেই অনুযায়ী ব্যাখ্যা দেয়া কিন্তু গোমরাহীর আলামত। একা একা পড়ে বা বাংলা অর্থ দেখে হাদীস বুঝতে গেলে পরস্খলনের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু সম্ভাবনায় নয় বরং বাস্তব ঘটনাও ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে। তাই কোন হাদীস সামনে এলে সাহাবায়ে কেরাম তার কি অর্থ বুঝেছেন, কিভাবে তার উপর আমল করেছেন এবং তৎপরবর্তী তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনগণ তার কি ব্যাখ্যা করেছেন সেটাও জানতে হবে। কেননা হাদীসের সর্বপ্রথম মুখাতাব বা লক্ষ্যবস্তু হলেন সাহাবায়ে কেরাম। তারা সরাসরি হুযুর (সাঃ)- এর যবান থেকে হাদীস শুনেছেন এবং তার মতলব বুঝে তার উপর আমল করেছেন। তার সাহাবাদের আমলকেও হাদীসের সাথে মেলাতে হবে হাদীসের সহীহ ব্যাখ্যা বুঝার জন্য।

সাহাবায়ে কেরাম রাসূলে কারীম (সাঃ)–এর জন্য উৎসর্গকৃত প্রাণ ছিলেন। রাসূল (সাঃ)-এর একটা ইশারায় তারা আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তেঅ তারা প্রস্তুত ছিলেন। তারাই ছিলেন সত্যিকারের আশেকে রাসূল। তারাই ছিলেন রাসূলের আদর্শের প্রকৃত পতাকাবাহী। তাদের থেকে সুন্নাত বিরোধী, রাসূলের আদর্শ বিরোধী কোন কাজ প্রকাশ পাবে সেটা কল্পনাও করা যায় না। তাই হাদীসের পাশাপাশি তাদের আমলও দলীল রূপে গণ্য হবে, যেহেতু তারা ছিলেন মি’আরে হক বা সত্যের মাপকাঠি। হাদীস তিনটি হলো-

(১) উম্মেআতিয়া (রাযিঃ) বলেন, আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে আমারা যেন ঋতুবতি পর্দানশীন মহিলাদেরকেও ঈদের ময়দানে নিয়ে যাই। যাতে করে তারা মুসলামানদের জামাআত এবং দুআর মধ্যে শরীক থাকতে পারে। তবে ঋতুবতি মহিলারা নামাযের জায়গা থেকে আলাদা থাকবে। জনৈকা সাহাবিয়া বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের অনেকের তো চাদরও নেই। হুযুর (সাঃ) বললেন, তাকে যেন তার বান্ধবী স্বীয় চাদর দিয়ে সাহায্য করে।
(২) মহিলারা যদি মসজিদে যেতে চায় তাহলে তাদেরকে বাধা দিও না।
(৩) তোমাদের কারো স্ত্রী যদি মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চায় তাহলে সে যেন বাধা না দেয়। তবে তাদের জন্য ঘরই শ্রেষ্ঠ।

এই বিষয়বস্তুর আরো কিছুই হাদীস সিহাহ সিত্তাহসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদীস দ্বারা বাহ্যিকভাবে বুঝে আসে যে, মহিলাদের মসজিদে এবং ঈদগাহে যাওয়া অপছন্দনীয় হওয়া সত্ত্বেও তারা যদি স্বামীর নিকট অনুমতি চায় তাহলে স্বামীর বাধা প্রদান না করা উচিত। কিন্তু আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, হাদীসে প্রকৃত ব্যাখ্যা বুঝতে হলে আমাদেরকে সাহাবায়ে কিরাম এবং মুহাদ্দিসীনদের ব্যাখ্যার প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। তাই আসুন ব্যাখ্যার আলোকে আমরা এসব হাদীসের মর্ম উপলব্ধি করতে চেষ্টা করি।

প্রথম হাদীসে মহিলাদেরকে ঈদগাহে হাজির হওয়ার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে। এই আদেশটা কোন ধরণের সেটা আমাদেরকে দেখতে হবে। আরবী ভাষায় আমর অর্থাৎ অনুমতিসূচক শব্দ সাধারণতঃ তিন অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। ওয়াজিব, মুস্তাহাব এবং মুবাহ। আলোচ্য হাদীসে আমর তথা আদেশটা যে ওয়াজিব হিসেবে ব্যবহার হয় নাই সেটা একেবারে স্পষ্ট। কেননা মহিলাদের উপর ঈদের নামায ওয়াজিব না। এবং হাদীসের এই স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও সেই যুগের যে সকল মহিলা সাহাবী ঈদের মাঠে আজীবন শরীক হয়েছে এমন কোন প্রমাণও পাওয়া যায় না। তাছাড়া আলোচ্য হাদীসে তো হায়েজা মহিলাদের কথা বলা হয়েছে যাদের জন্য নামাযই নেই।

এমনকি এই আদেশটা মুস্তাহাব পর্যায়েরও না। কেননা হুযুর (সাঃ) মহিলাদের জন্য নির্জন প্রকোষ্ঠের নামায মসজিদে নববীর নামাযের চেয়ে উত্তম বলে বর্ণনা করেছেন এবং সেই হাদীসে ঈদের নামাযের জন্য আলাদা কোন হুকুম নেই যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামায তো ঘরে পড়া ভাল। তবে ঈদের নামায ঈদগাহে যেয়ে পড়তে হবে বা পড়বে। কেননা মসজিদ তো সাধারণতঃ বাড়ীর কাছেই হয়ে থাকে আর ঈদগাহ শহরের বাইরে হয়ে থাকে। তাহলে বাড়ীর কাছে মসজিদে যেয়ে যেখানে নামায পড়তে নিষেধ করা হয়েছে; সেখানে শহরের বাইরে ঈদগাহে যেয়ে ঈদের জামাআতে শরীক হওয়ার কি যৌক্তিকতা থাকতে পারে?

দ্বিতীয় কথা হলো, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আর জুমুআর নামায ফরজ আর ঈদের নামায ওয়াজিব। ফরজ নামাযের জন্য যেখানে ঘর থেকে বের হয়া আশা অনুত্তম সেখানে ওয়াজিব আদায়ের জন্য ঈদগাহে যাওয়া কি করে উত্তম হতে পারে? সুতরাং বুঝা গেল যে, আলোচ্য হাদীসে আমর তথা অনুমতিসূচক শব্দ ওয়াজিব বা মুস্তাহাব নয় বরং মুবাহ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সাময়িক উপকারের জন্য রাসূলে আকরাম (সাঃ) মহিলাদেরকে ঈদগাহে যেতে বলেছিলেন। এর দ্বারা ওয়াজিব হওয়া বুঝে আসে না। (ফাতাওয়া রহীমিয়াঃ ৫/৩১)

বিশিষ্ট ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম তাহাবী (রহঃ) এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে যেয়ে বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহিলাদের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার অনুমতি ছিল যাতে করে মুসলমানদের সংখ্যা বেশী দেখা যায় এবং দুশমনরা এতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়। কিন্তু আজ যেহেতু সেই পরিস্থিতি আর নেই তাই ঐ হুকুম ও মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে।

ফতোয়ার আলোকে মহিলাদের মসজিদে গমন

  • বুখারী শরীফের বিখ্যাতব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহঃ) বলেন, বর্তমানে ফতওয়া এই কথার উপরে যে, মহিলাদের জন্য যে কোন নামাযে যাওয়া নিষেধ। চাই তা দিনে হোক আর রাতে হোক। উক্ত মহিলা চাই যুবতী হোক আর বৃদ্ধা হোক। এমনকি তাদের জন্য ওয়াজ মাহফিলে যাওয়াও নিষেধ। বিশেষ করে ঐ সকল জাহেলদের ও্যাজ্ব যারা দেখতে উলামার মত কিন্তু উদ্দেশ্য তাদের দুনিয়া কামানো আর প্রবৃত্তির পুজা করা।
  • ফতোয়ায়ে শামীতে বলা হয়েছে,মহিলাদের জন্য জামাআতে হাজির হওয়া নিষেধ। চাই তা জুমা হোক বা ঈদ হোক। এমনকি ওয়াজের মাহফিলে পর্যন্ত। দিনে হোক বা রাতে হোক, বৃদ্ধা হোক বা যুবতী হোক সকলের জন্য এই হুকুম প্রজোয্য। ফেৎনা ছড়িয়ে পড়ার কারণে বর্তমানে এটাই ফতোয়া। (১-৫৬৬)
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরীতে বলা হয়েছে- ফেৎনা ফাসাদ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করার কারণে মহিলাদের যে কোন নামাযে অংশগ্রহণ করা মাকরুহ। (১/৮৫)
  • শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবী (রহঃ) বলেন, এই যুগে মহিলাদের জন্য মসজিদে জামাআতে হাজির হওয়া মাকরুহ। কেননা ফেৎনারআশংকা রয়েছে। হুযুরে পাক (সাঃ) এর যুগে দ্বীনী হুকুম আহকাম শেখার জন্য তাদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি ছিল। কিন্তু এখন আর সেই প্রয়োজন বাকি নেই। দ্বীনের হুকুম আহকাম সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। পর্দার মধ্যে থেকেও মহিলারা তা জানতে পারে। সুতরাং তাদের জন্য বাড়ীতে পর্দার মধ্যে থাকাই শ্রেয়।
  • উল্লেখ্য যে, মসজিদে না যাওয়ার এই হুকুম হারাম শরীফ, মসজিদে নববী, মসজিদে আকসাসহ সকল মসজিদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রজোয্য। সর্বত্রই মহিলারা স্বীয় ঘরে নামায পড়বে। এমনকি যেসব মহিলারা হজ্ব বা উমরা করতে যান তারাও সেখানে বাইতুল্লাহ শরীফ বা মসজিদে নববীতে নামায না পড়ে স্বীয় রুমে নামায পড়বেন। (আহসানুল ফাতাওয়া)

কেননা রাসূলে কারীম (সাঃ) মসজিদে নববীর তুলনায় নির্জন প্রকোষ্ঠে নামায পড়াকে মহিলাদের জন্য উত্তম বলেছেন। এই হাদীস যেহেতু মদীনায় থাকাকালীন সময়ে ইরশাদ করেছিলেন তাই এতে মসজিদে নববী কথা উল্লেখ রয়েছে। মক্কা শরীফে অবস্থান করার সময় যদি বলতেন তাহলে সেখানে অবশ্যই বলতেন যে, মসজিদে হারামে নামায পড়ার চেয়ে স্বীয় বাড়ীতে পড়া মহিলাদের জন্য উত্তম। এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার যে, মসজিদে হারামে এক রাকাআতে এক লাখের সাওয়াব এবং মসজিদে নববীতে এক রাকাআতে এক হাজার রাকাআতের সাওয়াব শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য।

মহিলারা স্বীয় ঘরে নামায পড়লে ঐ সাওয়াব পেয়ে যাবেন। সুতরাং মা-বোনেরা সাবধান। অতিরিক্ত সাওয়াবের আশায় কুরআন হাদীসের বিরোধিতা করে ধ্বংস ডেকে আনবেন না।

আজঅধিকাংশ মহিলারাই বেপর্দা চলেছে। বাড়ীতে গায়েরে মাহরাম এবং দেওর-ভাসুরের সাথে পর্দা করছে না, যা কিনা ফরজ। অথচ তারাই আবার অধিক সাওয়াবের আশায় সোৎসাহে মসজিদে, ঈদগাহে উপস্থিত হচ্ছে। যা কিনা মুস্তাহাবও নয়। তাহলে এটা গোড়া কেটে আগায় পানি দেয়ার মত নয় কি? এই স্ববিরোধিতার কী অর্থ? ফরজ জিনিস বাদ দিয়ে মুবাহ জিনিসের প্রতি এত আগ্রহ কেন? সাহাবায়ে কেরাম যারা বেশী থেকে বেশী সাওয়াব অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করতেন তারাও হুযুর (সাঃ) এর কথা মেনে নিয়ে মসজিদে নববীতে তার পিছনে নামায পড়া বাদ দিয়ে নিজেদের বাড়ীতে নামায পড়েছেন। সেক্ষেত্রে আমাদের মা-বোনদের তাদেরকে টেক্কা দিয়ে মসজিদে আর ঈদগাহে যাওয়ার প্রবণতাটা সত্যিই দুঃখজনক।

  • ফতোয়ারবিখ্যাত কিতাব বাদায়িউস সানায়িতে মহিলাদের জুমুআ এবং ঈদের জামাআতে শরীক হওয়া সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে তা প্রণিধান যোগ্য। জুমুআর জামাআতে শরীক হওয়া সম্বন্ধে বলা হচ্ছেঃ আর মহিলারা জুমুআয় শরীক হবে না। কেননা তারা পারিবারিক কাজে মশগুল থাকে, তাছাড়া পুরুষদের সমাবেশে মহিলাদের বের হওয়াও নিষেধ। তাদের এই বের হওয়াটা ফেৎনার কারণ হয় তাই এই হুকুম। একারণেরই তাদের জুমুআআর পাঁচ ওয়াক্তের জামাআতে হাজির হওয়া মাফ। হযরত জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার উপর এবং কিয়ামতের দিনের উপর ঈমান রাখে তার জন্য জুমুআ ওয়াজিব কিন্তু মুসাফির,গোলাম,বাচ্চা এবং মহিলা ও অসুস্থ ব্যক্তি ব্যতীত। (১/২৫৮)। এই হাদীসে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে যে, মহিলাদের জন্য জুমুআর নামায নেই।
ঈদের জামাআতে শরীক হওয়া সম্বন্ধে বলা হয়েছেঃ
এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, যুবতী মহিলাদের জুমুআর নামাযে, ঈদের নামাযে এবং অন্য যে কোন নামাযের জামাআতে হাজির হওয়ার অনুমতি নেই। কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেনঃ

তোমরা স্বীয় ঘরে অবস্থান কর।

এখানে অবস্থান করার হুকুম দিয়ে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। তাছাড়া তাদের বাইরে বের হওয়াটা নিঃসন্দেহে ফেৎনার কারণ। আর ফেৎনা হলো হারাম, যে জিনিস হারাম পর্যন্ত টেনে যায় সেটাও হারাম। তবে অতি বৃদ্ধা মহিলারা ফজর, মাগরিব আর ঈশার জামাআতে হাজির হতে পারে। যোহর, আসরে নয়। কেননা এই দুই সময় হচ্ছে শয়তান-বদমায়েশদের বাইরে ঘোরাঘুরি করার সময়। এতদসত্ত্বেও এতে কারো দ্বিমত নেই যে, তবুও নামাযের জন্য বের না হওয়াটাই উত্তম।
কেননা নবীয়ে কারীম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, মহিলাদের নামায স্বীয় বাড়ীতে তাদের মসজিদে পড়ার চেয়ে উত্তম। আর ঘরের নামায বাড়ীর নামাযের চেয়ে উত্তম। আর তাদের গোপনে নামায সাধারণ ঘরে নামাযের চাইতে উত্তম। (১/২৭৫)
উল্লেখ্য যে, আলোচ্য কিতাবের লেখক আল্লামা আলাউদ্দীন কাসানী (রহঃ) আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। ৫৮৭ হিজরীতে তার ওফাত হয়। তিনি ছিলেন সে যুগের বিরাট বড় আলেম। তার ইলমের এতোই সুখ্যাতি ছিল যে, তিনি মালিকুল উলামা অর্থাৎ উলামায়ে কেরামের বাদশাহ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। এতক্ষণ যাবৎ হাদীসের আলোকে তার ফতোয়া আপনারা শুনলেন। তারা আমাদের চাইতে হাদীস-কুরআন অনেক বেশী বুঝতেন। তাদের তাকওয়া পরহেযগারীও ধারণার অতীত। কাজেই হাদীস-কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে তাদের মতামতকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে।

সমালোচনার জবাব

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, রাসূলে কারীম (সাঃ)-এর যুগে মহিলারা সীমিত সংখ্যায় যাও বা মসজিদে যেতেন সাহাবাদের যুগে তাও বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে হযরত উমর ফারুক (রাযিঃ)-এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করেন এবং উপস্থিত সকল সাহাবায়ে কেরাম তা নির্দিতায় মেনে নেন। কেউ কেউ এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রাযিঃ)-এর কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে তিনি হযরত উমর ফারুক (রাযিঃ) এর সমর্থন করে বলেন,

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যদি বর্তমানের মহিলাদের অবস্থা দেখতেন তাহলে তাদেরকে অবশ্যই মসজিদে যেতে নিষেধ করে দিতেন।

— আবু দাউদ শরীফঃ১/৮৪

বর্তমানে আমাদের সমাজের কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি যারা মহিলাদেরকে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুবই উৎসাহী। যেসব মহিলা পর্দা করেনা তাদেরকে তারা পর্দার জন্য বলেন না। কিন্তু যারা পর্দা করে তাদেরকে পর্দা থেকে বের করে পুরুষদের মাহফিলে নিয়ে যেতে যার পর নাই তৎপর। তারা এসব মহান সাহাবীদের সমালোচনা করে বলে থাকেন যে, রাসূলে আকরাম (সাঃ) যখন মহিলাদের মসজিদে যেতে বাধা প্রদান করতে নিষেধ করেছেন এবং কারো কাছে অনুমতি চাইলে তাকে অনিমতি দিতে বলেছেন। এখন সাহাবাদের এই ভিন্ন মত পোষণ করা গ্রহণীয় নয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে যে সুন্নাতটি চালু ছিল তার বিপরীতে কোন আলেম-উলামার কথা, কোন ফিকাহ বা ফতোয়ার কিতাবের ফতোয়া গ্রহণ করার অর্থ হবে রাসূলের আদর্শকে বাদ দিয়ে তাদেরকে বড় মনে করা। তাই আমরা এসব ফতোয়া মানি না।

আসুন এবার আমরা বিরুদ্ধবাদীদের এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করি। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসব ভাইয়েরা সুন্নাতকে মহব্বত করেন বলেই এই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তারা চান না যে রাসূলের সরাসরি হাদীস বা সুন্নাত বাদ দিয়ে অন্য কারো কথা মানা হোক। আর এটা কোন মুমিন মুসলিম চাইতেও পারে না।

কিন্তু কথা হলো এই প্রশ্ন উত্থাপন করার আগে আমাদেরকে সুন্নাতের সংজ্ঞা এবং সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা সম্পর্কে জানতে হবে।

স্মরণ রাখা দরকার যে, রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর কওল ফেয়েল ও তাকবীর দ্বারা প্রমাণিত বিষয়সমূহ যেমনভাবে সুন্নত এবং অনুসরণযোগ্য তেমনিভাবে রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর পরে খুলাফায়ে রাশেদীনের আমল দ্বারা যেটা প্রমাণিত সেটাও সুন্নাত বলে গণ্য এবং তার অনুসরণ করা ওয়াজিব। কেননা রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর একটা সহীহ হাদীস বা আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুস্নাদে আহমদ ইত্যাদি হাদীসের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে,

আমার পর যারা জীবিত থাকবে তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে এমতাবস্থায় তোমাদের জন্য জরুরী হলো তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং আমার পর খুলাফায়ে রাশেদীন যেসব সুন্নাত জারী করবে সেগুলিকে দৃঢভাবে আঁকড়ে ধরবে যেমন নাকি দাঁত দ্বারা কোন জিনিস মজবুতভাবে ধরা হয়।

— আবু দাউদ শরীফঃ২/৬৩৫

তিরমিযী শরীফে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

হযরত হুযাইফা (রাযিঃ) বলেন, রাসূলে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, জানিনা আমি কতদিন তোমাদের মধ্যে থাকব। আমার পরে তোমরা আবু বকর এবং উমরের তরীকা অনুসরণ করবে।

— তিরমিযী ২/৩৬২

এখানে খুব ভাল্ভাবে লক্ষ্য করুন। প্রথম হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করাকে নিজেরকরা বলে ঘোষণা করেছেন। আর দ্বিতীয় হাদীসে বিশেশভাবে হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রাযিঃ) এবং হযরত উমর ফারুক (রাযিঃ)-এর অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন।

অনুরূপভাবে শীর্ষ স্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম, ফুকাহা এবং তাবেঈনরাও যদি কোন বিষয়ের উপর ইজমা করেন তাহলে সেটাও সুন্নাত বলে বিবেচিত হবে। নাজাতের জন্য সেটার উপর আমল করাও জরুরী। হাদীস শরীফে মুক্তি প্রাপ্ত জামাআতের পরিচয় দিতে যেয়ে বলা হয়েছে, আমি এবং আমার সাহাবারা যে তরীকার উপর আছি সেটার অনুসরণ করলেই মুক্তি পাওয়া যাবে। [4]

তাছাড়া সাহাবা এবং তাবেঈন্দের যুগকে খাইরুল কুরুন তথা শ্রেষ্ঠ যুগ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এসব হাদীস দ্বারা বুঝে আসে যে, হুযুর (সাঃ)-এর তালীম হোক বা খুলাফায়ে রাশেদীনের জারীকৃত বিধান হোক কিংবা শীর্ষ স্থানীয় সাহাবা তাবেঈনদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হোক সবগুলির উপর আমল করাই সুন্নাত। এখন আপনিই দেখুন সাহাবায়ে কেরামের যুগে মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার কি হুকুম ছিল।

এখানে খুব ভাল ভাবে মনে রাখা দরকার যে, সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (সাঃ)-এর সর্ব প্রথম ছাত্র ছিলেন। তাদের সামনেই ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। হুযুর (সাঃ)-এর পবিত্র মুখ থেকে তারাই সর্ব প্রথম সরাসরি হাদীস শুনেছেন। তারাই ছিলেন সেসব হাদীসের সর্ব প্রথম লক্ষ্য বস্তু। তারা হুযুর (সাঃ)-এর যিন্দেগী অতি নিকট থেকে দেখেছেন। তার প্রতিটি সুন্নাতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করেছেন। যে কোন হাদীসের মর্ম ও ব্যাখ্যা সাহাবায়ে কেরামই সবচেয়ে বেশী জানতেন, কারণ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সমস্ত উম্মত থেকে সর্বদিক দিয়ে যাচাই বাছাই করে নির্বাচিত করেছিলেন। দ্বীনের প্রতিটি বিষয় সম্বন্ধে তারা রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর নিকট থেকে বাস্তব প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ইন্তেকালের পর সর্ব প্রথম তারাই জান-মাল ও সময়ের কুরবানী দিয়ে দ্বীনের হেফাযত করেছিলেন।

সুতরাং তাদের সম্পর্কে এটা ধারণা করাও মস্ত বড় পাপ যে, তারা নিজেদের মনগড়া উক্তির মাধ্যমে রাসূলী সুন্নাতকে বদলে ফেলেছিলেন বা তারা রাসূলের আদর্শ বিরোধী কাজ করেছেন।(নাউযুবিল্লাহ) আজ যারা হযরত উমর (রাযিঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাযিঃ)-এর সমালোচনা করে বড় রাসূল প্রেমিক সাজতে চান তারা এদিকটা একটু খেয়াল রাখবেন আশা করি। আল্লাহ না করুন সাহাবাদের সম্পর্কে আমরা যদি এমন ধারণা পোষণ করতে শুরু করি তাহলে সেটা কিন্তু তাদের উপর অপবাদ দেয়া হবে আর এই অপবাদের কারণে তাদের কোন কথা আর গ্রহণযোগ্য থাকবে না। এমতাবস্থায় পুরা দ্বীনের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে। তাই কথা বলার সময় খুব সাবধানে কথা বলা উচিত।

সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে নিয়ে আজ চৌদ্দশত বৎসর পর্যন্ত লাখো কোটি উলামায়ে কেরাম এসব হাদীসের যে মতলব বুঝে এসেছেন এবং ফতোয়া দিয়ে এসেছেন আজ এই কিল্লতে ইলমীর যুগে এরকম স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সেই সব হাদীসের উল্টা মতলব বুঝা এবং তা প্রচার করা আর যারা মানে না তাদেরকে গালমন্দ করা কত বড় ফেৎনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা কি আপনারা কখনও চিন্তা করে দেখেছেন? অধিকাংশ মা-বোনেরা আজ পরিপূর্ণভাবে পর্দা প্রথা পালন করছে না। খাছ পর্দা তো অনেক দ্বীনদার ব্যক্তিবর্গের বাড়ীতেও নেই, সেক্ষেত্রে এসব সংশোধনের চেষ্টা না করে মহিলাদের মসজিদে আর ঈদগাহে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনারা এত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেন?

শেষ কথা

এতক্ষণ যাবৎ আমরা যে আলোচনা করলাম তার দ্বারা কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেল, তা হচ্ছে-

(১) রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর এমন কোন হাদীস নেই যার মধ্যে স্পষ্টভাবে মহিলাদের নামায পড়ার জন্য মসজিদে বা ঈদগাহে যেতে বলা হয়েছে। মসজিদে যাওয়া সংক্রান্ত যেসব হাদীস পাওয়া যায় তাতে অত্যন্ত অপছন্দের সাথে শর্ত সাপেক্ষে এমনভাবে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে যাতে মহিলারা নিজেরাই মসজিদে যেতে অনুৎসাহিত হয়ে পড়ে।
(২) মহিলাদেরকে মসজিদে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর সুন্নাতের স্পষ্ট বিরোধিতা।
(৩) মহিলারা মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদেরকে নিষেধ না করা সুন্নাতে রাসূল ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত এবং সাহাবায়ে কেরামের ইজমা একথা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ঐ সুন্নাত সাময়িক এবং শর্ত সাপেক্ষে ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণে এবং শর্ত না পাওয়ার দরুণ এখন নিষেধ করাটাই সুন্নাত।
(৪) মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে বাধা না দেয়া বাহ্যিক দৃষ্টিতে সুন্নাতে রাসূলের অনুসরণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটা সুন্নাতে রাসূলের বিরোধিতা ছাড়া কিছু নয়। পক্ষান্তরে মসজিদে যেতে নিষেধ করা আপাতঃ দৃষ্টিতে সুন্নাতে রাসূলের বিরোধিতা মনে হলেও বাস্তবে সেটাই সত্যিকারের সুন্নাতে রাসূলের অনুসরণ।

তথ্যসূত্র

  1. মা’আরিফুল কুরআনঃ ৭-২০৮
  2. বুখারী শরীফঃ ১-১৫৯
  3. আইনী শরহে বুখারীঃ ৩/২৩১
  4. তিরমিযীঃ ২/১০২
  • ডাঃ জাকির নায়েকের ভ্রান্ত মতবাদ (লেখকঃ মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী)