মিলাদুন্নবী (দ:) সম্পর্কে উলেমাবৃন্দের বক্তব্য

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
শায়খ আলাউইয়ী মালেকী (রহঃ)

মক্কা মেয়াযযমায় অবস্থিত পবিত্র মসজিদের প্রাক্তণ শায়খ আলাউইয়ী মালেকী (বেসাল: ১৩৯১ হিজরী) তাঁর ”ফাতাওয়া” গ্রন্থে বলেন, মীলাদুন্নবী (দ:) উদযাপন তিন ভাগে বিভক্ত।

  • প্রথমতঃ মহানবী (দ:)-এর মোবারক নামগুলো, তাঁর মহান বংশ পরিচয়, তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের বৃত্তান্ত ও এর সাথে জড়িত নানা অত্যাশ্চর্য ঘটনা, তাঁর রেসালাত, ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময় বিভিন্ন দুঃখ-কষ্টে ও অন্যায়-নিপীড়নে তাঁর ধৈর্য-সহ্য, তাঁর মদীনায় হিজরত, এবং তাঁর বেসাল তথা খোদার সাথে পরলোকে মিলনপ্রাপ্তির কথা উল্লেখ করা; এগুলোর সবই তাঁর প্রতি মহব্বত ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
  • দ্বিতীয়তঃ মহানবী (দ:)-এর কোনো নাম মোবারক উচ্চারণের সাথে সাথে তাঁর প্রতি সালাওয়াত (দরুদ-সালাম) পাঠও এসে পড়ে, যা সূরা আহযাব, ৫৬ নং আয়াতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এরশাদ হয়েছে,

হে ঈমানদার সকল! তোমরাও মহানবী (দ:)-এর প্রতি দরুদ ও (ভক্তিসহ) সালাম প্রেরণ করো।

  • তৃতীয়তঃ মহানবী (দ:)-এর নিখুঁত বৈশিষ্ট্য, অনুকরণীয় আচার-ব্যবহার, মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্য ও উন্নত নৈতিকতার উল্লেখ করা। এগুলো তাঁর পথ, রীতি-নীতি ও আচার-আচরণের অনুসরণে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। ইয়েমেন দেশের মানুষ মীলাদুন্নবী (দ:) উদযাপনে সমবেত হলে সেখানকার উলামাবৃন্দ এ উপলক্ষে তাঁদেরকে সঠিক পথ সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন এবং ওই পথের দিকে হেদায়াত দিতেন।
শায়খ মোহাম্মদ আল-খাদর হুসাইন (রহঃ)

মিসরের জামে’ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শায়খ মোহাম্মদ আল-খাদর হুসাইন (ওফাত:১৩৭৮ হিজরী) ‘আল-হেদায়া’ ম্যাগাজিনে বলেন, মহানবী (দ:)-এর মীলাদ উদযাপন তাঁর সাহাবা তথা সাথীবৃন্দের রীতি-নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সর্ব-হযরত হাসসান বিন সাবেত (রা:), আলী ইবনে আবি তালেব (ক:), আল-বারাআ’ ইবনে ‘আজিব (রা:) ও আনাস বিন মালিক (রা:) সে সকল বুযূর্গের অন্তর্ভুক্ত যাঁদের পদ্য বা অন্য কোনো পন্থায় কৃত মহানবী (দ:)-এর প্রশংসা-স্তুতি এবং তাঁরই মহান (সত্তাগত) বৈশিষ্ট্য, আচার-ব্যবহার ও গুণাবলী সম্পর্কে প্রদত্ত বর্ণনা মানুষেরা শুনতেন।

শায়খ আবদুল মজীদ মাগরেবী (রহঃ)

শায়খ আবদুল মজীদ মাগরেবী (ওফাত:১৩৫২ হিজরী) তাঁর প্রণীত ‘আল-মিনহাজ ফীল্ মে’রাজ’ গ্রন্থে বলেন, মুসলমান সমাজ যে সব ভাল আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন, তার মধ্যে ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:)-এর বাৎসরিক মাহফিল অন্যতম। তাঁরা সমবেত হয়ে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মীলাদের বৃত্তান্ত শুনতেন, যে মহানবী (দ:)-কে আল্লাহতা’লা (ধরণীতে) পাঠিয়েছিলেন অজ্ঞতার অমানিশা থেকে মানবকুলকে রক্ষা করে আলোকোজ্জ্বল সঠিক পথের দিশা দিতে।

হাফেয আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল (রহঃ)

হাফেয আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল (ওফাত: ৯৬৫ হিজরী) যিনি আবু শামাহ নামে সমধিক প্রসিদ্ধ, তিনি তাঁর ‘আল-বা’য়েস আ’লা এনকার আল-বেদআ’ ওয়াল হাওয়াদিস’ পুস্তকে বলেন, বেদআতে হাসানা বা নতুন প্রবর্তিত উত্তম/কল্যাণকর প্রথাগুলোর অন্যতম হলো মীলাদুন্নবী (দ:)-এর দিন উদযাপনের জন্যে যা যা করা হয়; যেমন – দান-সদকাহ করা, অন্যান্য সওয়াবদায়ক আমল পালন এবং খুশি প্রকাশ করা। গরিবদের প্রতি দয়াশীল হওয়ার পাশাপাশি এ রকম একটি আমল মহানবী (দ:)-এর প্রতি কারো মহব্বত, প্রশংসা ও গভীর শ্রদ্ধার ইঙ্গিত বহন করে এবং তাঁকে নেয়ামতস্বরূপ (আমাদের মাঝে) প্রেরণের জন্যে তা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে।

হাফেয সাখাভী (রহঃ)

হাফেয সাখাভী (ওফাত: ৯০২ হিজরী) তাঁর ’ফাতাওয়া’ গ্রন্থে বলেন, মওলিদ উদযাপন হিজরী তৃতীয় শতকের পরে আরম্ভ হয়। অতঃপর ইসলামী জনসমাজ সকল শহর ও নগরে দান-সদকা, মহানবী (দ:)-এর মীলাদ-বর্ণনার মতো নানা সওয়াবদায়ক আমল পালন করে এর উদযাপন করে আসছেন।

ইমাম হাফেয জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (রহঃ)

ইমাম হাফেয জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (বেসাল: ৯১১ হিজরী) তাঁর ‘হুসনুল মাকসিদ ফী ‘আমালিল মাওলিদ’ পুস্তকে বলেন, মীলাদুন্নবী (দ:) উদযাপনের উদ্দেশ্যে মানুষজনকে সমবেত করা, কুরআন মজীদের আয়াতে করীমা তেলাওয়াত করা, মহানবী (দ:)-এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা, তাঁর বেলাদতের (ধরণীতে শুভাগমনের) সাথে সম্পর্কিত বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনাবলীর উল্লেখ করা, এবং এই উপলক্ষে মানুষকে খাবার পরিবেশন করা সেই সকল বেদআতে হাসানা (কল্যাণকর ও সওয়াবদায়ক নতুন প্রবর্তিত আমল)-এর শ্রেণীভুক্ত যা মহানবী (দ:)-এর প্রতি আনুগত্য ও যথাযথ সম্মান প্রতিফলন করে।

শায়খ মোহাম্মদ ইলিয়াশ (রহঃ)

মালেকী মযহাবের আলেম শায়খ মোহাম্মদ ‘ইলিয়াশ (ওফাত: ১২৯৯ হিজরী) তাঁর ’আল-কওল আল-মুনজিয়ী’ কেতাবে বলেন, ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:) আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম পালন করা হয় হিজরী ৬ষ্ঠ শতকে। এটি প্রবর্তন করেন ইরবিলের ন্যায়পরায়ণ সুলতান মোযাফফর শাহ। ওই সব অনুষ্ঠানে তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন আলেম-উলেমা ও মহান সূফীবৃন্দসহ সকলকে আমন্ত্রণ জানাতেন। যে মেজবান খাওয়ানো হতো তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকতো ৫০০০ দুম্বার রোস্ট, ১০০০০ মোরগ ও ৩০০০০ প্লেট মিষ্টি। সেই সময় থেকে অদ্যাবধি মুসলমান সমাজ রবিউল আউয়াল মাসে মীলাদুন্নবী (দ:) উদযাপন করে আসছেন। এর আয়োজনে তাঁরা মানুষকে খাওয়ানো, গরিব-দুঃস্থদের মাঝে দান-সদকাহ এবং অন্যান্য প্রশংসনীয় (মোস্তাহাব) আমল পালন করেন। এই আমল (ইসলামী আচার) তাঁদেরকে বিগত বছরগুলোতে মহা রহমত-বরকত অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

ইমাম হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহঃ)

ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:) সম্পর্কে ইমাম হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) বলেন, ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:) উদযাপনে যে সব নেক বা পুণ্যময় কাজ করা যায় তাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে – মহানবী (দ:)-এর প্রতি (শোকরিয়াসূচক) খুশি উদযাপন ও আনুগত্য প্রদর্শন; পুণ্যবান ও গরিব মানুষকে সমবেত করে তাঁদেরকে খাওয়ানো; নেক আমল পালন ও মন্দ বেদআত বর্জনে উদ্বুদ্ধ করে এমন ইসলামী নাশিদ/না’ত/সেমা/কাওয়ালী/পদ্য আবৃত্তি বা পরিবেশন; রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রশংসাসূচক (এ ধরনের) শে’র-পদ্য-সেমা আবৃত্তিকে সে সকল শ্রেষ্ঠ মাধ্যমের অন্তর্গত বলে বিবেচনা করা হয় যা দ্বারা কারো অন্তর তাঁর প্রতি মহব্বত-আকৃষ্ট হয়।