মিলাদ ও ক্বিয়ামের পক্ষে দেওবন্দী আলেমগণ

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

মাওঃ আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)

মাওঃ আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বলেন

এভাবে কিয়াম করাকে আমরা অবৈধ বলিনা,বরং কোথাও রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনাকালে দাড়িয়ে যান, আবার কখনো তাঁর দুগ্ধ পানের ঘটনা বলার সময়,আবার কখনো মিরাজুন্নবির আলোকপাত কালে,এমনিভাবে কোনো কোনো খাস মাহফিলে ৩-৪ বারও কিয়াম করে থাকেন।তবে এরুপ মিলাদ কিয়াম করাকে কে নিষেধ করবে??(অর্থাৎ নিষেধ করা নয়)

— তাবলিগ,পৃঃ ৩৫ (লেখকঃ আশরাফ আলী থানবী (রহঃ))

মাওঃ আশরাফ আলী থানভী কোনো এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন-

প্রচলিত মিলাদ মাহফিলের ব্যাপারে সাধকদের আমলকে আমি ভিত্তিহিন মনে করিনা। শাফেয়ী মাযহাবের মুযতাহিদ বা গভেষক ফিকাহ শাস্ত্রবিদদের অভিমত উহাই। আল্লামা ইমাম শামী (রহঃ) তাঁর প্রণিত কিতাবের মুসাফাহা বা'দাস সালাত অধ্যায়ে শায়েখ আবু জাকারিয়া মহিউদ্দিন নববি (রহঃ) এর অনুরুপ অভিমত বলে বর্ণনা করেছেন।কাজেই যেসব সুফিয়ায়ে কেরাম বিশুদ্ব পন্থায় মিলাদ মাহফিল করেন , তাদের ব্যাপারে আপত্তিমুলক খারাপ ধারণা না করাই উচিত।

— মাযালিসে হাকিমুল উম্মত(রচনায় মুফতি মুহাম্মদ শফি)

মাওঃ আশরাফ আলী থানবি,মাওঃ রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহঃ),মাওঃ কাসেম নানুতুবি প্রমুখ দেওবন্দি বড় বড় আলেমদের পীর ছিলেন হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মাক্কী (রহঃ) যিনি মিলাদ কিয়ামের পক্ষে ছিলেন।যখন অনেকেই তাঁকে বেদাতি বলে ফতোয়া দিতে লাগলেন তখন মাওঃ আশরাফ আলী থানবি নিজের পীর এর পক্ষে কলম ধরলেন।তিনি বলেন-

হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মাক্কী (রহঃ) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অবিকল আকিদায় বিশ্বাসী ছিলেন।তাঁর এসব আমল তথা প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম অনুষ্ঠানে যোগদান,বক্তব্য ও লেখনির মাধ্যমে তা সমর্থন করা কোনো ভ্রান্ত আকীদা বা শীয়া ধর্মের অনুকরন ছিলনা। বরং এহেন মহৎ আমলগুলা যেহেতু মূলত বৈধ ,তাই তিনি বৈধ কাজকে পুন্যময় মনে করে নিজে করতেন এবং অপরকে করতে উৎসাহ যোগাতেন।

— এমদাদে ফতোয়া

মাওঃ আশরাফ আলী থানভী উক্ত বইয়ের ৩৮ পৃষ্টায় আরো বলেন-

আমাদের আলেমগন প্রচলিত মিলাদ-কিয়াম নিয়ে অনেক ঝগড়া বিভেদে লিপ্ত রয়েছেন।এতদসত্তেও আমরা মিলাদ ও কিয়ামকে বৈধ বা ' পুন্যময় আমল ' মনে করি।যেহেতু ইহা বৈধ পন্থায় আদায় করার সুযোগ আছে সেহেতু এমতাবস্থায় বিরুধী দলের এত বাড়াবাড়ি ঠিক নয়।প্রকৃত পক্ষে মক্কা ও মদিনা শরিফের হক্কানি, রব্বানি উলামা মাশায়েখদের অনুকরনই আমাদের জন্য যতেষ্ট।অর্থাৎ হারামাইন শরিফাইনে মিলাদ,কিয়াম হতো,তাদের অনুকরন ই আমরা করবো।অবশ্য কিয়াম করার সময় নুরনবীর জন্মের খেয়াল না করা উচিত।এ কথাও চির সত্য যে, যদি মিলাদ মজলিসে হুযুরে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উপস্থিত হতে পারেন, এমন বিশ্বাস স্থাপনে কোনো দোষ নেই।কারন জড় জগত স্থান,কাল হতে সম্পুর্ন মুক্ত বিধায় নবী কারিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত হওয়া মোটেও অসম্ভব নয় ।

— এমদাদে ফতোয়া

মাওঃ আব্দুল হাই লখনভী (রহঃ)

মাওঃ আব্দুল হাই লখনভীর দৃষ্ট মিলাদঃ মাওঃ আব্দুল হাই লখনভী ভারতিয় উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত দেওবন্দি আলেম। তিনি তাঁর মযমুয়ায়ে ফতোয়া কিতাবের ২য় খণ্ড ৩৪৭ পৃষ্টায় লিখেনঃ

মিলাদ বা জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনার সময় যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিকারের ইশকে মুহাব্বাতে লৌকিকতা বিহীন কিয়াম বা দাড়িয়ে যায় তাহলে কিছু বলার নেই।মজলিশের আদব হচ্ছে অন্যান্য ব্যাক্তিগন তার অনুকরনে কিয়াম করবে।ইশক মুহাব্বাত ব্যাতিত ইচ্ছাকৃত দাড়ানো এটা ফরয,ওয়াজিব,সুন্নাত মুয়াক্কাদা ও মুস্তাহাবে শরিয়ত নয়। কেননা এটা হুযুর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার যামানা বা কুরুনে ছালাছায় (উত্তম যুগ) ছিলনা। ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) ' ইয়াহয়া উলুমুদ্দিন' কিতাবে নকল করেছেন যে, হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন - ক্ষেত্র বিশেষে সাহাবায়ে কেরাম রাসুলে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তিনির জন্য দাড়াতেন্না, কিন্তু হারামাইন শারিফাইনের উলামায়ে কেরাম অর্থাৎ মক্কা ও মদিনা শরিফের আলেমগন মিলাদের সময় কিয়াম করতেন।ইমাম বরজনযী (রহঃ) স্বীয় ' মিলাদুন্নাবী' কিতাবে লিখেছেন - রাসুলে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনাকালে কিয়াম করা বিচক্ষণ ইমামগন মুস্তাহাব বলেছেন।কতই যে খুশীর সুসংবাদ ঐ ব্যাক্তির জন্য যার একমাত্র উদ্দেশ্য হুযুরে আকরাম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার সন্মানার্থে দাড়ানো।

— মযমুয়ায়ে ফতোয়া, ২য় খণ্ড, ৩৪৭ পৃষ্ঠা

মাওঃ হুসাইন আহমদ দেওবন্দির দৃষ্টিতে মিলাদ

মাওঃ হুসাইন আহমদ ছিলেন দেওবন্দ মাদ্রাসার একজন প্রখ্যাত শায়খুল হাদীস।তিনি তাঁর ' মাক্তুবাতে শায়খুল ইসলাম' কিতাবে লিখেন- হযর আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস র(আদিঃ) হতে বর্ণিত - তিনি বলেন, রাসুলে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম ইরশাদ করেন,নিশ্চই আল্লাহ তা'য়ালা এই জমিনে কিছু ভ্রমনকারী ফেরেশতা নিয়োগ করেছেন। তাঁরা আমার উম্মতের প্রেরিত ছালামগুলো আমার নিকট পৌঁছান।
হযরত আবু হুরাইরা (রাদিঃ) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন রাসুলে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম ইরশাদ করেন- যে কোনো উম্মত আমার উপর ছালাম প্রদান করে আল্লাহ তা'য়ালা তা আমার রুহে পৌঁছান আর আমি তার ছালামের জবাব দেই।
স্মরণ রাখা উচিৎ, হযরত রাসুলে আকরাম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার রওদ্বা শরিফের সামনে ছালাম পড়া হোক, তা কাছের স্থান থেকে হোক কিংবা দূরবর্তী স্থান থেকে, তা রাসুলে মাকবুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার নিকট পৌঁছে।উপরল্লেখিত হাদীসদ্বয়ে দূর ও নিকট থেকে ছালাম দেওয়ার কোনো বৈশিষ্ট নেই।অর্থাৎ প্রত্যেক স্থান হতে ছালাম তিনির নিকট পৌঁছে।ছালামদাতা যখন ইচ্ছা ছালাম প্রেরন করতে পারবে।দাড়িয়ে বা বসে ছালাম দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়নি।হ্যাঁ,রাসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার জিকরে বেলাদাত বা জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা কালে কেহ দাড়িয়ে ছালাতু ছালাম পড়লে ,তাতে দোষের কি আছে?? (মাক্তুবাতে শাইখুল ইসলাম,১ম খণ্ড,৩৩৯ পৃষ্টা)

আক্বায়েদে উলামায়ে দেওবন্দ কিতাবে মিলাদের হুকুম

আক্বায়েদে উলামায়ে দেওবন্দ কিতাবের ১৯ পৃষ্টায় মিলাদের ব্যাপারে নিম্নের ফতোয়া আসেঃ আমরা (দেওবন্দি উলামাগন) মিলাদ মাহফিলে রাসুলে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তিনির জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করাকে অস্বীকার করিনা, বরং নাজায়েয বস্তু যা উহার সহিত যুক্ত হয়েছে, তাহা অস্বীকার করি।হ্যাঁ, যদি কোনো মিলাদ মাহফিলে মন্দ উপসর্গ বর্জিত হয়, তবে আমরা কি এ কথা কখনো বলতে পারি যে, মিলাদ শরিফের বর্ণনা নাজায়েয ও বেদাত! এহেন মন্দ কথা কোনো মুসলমানের প্রতি কিভাবে ধারণা করা যেতে পারে???
উক্ত কিতাবের ৪১ পৃষ্টায় আরো উল্লেখ আছে - মিশর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত আলেম শাইখুল উলামা সেলিম সাহেব বলেন যে, হুযুরে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার জন্ম কাহিনি বর্ণনার সময় কিয়াম অস্বীকার করা এবং হুযুরের ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করাকে পৌত্তলিক এবং রাফেজীগনের সহিত তুলনা করা আর ইহার সমালোচনা করা একজন ইমানদারের কাজ হতে পারেনা।কেননা পূরবর্তী ইমামগন এই মিলাদের কিয়াম হুযুর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তিনির শান,মান ও মর্যাদার উদ্দেশ্যে মুস্তাহসান মনে করেছেন এবং উহা এমন একটি কাজ,যার দধ্যে খারাপ বা নিন্দনীয় বলতে কিছুই নেই।

— আকায়েদে উলামায়ে দেওবন্দ, রচনায়- মাওঃ খলিল আহমদ সাহারানপুরী দেওবন্দী

মাওঃ রশিদ আহমদ গাঙ্গুহীর উস্তাদের দৃষ্টিতে মিলাদ

মাওঃ রশিদ আহমদ উস্তাদ প্রখ্যাত আলেম মাওঃ শাহ আহমদ সাইদ হানাফী তাঁর 'মালফুযাত' এ বলেছেন- মিলাদ শরীফ পাঠ করা এবং রাসুলে আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তিনির জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা কালে কিয়াম বা দাড়িয়ে যাওয়া মুস্তাহাব।

— মাকামাতে সাইদিয়া ওয়া আহমাদিয়া

দেওবন্দি উলামাদের পীর সাহেবের দৃষ্টিতে মিলাদ

বিশিষ্ট দেওবন্দি উলামাদের (মাওঃ কাসেম নানুতুবী, রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী, মাওঃমাহমুদুল হাসান, মাওঃ আশরাফ আলী থানভী…প্রমুখ) পীর হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মাক্কি (রহঃ) যিনি এই উপমহাদেশে একজন যোগ্য দীনের মুবাল্লেগ হিসেব্দ পরিচিত এবং পীরে কামেল ও আধ্যাত্নিক সাধক ছিলেন,তিনি তাঁর লিখিত কিতাব ফয়সালায়ে হাফত মাস'আলা কিতাবের মধ্যে মিলাদ নিয়ে একটি অধ্যায় লিখেছেন,সেখানে এক যায়গায় তিনি বলেছেন-

আমার নীতি হচ্ছে আমি মিলাদ মাহফিলে যোগদান করি এবং এটাকে বরকতের উছিলা মনে করে আমি নিজেই প্রতি বছর এর আয়োজন করে থাকি এবং কিয়ামে আনন্দ ও তৃপ্তি পেয়ে থাকি।

— ফয়সালায়ে হাফত মাস'আলা