এই সুন্নিপিডিয়া ওয়েবসাইট পরিচালনা ও উন্নয়নে আল্লাহর ওয়াস্তে দান করুন
বিকাশ নম্বর ০১৯৬০০৮৮২৩৪

ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) * কারবালার ইতিহাস * পিস টিভি * মিলাদ * মাযহাব * ইলমে গায়েব * প্রশ্ন করুন

বই ডাউনলোড

মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রহঃ)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

বংশ পরিচয়

ফখরে আহলে সুন্নাত , হাকীমুল উম্মত , মুফাসসির-ই কুরআন , শায়খুল হাদীস মাওলানা মুফতী আহমদ ইয়ার খান না’ঈমী (রহঃ) ছিলেন সম্পরকের দিক দিয়ে ইউসুফ যাঈ বংশীয় পাঠান । তাঁর পূর্ব পুরুষদের কিছু সংখ্যক লোক মুঘল শাসনামলে আফগানিস্তান থেকে হিজরত করে হিন্দুস্তানে চলে এসেছিলেন । তাঁর দাদা মরহুম মুনাওয়ার খান (রহঃ) উজাহানি , বাদায়ুন হিন্দুস্তানের শীর্ষস্থানীয় লোকদের মধ্যে গন্য হতেন । তিনি সেখানকার পৌরসভার সম্মানিত সদস্যও ছিলেন ।

তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ ইয়ার , যিনি এক দ্বীনদার ও ইবাদত পরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন । তিনি উজাহানি (বাদায়ুন) এর জামে’ মসজিদের ইমামত , খিতাবত এবং ব্যবস্থাপনা সবকিছু নিজের দায়িত্বে নিয়েছিলেন । তিনি এসব দায়িত্ব নিয়মিত ভাবে দীর্ঘ ৪৫ বছর যাবত কোন পারিশ্রমিক ছাড়াই পালন করেছিলেন।

জন্ম

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়ার খান রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর ঔরশে পরপর পাঁচটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল । পাঁচ কন্যা সন্তানের পর মাওলানা মুহাম্মদ ইয়ার খান রহমাতুল্লাহি আলাইহি পুত্র সন্তানের জন্য আল্লাহ্‌ তায়ালার দরবারে বিশেষ দু’আ করলেন । সাথে সাথে এ মান্নতও করেছিলেন যে , যদি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে , তবে তাকে আল্লাহ্‌ জাল্লা জালালুহু ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর রাস্তায় দ্বীনের খিদমতের পরম্পরায় ওয়াকফ করে দিবো । আল্লাহ্‌ রাব্বুল ইযযাত ওই দু’আ কবুল করলেন । আর তাকে পুত্র সন্তান দান করলেন । তাঁর নাম রাখা হলো ‘আহমদ ইয়ার’ । মাওলানা মুহাম্মদ ইয়ার খান রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মান্নত অনুসারে এ সন্তানকে ইলম-ই দ্বীন অর্জন ব্যতীত অন্য কোন কাজে নিয়োগ করেন নি । এ সন্তানও সমানে অগ্রসর হয়ে তাঁর কর্মজীবনে এ কথা প্রমান করে দিলেন যে , তিনি বাস্তবিক পক্ষেই ‘আহমদ ইয়ার’ বা নবীপ্রেমিক । সত্যি সত্যি তিনি আল্লাহ্‌ তায়ালা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর রাস্তায় ওয়াকফকৃত হবার উপযোগী ছিলেন ।হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান না’ঈমী (রহঃ) এর জন্ম হয় ১৩২৪(১৯০৬ খ্রি) হিজরীতে ।

ছাত্রজীবন

মুফতি সাহেবের ছাত্র জীবনকে পাঁচটি সোপানে বিভক্ত করা যায়-

১। উজাহানি ।
২। বাদায়ূন শহর ।
৩। মীন্ডু ।
৪। মুরাবাদ । ও
৫। মিরাঠ ।

জন্মস্থান উজাহানীতে তিনি তাঁর সম্মানিত পিতার নিকট কুরআন মাজীদ পড়েন । এরপর ফার্সি ভাষায় পাঠ্য পুস্তকগুলো , দীনিয়াত এবং ‘দরসে নিযামী’-র প্রাথমিক পর্যায়ের কিতাবাদিও তাঁর নিকট পড়ে নেন । প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে অতি ছোট বয়সেই তিনি দীনী শিক্ষালাভের খাতিরে জন্মভুমি থেকে বের হয়ে পড়েন এবং বছরের পর বছর বাদায়ূন ও মীন্ডুতে ‘দরসে নিযামী’র উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে থাকেন ।উল্লেখ্য যে , মীন্ডুর মাদরাসায় দেওবন্দী চিন্তাধারার উল্লেখযোগ্য শিক্ষকগণও পড়াতেন । ইত্যবসরে , তাঁর এক বন্ধুর মাধ্যমে মুরাদাবাদের প্রসিদ্ধ বিরাট দীনী প্রতিষ্ঠান ‘জামেয়া না’ঈমীয়া’-র প্রতিষ্ঠাতা সদরুল আফাযিল মাওলানা মুহাম্মদ না’ঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী (রহঃ)এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়ে গেলো । সদরুল আফাযিল (রহঃ)ও এ অনন্য মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকায়িত যোগ্যতা দেখতে পেলেন । তিনি সাথে সাথে মুফতী সাহেবের উচ্চ শিক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়ে তাকে মুরাদাবাদ থেকে ফিরে যেতে দিলেন না ।

তখনকার সময়ে কানপুরের আল্লামা মুশতাক আহমদ (মরহুম) ইসলামী যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন শাস্র এবং অংক শাস্রে যুগশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসেবে গণ্য হতেন । মাওলানা মুরাদাবাদী (রহঃ) মাসিক যুক্তিসঙ্গত বেতন ধার্য করে আল্লামা মুশতাক আহমদ সাহেবকে জামেয়া না’ঈমীয়া , মুরাদাবাদে নিয়ে আসলেন । অতঃপর মুফতী সাহেবের উচ্চ শিক্ষার পরম্পরা শুরু হয়ে গেলো । কিছু দিন পর আল্লামা মুসতাক আহমদ সাহেব মীরাঠে তাশরীফ নিয়ে যান । তখন মুফতী সাহেবও তাঁর একজন বিশেষ শাগরিদ হিসেবে তাঁর সাথে সেখানে চলে গেলেন । এখানে এ কথা বিশেষ ভাবে উলেখ্য যে , আযাদী আন্দোলনের একজন নামকরা সৈনিক শায়খুল মুফাসসিরীন মাওলানা আবদুল গফুর হাযারভী (মরহুম)ও কানপুর , মুরাদাবাদ ও মীরাঠে আল্লামা মুশতাক আহমদ সাহেবের নিকট থেকে শিক্ষালাভ করতে থাকেন । অনুরূপভাবে , আল্লামা হাযারভী শায়খুত তাফসীর মুফতী আহমদ ইয়ার খান না’ঈমী (রহঃ) উস্তাদভাই ছিলেন । মুফতী সাহেব নিজেও বলতেন , মুরাদাবাদে অবস্থান হচ্ছে আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক । সদরুল আফাযিল মাওলানা মুহাম্মদ না’ঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী (রহঃ)এর ভালবাসা , স্নেহ , বিশেষ দৃষ্টি এবং কৌশলপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত প্রতিপালন আর প্রশিক্ষন মুফতী সাহেবের জীবনের উপর গভীর ও চির অম্লানভাবে রেখাপাত করেছিলো ।

তাঁর ছাত্রজীবনের দ্বিতীয় সোপান বাদায়ূন শহরে অতিবাহিত হয় । সেখানে তিনি এগার বছর বয়সে (অর্থাৎ ১৩৩৫ হি/১৯১৬ খ্রি) এসে মাদরাসা-ই শামসুল উলূমে ভর্তি হলেন । এ মাদরাসায় তিনি তিন বছর যাবত (১৩৩৫ হি থেকে ১৩৩৮ হি মুতাবিক ১৯১৬ খ্রি থেকে ১৯১৯ খ্রি পর্যন্ত ) শিক্ষালাভ করতে থাকেন । এটা ছিলো ওই যুগসন্ধিক্ষন , যখন মাদরাসা-ই শামসুল উলূম (বাদায়ূনে) –এ আল্লামা কাদীর বখশ বাদায়ূনী শিক্ষক ছিলেন । মুফতী সাহেব তাঁর ছাত্রদের অন্তর্ভুক্ত হন । ওই দিন গুলোতে মুফতী আযীয আহমদ সাহেব বাদায়ূনী ওই মাদরাসায় ‘দরসে নিযামী’-র শেষ পর্যায়ের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন ।

‘মাদরাসা-ই শামসুল উলূম’-র যে কামরায় মুফতী সাহেব স্থান পেয়েছিলেন তাতে আরো বহু ছাত্রও থাকতো । তাই , বেশীরভাগ ভাগ সময় শোরগোল ও হাঙ্গামা থাকতো , যা মুফতী সাহেবের অশান্তির কারণ হায়ে দাঁড়িয়েছিল । এক রাতে এত বেশী শোরগোল ও হাঙ্গামা হয়েছিলো যে , মুফতী সাহেব মোটেই পর দিনের পাঠ তৈরী করতে পারেন নি । সকালে আল্লামা কাদীর বখশ ক্লাশে ‘নাহভ মীর’-র সবক পড়ার জন্য বসলেন । তখন পূর্ণ মনযোগ ও একাগ্রতা সত্ত্বেও তিনি সেদিনকার সবক একেবারেই বুঝতে পারেন নি । সম্মানিত উস্তাদজি সবক পড়াতে পড়াতে সামনে অগ্রসর হয়ে যাচ্ছিলেন । আর মুফতী সাহেব সবকের প্রথমাংশও বুঝতে না পারার কারণে খুবই ইতস্তত বোধ করছিলেন । শেষ পর্যন্ত তিনি কেঁদে ফেললেন । সম্মানিত উস্তাদও এ সুরতে হাল দেখে বললেন , আহমদ ইয়ার কি ব্যাপার ? নিজের কৃতকর্মের তো চিকিৎসা নেই । পূর্ব পর্যালোচনা তো করো নি , আর এখন পাঠ বুঝার চেষ্টা করছো ? একথা বলে হয়তো আল্লামা সবকগুলো পড়ার জন্য ওযু সহকারে বসার শিক্ষা দিলেন । সম্মানিত উস্তাদের এই অন্তর্দৃষ্টি ও কাশফ দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন । আর মনে মনে স্থির করে নিলেন যে , আগামীতে তিনি ওযু সহকারেই ক্লাশে বসবেন । তিনি উস্তাদজিকে সব ঘটনা খুলে বললেন , যা তাঁর পাঠ-পর্যালোচনা করতে না পারার কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো । সাথে সাথে উস্তাদজি তাঁর জন্য আলাদা কামরায় অপর ভালছাত্র আযীয আহমদ বাদায়ূনীর সাথে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন । ফলে , তাঁর সব দুশ্চিন্তা দুরীভূত হয়ে গেলো । তিনি আযীয আহমদ সাহেবের মতো মেধাবী ছাত্রের সঙ্গ পেয়ে আরও বেশী উপকৃত হলেন । তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে লেখাপড়ায় মনযোগ দিলেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে অধ্যয়ন করতে লাগলেন । মুফতী আযীয আহমদ বাদায়ূনীর বর্ণনা মতে , মুফতী আহমদ ইয়ার খান ছাত্র জীবনে নিয়মিত পাঠ পর্যালোচনায় খুব অভ্যস্ত ছিলেন । নিয়মিতভাবে দেরীক্ষন রাত্রী জাগরণ করে পরদিন সকালের ক্লাশে পাঠ শিক্ষা করতেন । ক্লাশ ছুটির পর সঙ্গীদের নিয়ে ক্লাশে দেয়া সবক পুনরায় পর্যালোচনা করতে বসে যেতেন । কোন বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে সাথে সাথে উস্তাদের নিকট থেকে তা বুঝে নিতেন । যদি কখনো মুফতী সাহেবের উপস্থিত কোন তথ্য উস্তাদের মতে ভুল প্রমাণিত হতো , তবে সাথীদের নিকট এসে তাঁর ভুল স্বীকার করে নিতেন , আর উস্তাদের অভিমতটি বলে দিতেন । আর তিনি বলতেন – ‘এমতাবস্থায় আমি যতক্ষন পর্যন্ত না নিজের ভুল স্বীকার করে নিতাম ততক্ষন পর্যন্ত আমার মন-মেজাজ ঠিক হতনা ।’ মোটকথা , তিনি মাত্র তিন বছর মাদরাসা-ই শামসুল উলূমে লেখাপড়া করে সেখান থেকে কৃতিত্তের সাথে বের হয়ে আসলেন । মুফতী আযীয আহমদ সাহেবের বর্ণনা মতে , তিনি এ মাদরাসায় ‘নুরুল আনওয়ার’-র সবক পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন ।

বাদায়ূনের পর মুফতী সাহেবের ছাত্রজীবনের তৃতীয় পর্যায় মিন্ডু রাজ্যে অতিবাহিত হয়। এখানে রাজ্য প্রধানদের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ‘দারুল উলূম’ (মাদরাসা) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো । এর শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে ভাল অভিমতই পাওয়া যায় । মুফতী আযীয আহমদের বর্ণনানুসারে- এই মাদরাসা তখন দেওবন্দী ভাবধারায় পরিচালিত হতো । এ মাদরাসায়ও মুফতী সাহেব তিন/চার বছর লেখাপড়া করেন (১৩৩৮ হি থেকে ১৩৪১ হি মুতাবিক ১৯১৯ খ্রি থেকে ১৯২২ খ্রি পর্যন্ত) । এর ফলে তিনি দেওবন্দী ভাবধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লেখা-পড়ার সাথে ‘আ’লা হযরত আহমদ রিযা খান রাদীয়াল্লাহু আনহু ও সদরুল আফাযিল হযরত মুহাম্মদ না’ঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী রাদীয়াল্লাহু আনহু-র অধিকতর জ্ঞান-গভীরতার তুলনামুলক অভিজ্ঞতাও অর্জন করার সুযোগ পান । খোদ মুফতী সাহেব বলেন- আমি দেওবন্দী ওস্তাদদের নিকট একটা বিশেষ সময়সীমা পর্যন্ত লেখা-পড়ার পর একথা বুঝতে পারলাম যে শিক্ষাগত গবেষণার ব্যবস্থাটুকু তাদের আছে বটে কিন্তু আমি সৌভাগ্যক্রমে ইত্যবসরে সদরুল আফাযিল হযরত মুহাম্মদ না’ঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী কুদ্দীসা সিররুহুর সাথে সাক্ষাৎ হয়ে গেলো । তখন তিনি আমাকে আ’লা হযরতের লেখা ‘আতায়াল কাদীর ফী আহকা-মিত তাসভীর’ নামক একটা রিসালা (পুস্তক) পাঠ-পর্যালোচনার জন্য দিলেন । তা দেখে আমি যারপর নাই হতবাক হলাম । এই রিসালা মিন্ডুতে শিক্ষার্জনকালীন থেকে আমার উপর প্রভাব ফেলে এসেছে।

মুফতী আহমদ ইয়ার খান না’ঈমী সাহেবের সম্মানিত পিতা মাযহাব ও আকীদার ক্ষেত্রে কট্টর সুন্নী-হানাফী ছিলেন । তাই তাঁর ছেলে (মুফতী সাহেব) মিন্ডুর উক্ত মাদরাসায় পড়ুক তা তাঁর নিকট অপছন্দ ঠেকলো । একদা মুফতী সাহেব বার্ষিক ছুটিতে বাড়ীতে আসলেন । তখন তিনি তাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারলেন । মুফতী সাহাবের এক চাচাত ভাই মুরাদাবাদে চাকুরী করতেন । তিনি কিছু দিন বাড়ীতে থাকার পর মুরাদাবাদে চলে যাচ্ছিলেন । তিনি মুফতী সাহেবকে জোর দিয়ে বললেন , ‘আমার সাথে চলো । মুরাদাবাদে মাওলানা মুরাদাবাদীর সাথে সাক্ষাৎ করো ।’ সুতরাং তাঁর সাথে মুরাদাবাদে পৌঁছলেন , হযরত সাদরুল আফাযিলের সাথে সাক্ষাৎ করলেন । সাদরুল আফাযিল তাকে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন । তিনি সেগুলোর সঠিক উত্তর দিলেন । মুফতী সাহেবও এর পর সাদরুল আফাযিলের নিকট কয়েকটা বিষয় জানতে চাইলেন । তিনি সাদরুল আফাযিলের নিকট সেসব বিষয়ের তৃপ্তিদায়ক জবাব পেলেন । সতরাং একদিকে মুফতী সাহেব (মুরাদাবাদে) তাঁর সামনে ইলম ও হিকমত বা জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সমুদ্র ঢেউ খেলতে দেখতে পেলেন , অন্যদিকে সাদরুল আফাযিল ও এই অল্পবয়স্ক অথচ সম্ভাবনাময় মেধাবী শিক্ষার্থীর পূর্ণ যোগ্যতা মুফতী সাহেবের মধ্যে দেখতে পেলেন । অতঃপর সাদরুল আফাযিল বললেন , ‘ভাই মাওলানা জ্ঞানের সাথে জ্ঞানের মাধুর্যও যদি অনুভব করা যায় তবে স্থিরতা দান করা হয় এবং বক্ষ-প্রশস্থতারূপী অমূল্য ধন পাওয়া যায় ।’ মুফতী সাহেব আরয করলেন , ‘জ্ঞানের মাধুর্য বলতে কি বুঝায় ? হযরত বললেন , জ্ঞানের মাধুর্য হুযুর আলাইহিস সালামের পবিত্র সত্তার সাথে সম্পর্ক কায়েম রাখলেই হাসিল হতে পারে । শব্দাবলীর মাধ্যমে বর্ণনা করা যায় না । এই কথোপকথন মুফতী সাহেবের হৃদয়ে গভীর ও অবিস্মরণীয় ভাবে রেখাপাত করেছিলো ।

মুফতী আহমদ ইয়ার খান সাহেব উল্লিখিত সাক্ষাতের পর ‘জামিয়া না’ঈমীয়া’ মুরাদাবাদে ভর্তি হয়ে গেলেন । সাদরুল আফাযিল মুফতী সাহেবের চাহিদানুসারে যুক্তি ও দর্শন শাস্রের উচ্চ পর্যায়ের পাঠ দান আরম্ভ করলেন । কিন্তু হযরত মুরাদাবাদীর অতি ব্যস্ততার কারণে পাঠদান অনিয়মিত হতে লাগলো । ফলে, মুফতী সাহেব অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন । একদিন তিনি মুরাদাবাদ থেকে বের হয়ে গেলেন । সাদরুল আফাযিল তা জানতে পেরে তাকে ডেকে পাঠালেন । তিনি ফিরে আসলে তাকে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হলো যে , ভবিষ্যতে যাতে তাঁর পাঠ গ্রহণে অনিয়ম না হয় সেই ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়েছে । তিনি ইসলামী দর্শনের যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম ও বহু উচ্চ পর্যায়ের উস্তাদ আল্লামা মশতাক আহমদ কানপুরীর নিকট ‘জামেয়া না’ঈমীয়া’-য় অধ্যাপনার পদ অলংকৃত করার জন্য প্রস্তাব পাঠালেন । প্রস্তাব পেয়ে আল্লামা কানপুরী তা গ্রহণ করতে এ শর্তে রাজী হলেন যে , তখন তাঁর নিকট পড়ুয়া সকল ছাত্রকেও ‘জামেয়া না’ঈমীয়া’-য় ভর্তি এবং তাদের ভরণ-পোষণ ও অধ্যয়নের সুযোগ দিতে হবে । সাদরুল আফাযিল ওই শর্ত মেনে নিলেন । অতঃপর আল্লামা কানপুরী ‘জামেয়া না’ঈমীয়া’ মুরাদাবাদে তাশরীফ নিয়ে আসলেন । মুফতী সাহেবের বর্ণনা মতে , আল্লামা কানপুরীর তখন মাসিক বেতন ধার্য হয়েছিলো ৮০ রুপিয়া ।

এখন থেকে মুফতী সাহেবের ছাত্র জীবনের আরেক নতুন অধ্যায় শুরু হলো । এক দিকে উস্তাদ ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষাদাতা ও বরেণ্য ইমাম , অন্যদিকে ছাত্রছিলেন অনন্য মেধাবী ও শিক্ষার প্রতি অসাধারণ আগ্রহী । একদিকে উস্তাদের একথা জানা ছিলো যে , ইনি ছিলেন এমনি এক ছাত্র , যার জন্যই তাকে সুদূর কানপুর থেকে আনা হয়েছে , অন্যদিকে ছাত্রেরও একথা ভালোভাবে জানা ছিলো যে , এ আল্লামা-ই যামান ওস্তাসকে বিশেষ করে তাকে পড়ানোর জন্য এখানে আনা হয়েছে ।

কয়েক বছর পর আল্লামা মুশতাক আহমস কানপুরীর কয়েকটি অনিবার্য কারণ বশত চূড়ান্ত ভাবে মীরাঠে চলে যাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়লো । তিনি সাদরুল আফাযিলকে একথা বলে তাতে তাঁর অনুমতি লাভ করলেন যে , তিনি তাঁর এ প্রিয় ছাত্র আহমদ ইয়ার খানকেও সাথে করে মীরাঠে নিয়ে যাবেন । সাদরুল আফাযিলের অনুমত পেয়ে জ্ঞানের এই অনন্য কাফেলা মুরাদাবাদ থেকে মীরাঠের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলো । উল্লেখ্য যে , কানপুর , মুরাদাবাদ ও মীরাঠে শায়খুত তাফসীর আবুল হাকাইক আল্লামা আবদুল গফুর হাযারভীও আল্লামা মুশতাক আহমদের ছাত্র ছিলেন । মীরাঠে মুফতী সাহেব কমবেশী তিন বছর যাবত লেখা-পড়া করেন । এটা ছিলো তাঁর ছাত্রজীবনের শেহস পর্যায় । সর্বমোট , বিশ বছরে তিনি লেখা-পড়া শেষ করলেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাই জনাব আযীয খান (মরহুম) এক ঐতিহাসিক পংক্তি রচনা করেছেন , যাতে তিনি মুফতী সাহেবের ছাত্রজীবনের শেষবর্ষ (১৩৪৪ হি/ ১৯২৫ খ্রি) আয়াত

لقد فاز فوزا عظيما

(লাকাদ ফা-যা ফাউযান আযীমান)

‘অর্থাৎ নিশ্চয় সে মহা সাফল্য লাভ করেছে’ থেকে বের করেছেন ।

চোঁ আহমদ কেহ বা ইয়ার খান আস্ত মুনাদ্দাম

ব নূ কে যবান গাউহার সালে হাফতম

শুদাহ ফারেগ আয ইলমে দ্বি শুকরে হাক্ক

বগুফতম লাকাদ ফা-যা ফাউযান আযীমান

অর্থাৎ ‘যখন আহমদ শব্দতা ইয়ার খান শব্দের সাথে মিলিত হলো অর্থাৎ তিনি জন্ম গ্রহণ করলেন তখন (প্রাথমিক শিক্ষার পর) সপ্তম সাল থেকে তাঁর মুখ হতে যেন জ্ঞানের মুক্তা ঝরতে আরম্ভ করলো ।

এভাবে তিনি শিক্ষা জীবনের শুভ সমাপ্তি ঘটালেন এ বর্ষটিই পবিত্র কোরআনের আয়াত-‘লাকাদ ফা-যা ফাউযান আযীমান’ থেকে আবজাদ হিসাব অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় , এ জন্য আমি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ।’

ছাত্র জীবনের এ শেষ পর্যায়টি মুফতী সাহেবের জীবনের ওপর অম্লান নকশা এঁকে দিয়েছে । ইসলামী দর্শনে দক্ষতা আল্লামা মুসতাক আহমদ কানপুরী থেকে পেয়েছেন । দীনী শিক্ষার সাথে সবিনয় সম্পৃক্ততা এবং সত্য ও নিষ্কলুষ ধর্ম ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা-এর প্রতি অসাধারন ভালবাসার মতো উভয় জাহানের অমূল্য সম্পদ হযরত সাদরুল আফাযিলের নিকট থেকে লাভ করেছেন । হযরত সাদরুল আফাযিল প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে মুফতী সাহেবকে কিছুটা পাঠদান করেছেন বটে ; কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টি ও (হাদীসে পাকের অমীয় ভাষায়) মু’মিনসূলভ অন্তর্দৃষ্টি মুফতী সাহেবের সমগ্র ব্যক্তিত্বে সুন্দর পরিবর্তন এনে দিয়েছে । মুফতী সাহেব এ প্রসঙ্গে নিজেই বলেন , ‘আমার নিকট যা কিছু আছে সবই সাদরুল আফাযিল দান করেছেন ।’ তিনি সাদরুল আফাযিল মাওলানা না’ঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী রাদীয়াল্লাহু আনহু এর নামের সাথে সম্পৃক্ত করে আপন নামের সাথে ‘না’ঈমী’ লিখতেন । মুফতী সাহেবকে হাদীস শরীফ বর্ণনা করার অনুমতি ও সনদ প্রদান করেছেন- খোদ সাদরুল আফাযিল সায়্যিদ মাওলানা না’ঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী রাদীয়াল্লাহু আনহু । পরবর্তীকালে মুফতী সাহেব তাঁর ছাত্রদেরকে এ সনদই প্রদান করতেন ।

আ’লা হযরত মুহাম্মদ আহমদ রিযা খান (রহঃ)-র সাথে সাক্ষাৎ

বাদায়ূনে অধ্যয়নকালে মুফতী সাহেব আ’লা হযরত ফাযিলে বেরলভীর পবিত্র দরবারে হাযির হবার জন্য বেরিলী শরীফে তাশরীফ নিয়ে যান । খোদ মুফতী সাহেব বলেন , ‘মাত্র ১০/১২ বছর বয়সে আমি আ’লা হযরতের দীদারের জন্য বেরিলী শরীফ হাযির হয়েছিলাম । তখন ২৭ রজব নিকটবর্তী ছিলো । তাই আ’লা হযরতের দরবারে মি’রাজ শরীফ উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি পুরোদমে চলছিলো । সুতরাং এ ব্যস্ততার কারণে শুধু একটিবার মাত্র মজলিসে হাযির হবার সুযোগ হয় , যাতে আ’লা হযরতের দীদার বা সাক্ষাতের নসীব হয়েছিলো । সর্বোপরি , আ’লা হযরতের প্রতি পূর্ণ ভক্তি-শ্রদ্ধাই আমার যিন্দেগীত বড় মূলধন হয়ে রয়েছে ।’

লেখনি

ইমামে আহলে সুন্নাত আ’লা হযরত ফাযিলে বারেলভী (রহঃ) এর পরে মুফতী আহমদ ইয়ার খান না’ঈমী (রহঃ)-ই হলেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের জন্য অতি গৌরবোজ্জল লিখক । যদি একথা বলা হয় যে , আ’লা হযরত ফাযিলে বারেলভী (রহঃ) এর পর মুফতী সাহেব সর্বাপেক্ষা বড় লিখক , তবে টা মোটেই অত্যুক্তি হবে না । আ’লা হযরত ফাযিলে বারেলভী-র দীনী লিটারেচারের মান হচ্ছে ‘আলিমানা ও মুহাককিকা-না (অর্থাৎ গভীর জ্ঞান ও গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে বহু উঁচু) তিনি বিশেষ করে জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের মানস দেশকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে নিজের লিখনীগুলোতে উচ্চ শিক্ষাগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন ।

আলিম সমাজ ও জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জাগরণের জন্য একান্ত জরুরী ও বুনিয়াদী দীনী বই-পুস্তকগুলো আ’লা হযরতের কলম থেকে বের হয়েছিলো । এরপর প্রয়োজন ছিলো সহজ-সরল ও সাধা-সিধে হৃদয়গুলোকে প্রভাবিত করার মতো লিখনির । সুতরাং এ অঙ্গনে মুফতী সাহেব তাঁর মহান মসি দ্বারা এমনি প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন এবং তিনি এমন সব যুদ্ধে জয়যুক্ত হয়েছেন , যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে । মুফতী সাহেব কিবলা নিজেই বলেছেন , ‘আমি যখন লিখতে বসি , তখন একথা সামনে রাখি যে , আমি ছোট ছেলে-মেয়ে , মহিলা এবং গ্রাম ও মরুভূমির অল্পশিক্ষিত লোকদেরকেই সম্বোধন করছি । তাফসীর লিখতে বসার সময়ও উদ্দেশ্য এটাই ছিলো যে, ‘কোরআন কারীমের এমনই সহজ-সরল তাফসীর লিখা হোক , যা দ্বারা কোরআন-ই-হাকীমের কঠিন মাসাআলা-মাসাইলও সহজে বুঝা যায় । তিনি তাফসীর-ই না’ঈমী-র ভূমিকায় আরও লিখেছেন , ‘খুব চেষ্টা করা হলো যেন ভাষা সহজ হয় এবং কঠিন মাসাআলাগুলোও বুঝা যায় । বস্তুত এ সরলতা ও সহজবোধ্যতা শুধু ‘তাফসীর-ই না’ঈমী’-র বৈশিষ্ট্য নয় ; বরং তাঁর সমস্ত লিখনিতেই এমন ধরণ ও বর্ণনা ভঙ্গি বিদ্যমান । মুফতী সাহেব চূড়ান্ত পর্যায়ের বিষয়বস্তুকেও অতি সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য করে দেন । তিনি উচ্চ শিক্ষাগত মানদণ্ড ও জ্ঞান-গবেষণার উচ্চ মান বজায় রাখার পরিবর্তে নিজের লিখনি ও বর্ণনা উভয়টিকে বিশেষ ও সাধারণ উভয় ধরণের লোকদের একেবারে নিকটে নিয়ে এসেছেন । তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এটাই ছিলো যে , অল্পশিক্ষিত মানুষও তাঁর বর্ণনা বুঝতে সক্ষম হোক । তিনি ইলমে ‘তাসাউফ’ ও ‘মারীফাত’ এর গূড় রহস্য ও ইঙ্গিতগুলোর সুতীক্ষ্ণ মাহাত্ম্যকে পর্যন্ত এক বিশেষ শ্রেণির ইজারাদারী থেকে বের করে সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য করে দেন । এর একটি উদাহরণ দেখুন সূরা বাকারার ৭৪ নং আয়াতে-

ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّن بَعْدِ ذَٰلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً ۚ وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهَارُ

অর্থাৎ ‘অতঃপর তোমাদের কঠিন হৃদয় হয়ে গেছে । কাজেই , তারা পাথর গুলোর মতোই ; বরং সেগুলোর চেয়েও কঠিন । আর পাথর গুলোর মধ্যে কিছু এমনও রয়েছে , যেগুলো থেকে নদীসমূহ প্রবাহিত হয় ।

মুফতী সাহেব উপরোল্লিখিত আয়াতের সূফীসুলভ তাফসীরে লিখেছেন , ‘প্রত্যেক হৃদয়ে স্বাভাবিক ভাবে আল্লাহর ভয় ও সৃষ্টির প্রতি স্নেহ মমতার পানি মওজুদ রয়েছে । গুনাহ ও বে-দ্বীনদের সঙ্গ হচ্ছে – ওই মানব হৃদয়কে শুকিয়ে দেয় এমন রোদের মতো । যখন মানুষ পাপকাজে লিপ্ত হয়ে যায় , তখন ধীরে ধীরে এ দু’প্রকার পানি শুকিয়ে যায় , যার ফলে তাঁর হৃদয় শুষ্ক কঙ্কর ও পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায় ।

মুফতী সাহেব বিষয়বস্তুকে সুস্পষ্ট ও সহজভাবে বর্ণনা করার জন্য দৈনন্দিন জীবনের বহু উদাহরণ চয়ন করে নিতেন । তিনি তাঁর লিখনিগুলোতে বিশেষ শ্রেণীর ও সাধারন মানুষের এতই নিকটবর্তী হয়ে যেতেন যে , তাঁর ও পাঠকদের মধ্যখানে কোন অন্তরাল বা দূরত্বই অবশিষ্ট থাকে না । মুফতী সাহেবের জ্যোতির্ময় অন্তর্দৃষ্টি নিজের অনুসৃত আদর্শের বই-পুস্তকের সংখ্যার নগণ্যতাটুকুও দেখে নিয়েছিলো । কারণ , আমাদের আদর্শ- ভিত্তিক তাফসীর ও হাদীসের ব্যাখ্যাবলী খুব কমই লেখা হয়েছে । বিগত অর্ধ শতাব্দী থেকে তাফসীর-ই কোরআন এর পরম্পরায় আ’লা হযরতের তরজমা ও সাদরুল আফাযিল-এর তাফসীরী হাশিয়াগুলো (পার্শ্ব ও পাদটীকারূপী তাফসীর) খাযাইনুল ইরফানকেই যথেষ্ট মনে করা হতো । মুফতী সাহেব প্রায়শঃই বলতেন , আহ আমি যদি আ’লা হযরতের নিকট থাকতে পারতাম তবে তাঁর খিদমতে আরয করতাম , কোরআন-ই হাকীমের তাফসীরও আপনার কলম থেকেই বের হওয়া দরকার ।’ উল্লেখ্য যে , মুফতী সাহেব কিবলাই সাদরুল আফাযিলকে ‘তাফসীর-ই খাযাইনুল ইরফান’ লেখার জন্য বারংবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন । কিন্তু সাদরুল আফাযিল অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে বিস্তারিত তাফসীরের কাজে হাত দিতে পারেন নি । শেষ পর্যন্ত মুফতী সাহেব আল্লাহ্‌ তায়ালার অনুগ্রহ ও বদান্যতা এবং সরকার-ই মাদীনা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা –এর রুহানী ফয়যের বদৌলতে এ মহান কাজ সমাধা করেন । সুতরাং ‘তাফসীর-ই না’ঈমী’ লিখতে আরম্ভ করলেন । প্রথম ১১ পারার উপর উর্দু ভাষায় ১১টি বিরাটাকার খন্ড লিখে ফেললেন । এ ‘তাফসীর-ই না’ঈমী অসাধারণ জনপ্রিয় হলো । সহস্রকোটি মানুষের জন্য কোরআন বুঝার দ্বার খুলে গেলো । এ বিষয়েও (অর্থাৎ কোরআন বুঝা) তিনি একটি কিতাব- ‘ইলমুল কোরআন’ নামে লিখেছেন ।

‘তাফসীর-ই না’ঈমী’ ছাড়াও তিনি তরজমা ‘কানযুল ঈমান’-এর উপর বিস্তারিত হাশীয়া (টীকা তাফসীর) লিখেছেন , যা ‘তাফসীর-ই নুরুল ইরফান’ নামেই আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপিত । এ গ্রন্থটির সারল্য ও সহজবোধ্যতার কারণে গ্রহণযোগ্যতার একেবারে শীর্ষে পৌঁছেছে ।

তিনি সহীহ বোখারী শরীফের ওপরও আরবী হাশীয়া (টীকা) সংযোজন করেছেন , যার নাম ‘ইনশিরাহ-ই বোখারী’ প্রকাশ ‘না’ঈমুল বারী’ । এ কিতাবটিও এখন মুদ্রণের জন্য যন্ত্রস্থ রয়েছে । হাদীস শরীফের প্রসিদ্ধ্য কিতাব ‘মিশকাতুল মাসাবিহ’-র উর্দু অনুবাদ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা , আটখন্ডে সমাপ্ত বিরাটাকার গ্রন্থ ‘মিরআতুল মানাজীহ’ হযরত মুফতী সাহেবেরই আরেকটি চির অম্লান অবদান । তাঁর অন্যান্য লেখনীর মধ্যে

  • ‘ইলমুল মীরাস’
  • ‘জাআল হক’
  • ‘শানে হাবীবুর রহমান’
  • ‘ইসলামী যিন্দেগী’
  • ‘রহমতে খোদা বওসীলা-ই আউলিয়া’
  • ‘মুয়াল্লিম-ই তাকরীর’
  • ‘মাওয়াইয-ই না’ঈমীয়া’
  • ‘সফরনামা-ই হিজায ও কিবলাতাইন’
  • ‘হযরত আমীরে মুয়াবিয়া পর এক নযর’
  • ‘ফাতাওয়া-ই না’ঈমীয়া’
  • ‘রাসাইলে না’ঈমীয়া’ এবং
  • খুৎবাসমূহের সমষ্টি ‘খুৎবা-ই না’ঈমীয়া’ ও বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য ।

বলাবাহুল্য , উপরোক্ত কিতাবগুলো দীনী ইলম ও ধর্মীয় সভা-মজলিসসমূহে অত্যন্ত আগ্রহ , ভালবাসা ও ভক্তি সহকারে পড়া হয় । মুফতী সাহেবের সমস্ত কিতাবের প্রকাশনার মহান কাজটি তাঁর স্নেহের দৌহিত্র সাহেবযাদা ইফতিখার আহমদ খান ও মুফতী ওকী শওক ধারাবাহিক ভাবে অতি পরিশ্রম ও আগ্রহ সহকারে চালিয়ে আসছেন । সর্বদা তাদের ইচ্ছাও এটাই রয়েছে যেন মুফতী সাহেবের এই অতি জনপ্রিয় কিতাবগুলো উন্নত থেকে উন্নততর আঙ্গিকে পাঠক সমাজের নিকট নিয়মিতভাবে পেশ করা হয় । আল্লাহ্‌রই জন্য সকল প্রশংসা , তারা সফলতার সাথে তাদের এ মহান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ।

শিক্ষাদান ও শিক্ষকতাঃ

মুফতী সাহেব বিদ্যার্জন শেষ করা মাত্রই বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাদানের মহান ব্রত পালনে আত্মনিয়োগ করলেন । হযরত সাদরুল আফাযিল ‘জামেয়া না’ঈমীয়া’ মুরাদাবাদ এর শিক্ষাদানের দায়িত্ব অর্পণ করেন । তিনিও নিজেকে একজন উপযুক্ত শিক্ষক হিসেবে প্রমান করে দিলেন । মুরাদাবাদে শিক্ষক থাকাকালে ধূরাজীতে এমন একজন বহুগুণে গুণী ও উঁচুমানের আলিমে দ্বীন পাঠানোর জন্য দরখাস্ত করা হলো , যিনি শিক্ষাদান , ফাতাওয়া ও খুৎবা প্রদানসহ যাবতীয় ধর্মীয় দায়িত্বাবলী সুষ্ঠুভাবে পালনে সক্ষম হন । সাদরুল আফাযিলকে ‘ধূরাজী’ নামক স্থানে চলে যাবার হিদায়ত করলেন । মুফতী সাহেবও তাই করলেন । ‘মাদরাসা-ই মিসকীনিয়া’ ‘ধূরাজী’-তে বায্যিকভাবে দেখতে কম বয়স্ক মুফতী সাহেব মাদরাসার ব্যবস্থাপকদেরকে তাঁর জ্ঞানগত পূর্ণতা ও মহাগুনীসূলভ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একেবারে হতবাক করে দিয়েছিলেন । তখনই তারা বলে উঠলেন , সাদরুল আফাযিল তো আমাদের নিকট বাহরুল উলূম (জ্ঞান–সমুদ্র) পাঠিয়েছেন ।’ কিছুদিন পর শিক্ষাদানের খাতিরেই মুফতী সাহেব পুনরায় ‘জামেয়া না’ঈমীয়া’ মুরাদাবাদে তাশরীফ নিয়ে আসেন । মুরাদাবাদ থেকে তাকে ভক্কি শরীফ , জিলা গুজরাট (পাকিস্তান) এর সায়্যিদ জালাল উদ্দীন শাহ্‌ সাহেবের ‘দারুল উলূম’-এ প্রেরণ করা হলো । এখানে তাঁর মন বসলো না । তাই তিনি তাঁর মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার জন্য লাহোর আসলেন । তখনকার দিনে সাহেবযাদা সায়্যিদ মাহমুদ শাহ্‌ সাহেব (পীর বিলায়ত শাহ্‌ সাহেবের পুত্র ) ‘হিযবুল আহনাফ’ লাহোর শিক্ষার্জন করছিলেন । তিনি সৈয়দ আবুল বারাকাত সাহেবের মাধ্যমে মুফতী সাহেবের খিদমতে দরখাস্ত করলেন যেন তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে না গিয়ে গুজরাটে ‘আঞ্জুমানে খুদ্দামুস সূফিয়্যাহ’-র দারুল উলূম’-এ শিক্ষাদানের মহান দায়িত্বটি গ্রহণ করেন । কারণ , সেখানে একজন দক্ষ আলিমে দ্বীনের প্রয়োজন ছিলো । সুতরাং গুজরাটবাসীদের সৌভাগ্য যে , মুফতী সাহেব তাতে রাজী হয়ে যান । অতঃপর তিনিও গুজরাটের , গুজরাটও তাঁর হয়ে রয়ে গেলো । উপরোল্লেখিত দারুল উলূমে তিনি অন্তত ১২/১৩ বছর যাবত শিক্ষকতা করেন । গুজরাটেই তিনি ‘মসজিদ-ই গাড়সিয়া’ (চক , পাকিস্তান)-এ নিয়মিত ভাবে বছরের পর বছর কোরআন মাজীদের শিক্ষা দিতে থাকেন । দীর্ঘ ১৯/২০ বছরে প্রথমবারের মতো গোটা কোরআন মাজীদের শিক্ষাদান দেয়া হলো । অতঃপর দ্বিতীয় বার আরম্ভ করা হলো । তাঁর প্রতিষ্ঠিত দারুল উলূম ‘গাউসিয়া না’ঈমীয়া’ও দীর্ঘকাল যাবত গুজরাট ইলমে দ্বীনের আলো ছড়াতে থাকে ।

ব্যক্তিত্ব

মুফতী সাহেবের ব্যক্তিত্বের অনন্য দিক এটাই ছিলো যে , তিনি সময়ের প্রতি অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিতেন । আর নিজ কার্যাবলীতে সময়ের প্রতি খুবই যত্নবান ছিলেন । প্রতিটি কাজ খুবই সুন্দরভাবে নিজের নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করে নিতেন । এমনকি , তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক কাজগুলো সম্পন্ন হতে দেখে মানুষ সময় নির্ণয় করেনিতে পারতেন । সব সময় সঠিক সময়ে মসজিদে তাশরীফ নিয়ে যেতেন । বলাবাহুল্য তিনি ওই সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন , শরীয়াত যাদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে । নামায , কোরআন তিলাওয়াত , দুরুদ শরীফ পাঠ এবং হজ্জ ও যিয়ারতের প্রতি তাঁর অসাধারন আগ্রহ ছিলো । তিনি কয়েকবার হজ্জ করেছিলেন এবং যিয়ারতের জন্যও তাশরীফ নিয়ে যান । তিনি সফররত থাকাকালেও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি নিয়মিত ভাবে সম্পন্ন করতেন । মোটকথা তাঁর ব্যক্তিত্বকে পুরোপরিভাবে বর্ণনা করার জন্য এই কয়েকটি পৃষ্ঠা অত নগণ্যই ।

হৃদয়-বিদারক ওফাত

৩ রমযানুল মুবারক , ১৩৯১ হি মুতাবিক ১৪ অক্টোবর , ১৯৭১ ইং মুফতী সাহেব কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর আপন প্রকৃত স্রষ্টার সাথে মিলিত হন । তাঁর ইন্তিকালের কারণে ইসলামী বিশ্ব এক অতি উঁচু মানের দীনী ব্যক্তিত্ব ও গৌরবময় লিখককে হারালো বটে , কিন্তু তাঁর জ্যোতিস্মান প্রদীপ সব সময় আলো বিকিরণ করতে থাকবে । তাঁর ওরস প্রতি বছর ২৪ ও ২৫ শে অক্টোবর তাঁরই মাযার শরীফে , মুফতী আহমদ ইয়ার খান রোড , চক পাকিস্তান , গুজরাট , অতি জাঁকজমক ও পূর্ণ ভক্তি সহকারে শরীয়াতের আলোকে অনুষ্ঠিত হয় ।[1]

তথ্যসূত্র

  1. প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আবদুল অদুদ সাহেবের অনুবাদকৃত ‘আশরাফুত তাফসীর বা তাফসীর না’ঈমী’

বহিসূত্র