মুহাম্মাদ (সঃ) এর এলমে গায়েবঃ আপত্তি ও জবাব 1

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

বিরুদ্ধবাদীগণ মুহাম্মাদ (সঃ) এর এলমে গায়েব সমর্থনে দলীল প্রমাণাদির কোন উত্তর দিতে পারেন না। তারা কেবল প্রত্যুত্তরে এর কথাই বলেন যে যেই সব আয়াতে كُلُّ شَيْئٍ উল্লেখিত আছে বা مَالَمْ تكن تَعْلَمْ বলা হয়েছে, সে সকল ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধি বিধানের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে, অন্য কোন কিছুর জ্ঞান বোঝানো হয়নি। এর সমর্থনে তারা নিম্নলিখিত দলীলাদি উপস্থাপন করেন-

১) كُلُّ شَىْئٍ বলতে সীমাহীনতা বোঝায় এবং সীমাহীন বিষয়ের জ্ঞান খোদা ছাড়া অন্য কারো আয়ত্ত্বে থাকা তর্কশাস্ত্রের শৃংখল পরস্পরের অসীমতা অনুসারে সম্পূর্ণরূপে বাতিল বলে গণ্য । (যুক্তিশাস্ত্রের ‘তাসালসুল’ নামক দলীল দ্রষ্টব্য।)
২) অনেক তাফসীরকারকগণ كُلُّ شَيْئٍ এর ব্যাখ্যা করেছেনঃ আরবী (অর্থৎ ধর্মীয় বিষয়াদ) যেমন তাফসীরে জালালাইনে ও অন্যান্য তাফসীর গ্রন্থে এরূপ ব্যাখ্যাই প্রদান করা হয়েছে।
৩) কুরআন শরীফের অনেক জায়গায় كُلُّ شَيْئٍ বলা হয়েছে । কিন্তু উহার দ্বারা কিয়দাংশ বা কিয়ৎ পরিমাণ ই বোঝানো হয়েছে। যেমন রাণী বিলকিস সম্পর্কে وَاُوْتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْئٍ (অর্থাৎ বিলকিসকে সব কিছুই দেয়া হয়েছে) বলা হয়েছে অথচ বিলকিসকে প্রদত্ত বস্তু বা বিষয়ের কিছু বা কিঞ্চত পরিমাণই দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু এগুলো কোন দলীলই নয়। নিছক ভুল ধারণা ও ধোকা মাত্র । এগুলোর উত্তর নিম্নে দেয়া গেল ।

আরবী ভাষায় كُلّও مَا শব্দদ্বয় ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। কুরআন শরীফের প্রত্যেকটি শব্দ অকাট্য। এতে মনগড়া কোন শর্ত জুড়ে দিয়ে শব্দকে সীমিত অর্থে প্রয়োগ করা জায়েয নয়। কুরআন শরফের ব্যাপকতা নির্দেশক শব্দগুলোকে হাদীছে আহাদ দ্বারা ও সীমিত অর্থে গ্রহণ করা যায় না । এমতাবস্থায় নিজস্ব কোন যুক্তি বা রায়ের ভিত্তিতে সীমিত অর্থে প্রয়োগের প্রশ্নই উঠে না।

১) كُلُّ شَيْئٍ বলতে সীমাহীনতা বোঝা যায় না বরং এ দ্বারা সীমাবদ্ধতাই বোঝা যায় । তাফসীরে কবীরে এর ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছে- অর্থাৎ এতে কোন সন্দেহ নেই যে সংখ্যা দ্বারা ণনার বিষয়াটি সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রেই সম্ভবপর । কিন্তু كُلُّ شَيْئٍ (প্রত্যেক জিনিস) শব্দ দ্বারা ঐ বস্তুর সীমাহীনতার অর্থ প্রকাশ পায় না। কেননা আমাদের মতে شَيْئ (জিনিস) বলতে যা কিছুর অস্তিত্ব আছে, শুধু তাই বোঝায় এবং যাবতীয় অস্তিত্ববান বস্তু সীমাবদ্ধতার গন্ডীতে আবদ্ধ।

তাফসীরে রূহুল বয়ানে একই আয়াতে ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিপিবদ্ধ আছে

এ আয়াত দ্বারা এ কথাটির বড় প্রমাণ মিলে যে যা কিছু অস্তিত্বহীন উহা شَيْئ বস্তু বলে গণ্য নয়। কেননা যদি এটা বস্তু (অস্তিত্ববান) বলে গণ্য হয়, তাহলে অস্তিত্ববান সবকিছুই সীমাহীন হয়ে যায়। অথচ বস্তুসমূহ গণনা বা শুমারীর আওতাভুক্ত এবং যা কিছু গণনার আওতায় আসে, উহা কেবল সীমাবদ্ধতার পর্যায়ভুক্ত হতে পারে।

২) তাফসীরকারকদের মধ্যে অনেকেই كُلُّ شَىْئٍ বলতে কেবল শরীয়তের আহাকামকে ধরে নিয়ছেন বটে, কিন্তু আবার অনেকেই সম্পুরণীয় বা সামগ্রীক ইলমে গায়েবের প্রতি নির্দেশ করেছেন। চিরাচরিত নিয়ামানুযায়ী যখন কিছু প্রমাণ ইতবাচক ও আর কিছু নেতিবাচক হয়, তখন ইতবাচক প্রমাণগুলিই গৃহীত হয়।
সুবিখ্যাত ‘নুরুল আনোয়ার’ গ্রন্থে تَعَارُضْ (অসঙ্গতি বা বিরোধ) শীর্ষ আলোচনায় উল্লেখিত আছে وَالْمُثْبِتُ اَوْلى مِنَ النَّافِىْ অর্থাৎ স্বীকৃতি জ্ঞাপক প্রমাণ অস্বীকৃতি নির্দেশক প্রমাণ হতে অপেক্ষকৃত উত্তম। যে সমস্ত তাফসীরের উদ্ধৃতি আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি, সে গুলোতে যেহেতু বেশীরভাগ প্রমাণই স্বীকৃতি সূচক, কাজেই উহাই গ্রহণযোগ্য। অধিকন্তু স্বয়ং হাদীছ ও সু্প্রসিদ্ধ উলামায়ে উম্মতের উক্তিসমূহ দ্বারা এর তাফসীর করে আমি দেখাবো যে এমন কোন অনুপরমাণূ নেই, যা হুযুর পুর নুর (সাল্লাল্লাহু অলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর জ্ঞানানুভুতিতে আসেনি, এবং আমি এ গ্রন্থেরই পেশ কালাম শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি যে, কুরআনের হাদীছ ভিত্তিক তাফসীর অন্যান্য তাফসীর সমূহ থেকে উন্নত। ‍সুতরাং, হাদীছের সমর্থনপুষ্ট তাফসীরেই অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে। এও উল্লখ্যে যে, যে সকল তাফসীরকারকكُلُّ شَيْئٍ এর তাফসীরে আহকামে দ্বীনকে বোঝাতে চেয়েছেন, তারাওতো অন্যান্য বিষয় বা বস্তুর সম্পর্কীয় জ্ঞানের অস্বীকৃতির কথা বলেননি। সুতরাং, আপনারা অস্বীকৃতির কথা কোথা থেকে আবিষ্কার করলেন? কোন বিষয়ের উল্লেখ না করলে যে সে বিষয়ের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়, এ কথা বলেন কিভাবে? কুরআন শরীফে আছ- تَقِيْكُمَ الْحَرَّ তোমাদের কাপড় তোমাদেরকে উত্তাপ থেকে রক্ষা করে। এরূপ উক্তি থেকে কি একথা বোঝা যাবে যে, কাপড় আমাদেরকে শীত থেকে রক্ষা করে না? এ কথাতো কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। অধিকন্তু, দ্বীন বললেও সবকিছুকে বোঝায়। জগতে এমন কি বিষয় আছে, যার উপর দ্বীনের আহকাম হালাল-হারাম ইত্যাদি প্রযোজ্য হয় না? ঐ সকল মুফাসসিরতো এ অভিমতই ব্যক্ত করেছেন যে দ্বীনি ইলম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে একথা বললে সব কিছুর জ্ঞানকে বোঝানো হয়।
৩) বিলকীস ও অন্যান্যদের কাহিনীতে যে كُلُّ شَيْئٍ বলা হয়েছে, সেখানে এমন আলামত বা লক্ষণ মওজুত আছে, যার ফলে একথা পরিষ্কাররূপে প্রতীয়মান হয় যে, كُلُّ شَيْئٍ দ্বারা রাজত্বের কাজ কারবার সম্পর্কীয় প্রত্যেক কিছুই বোঝানো হয়েছে। সেখানে উক্ত শব্দ দ্বারা এ ব্যবহারিক অর্থের দিকে নির্দেশ করা হয়েছে। কিন্তু এখানে এমন কি লক্ষণ আছে, যে কারণে শব্দের আসল অর্থ বাদ দিয়ে তার ব্যবহারিক অর্থই করা যাবে?
আরও লক্ষ্যণীয় যে, কুরআন করীম সেখানে হুদহুদ পাখীর উক্তিকে নকল করেছে মাত্র । হুদহুদ বলেছিল وَاُوْتِيْتْ مِنْ كُلِّ شَيْئٍ অর্থাৎ বিলকিসকে প্রত্যেক কিছুই দেয়া হয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এ খবর দেননি । হুদহুদের ধারণা ছিল যে বিলকিস সারা দুনিয়ার সবকিছুই পেয়ে গেছেন। কিন্তু এখানে মুস্তফা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছে- تِبْيَا نً لِكُلِّ شَيْئٍ (প্রত্যেক কিছুর সুস্পষ্ট বিবরণ সম্বলিত)। হুদহুদ ভুল বলতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কালামতো ভুল হতে পারে না। হুদহুদতো আরও বলেছিল وَلَهَا عَرْشٌ عَظِيْمٌ (তাঁর এক বিরাট আরশ আছে) তাহলে বিলকিসের সিংহাসন কি আরশ আযীমই ছিল? বস্তুতঃ ‍কুরআনের অন্যান্য আয়াত থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, كُلُّ شَيْئٍ দ্বারা এখানে জগতের সবকিছুকেই বোঝানো হয়েছে, কুরআনেই ইরশাদ হয়েছেঃ

وَلَا رَطْبٍ وَّلَا يَابِسٍ اِلَّفِىْ كِتَابٍ مُّبِيْنٍ

অর্থাৎ আর্দ্র শুষ্ক এমন কোন জিনিস নেই, যা লওহে মাহফুজে বা কুরআনে করীমে নেই।

এ ছাড়া সামনে উল্লেখিত বিভিন্ন হাদীছ, উলামা ও মুহাদ্দীনের উক্তি থেকেও এ কথার জোরালো সমর্থন পাওয়া যাবে যে জগতের প্রত্যেক কিছুর জ্ঞান হুযুর পুরনুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে দান করা হয়েছিল।

এ কথা দেওবন্দীগণ স্বীকার করেন যে আমাদের নবী আলাইহিস সালামের জ্ঞান সৃষ্টিকুলের সামগ্রিক জ্ঞান থেকে বেশী। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হুযুর আলাইহিস সালামের সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান রয়েছে। আমি পঞ্চ বিষয়ের জ্ঞান علوم خمسه শীর্ষ আলোচনায় হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) ও তাকদীর লিখায় নিয়োজিত ফিরিশতা জ্ঞান সম্পর্কে আলোকপাত করবো, যা দ্বারা বোঝা যাবে যে গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চ ভিষয়ের জ্ঞান তাদেরও রয়েছে। যেহেতু হুযুর আলাইহিস সালাম সমস্ত সৃষ্টিকূল থেকে বেশী জ্ঞানী, কাজেই হুযুর আলাইহিস সালাম যে এসব বিষয়ের জ্ঞান বরং তার চেয়ে অধিক জ্ঞানের অধিকারী একথা মেনে নিতে হবে বৈ কি। আমাদের দাবী সর্বাবস্থায় প্রতিষ্ঠিত।

তথ্যসূত্র