মুহাম্মাদ (সঃ) নূর সমর্থনে দলিল সমূহ 2

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

কুরআন মজীদের ৩টি স্থানে মহানবী (দ:)-কে ’নূর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:


কাদ জায়াকুম মিনাল্লাহে নূরুন ওয়া কিতাবুম্ মুবীন (৫:১৫)

অর্থ: নিশ্চয় তোমাদের কাছে এসেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নূর (আলো, জ্যোতি) এবং স্পষ্ট কেতাব (আল্ কুরআন)

ইমাম কাজী আয়ায (রহ:) বলেন,

মহানবী (দ:)-কে ‘নূর’ বলা হয়েছে তাঁর (নবুয়্যতের) স্বচ্ছতার কারণে এবং এই বাস্তবতার আলোকে যে তাঁর নবুয়্যতকে প্রকাশ্য করা হয়েছে; আর এই কারণেও যে তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা দ্বারা ঈমানদার (বিশ্বাসী) ও আল্লাহর আরেফ (খোদা সম্পর্কে জ্ঞানী)-দের অন্তরগুলো আলোকিত হয়েছে।

  • ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (রহ:) তাঁর ’তাফসীরে জালালাইন’ গ্রন্থে,
  • ফায়রুযাবাদী ‘তাফসীরে ইবনে আব্বাস’ অবলম্বনে নিজ ‘তানউইরুল মেকবাস’ পুস্তকে (পৃষ্ঠা ৭২),
  • শায়খুল ইসলাম ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী, যিনি ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মোজাদ্দেদ, তিনি তাঁর ’তাফসীরে কবীর’ কেতাবে (১১:১৮৯),
  • ইমাম কাজী বায়দাবী (রহ:) নিজ ’আনওয়ারুত্ তানযিল’ শীর্ষক বইয়ে,
  • আল বাগাভী তাঁর ‘মা’আলিমুত্ তানযিল’ নামের তাফসীর কেতাবে (২:২৩),
  • ইমাম শিরবিনী নিজ ‘সিরাজুম মুনীর’ শীর্ষক তাফসীর গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৩৬০),
  • ‘তাফসীরে আবি সা’উদ’ (৪:৩৬) প্রণেতা এবং
  • সানাউল্লাহ পানিপথী তাঁর ’তাফসীরে মাযহারী’ (৩:৬৭) কেতাবে বলেন,

(আয়াতোক্ত) ’নূর’ বলতে মহানবী (দ:)-কে বোঝানো হয়েছে।

ইবনে জারির তাবারী তাঁর ‘তাফসীরে জামেউল বয়ান’ (৬:৯২) পুস্তকে বলেন,

তোমাদের কাছে এসেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর (আলো) - এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ বোঝাচ্ছেন বিশ্বনবী (দ:)-কে, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ সত্য উদ্ভাসিত করেছেন, দ্বীন ইসলামকে প্রকাশ করেছেন, এবং মূর্তি পূজা নিশ্চিহ্ন করেছেন। অতএব, তিনি ‘নূর’, তাঁর দ্বারা যারা আলোকিত হয়েছেন তাদের জন্যে এবং সত্য প্রকাশিত হওয়ার জন্যে।

আল খাযিন নিজ তাফসীর কেতাবে একইভাবে বলেন,

(আয়াতে) ’নূর’ বলতে রাসূলে পাক (দ:)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে আর অন্য কোনো কারণে নয়, শুধু (এ কারণে যে) মানুষেরা তাঁর দ্বারা পথপ্রদর্শিত হন, যেমনিভাবে কেউ আলো দ্বারা অন্ধকারে পথের দিশা পান।

ইমাম নাসাফী তাঁর ‘তাফসীরে মাদারেক’ (১:২৭৬) গ্রন্থে এবং আল কাসেমী নিজ ‘মাহাসিন আল্ তা’বিল’ (৬:১৯২১) পুস্তকে অনুরূপভাবে বলেন,

আয়াতে উল্লেখিত ‘নূর’ (জ্যোতি) হুযূর পূর নূর (দ:)-এর; কেননা, তাঁর দ্বারা-ই মানুষেরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হন। একইভাবে, তাঁকে ’সিরাজ’ (প্রদীপ)-ও বলা হয়েছে (আয়াতে)।

ইমাম আহমদ সাবী (রহ:) ‘তাফসীরে জালালাইন’ (১:২৫৮)-এর ওপর তাঁর কৃত চমৎকার ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থে অনুরূপভাবে বলেন,

আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছেন এক নূর (আলো); ওই নূর হলেন মহানবী (দ:)। তাঁকে ‘নূর’ বলা হয়েছে, কারণ তিনি দৃষ্টিশক্তিকে আলোকিত করেন এবং সেটিকে সঠিক পথপ্রদর্শন করেন; আর এ কারণেও তা বলা হয়েছে, কেননা বস্তুগত বা আধ্যাত্মিক সকল আলো/জ্যোতির মূল হলেন তিনি।

আমরা শেষ বাক্যটি সম্পর্কে পরে আবার আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।

সৈয়দ মাহমুদ আলুসী নিজ “তাফসীরে রুহুল মা’আনী’ শীর্ষক কেতাবে (৬:৯৭) একইভাবে বলেন,

আয়াতোক্ত ’নূর’ বলতে মহৌজ্জ্বল আলো বুঝিয়েছে, যা সকল আলোর আলো এবং সকল আম্বিয়া (আ:)-এর মাঝে সেরা নবী (দ:)।

ইসমাঈল হাক্কী (রহ:) আলুসীর তাফসীরের ব্যাখ্যামূলক কেতাব ‘তাফসীরে রূহুল বয়ান’ (২:৩৭০)-এ অনুরূপভাবে বলেন,

নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছেন এক নূর এবং সুস্পষ্ট একখানা কেতাব; এ কথা বলা হয় যে ’নূর’ বলতে মহানবী (দ:)-কে বোঝানো হয়েছে, আর ‘কেতাব’ বলতে আল্ কুরআনকে.....মহানবী (দ:)-কে ’নূর’ (আলো) বলা হয়েছে, কারণ বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে আল্লাহ পাক তাঁর ঐশী ক্ষমতার আলো দ্বারা প্রথম যা সৃ্ষ্টি করেন, তা হলো হুযূর পূর নূর (দ:)-এর নূর (জ্যোতি), যেমনিভাবে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: ‘আল্লাহতা’লা সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেন’।

এই বর্ণনা নিচে দেয়া আছে।
বিশেষ জ্ঞাতব্য

মু’তাযেলা সম্প্রদায়-ই (সর্বপ্রথম) দাবি করেছিল যে আলোচ্য আয়াতের (৫:১৫) মধ্যে ‘নূর’ শব্দটি কেবল কুরআনকেই বুঝিয়েছে এবং তা মহানবী (দ:)-কে উদ্দেশ্য করে নি। আলুসী ওপরে উদ্ধৃত তাঁর বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় আরও বলেন,

আবু আলী জুব্বায়ী বলেছিল যে ‘নূর’ বলতে কুরআনকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, কেননা আল্ কুরআন হেদায়াতের ও নিশ্চয়তার পথের দিশা দিয়েছে।

যামাখশারী নিজ ‘তাফসীরে কাশশাফ’ (১:৬০১) পুস্তকে এই ব্যাখ্যার সাথে একমত হয়েছেন। এ দুটো উৎস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে আবদুল আযীয মুলতানীর ’আল নাবরাস’ কেতাবে (পৃষ্ঠা ২৮-২৯), যা’তে তিনি লিখেন:

তাফসীরে কাশশাফ নিজেকে মু’তাযেলা সম্প্রদায়ের বাবা হিসেবে ঘোষণা করে......বসরা (ইরাক)-এর মু’তাযেলা সম্প্রদায়ের মুহাম্মদ ইবনে আবদিল ওয়াহহাব হলো আবু আলী জুব্বায়ী।

মু’তাযেলা এবং বর্তমানকালের ওহাবী ও ’সালাফী’-দের মধ্যকার সাযুজ্য তুলে ধরা হয়েছে ইমাম কাওসারীর ‘মাকালাত’ পুস্তকের বিভিন্ন স্থানে, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে মু’তাযেলীদের মতোই ওহাবীদের দ্বারা আউলিয়াবৃন্দ (রহ:)-এর (অনিন্দ্য) বৈশিষ্ট্যগুলোর অস্বীকারের অন্তরালে আম্বিয়া (আ:)-এর (নিখুঁত) বৈশিষ্ট্যগুলোর অস্বীকার লুক্কায়িত আছে।

আহলে সুন্নাহ (সুন্নী মুসলিম)-এর মাঝে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যা আছে যা মহানবী (দ:)-কে আয়াতোক্ত ’নূর’ এবং ‘কেতাব’ উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত করে। মাহমুদ আলুসী নিজ ‘রূহুল মাআনী’ তাফসীর কেতাবে (৬:৯৭) বলেন, “আমি এটাকে সীমা অতিক্রম বলে মনে করি না যে ‘নূর’ (আলো) এবং ‘কেতাবুম্ মুবীন’ (প্রকাশ্য ঐশীগ্রন্থ) বলতে মহানবী (দ:)-কেই বোঝানো হয়েছে, সংযোজক অব্যয় পদ (ওয়া/এবং)-টি আল জুব্বায়ী যেভাবে ব্যবহার করেছে ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করে এটা করা যায় (অর্থাৎ, নূর এবং কেতাব বলতে সে যেভাবে বুঝে নিয়েছিল কুরআনকে)। এটা নিঃসন্দেহ যে মহানবী (দ:)-কে উদ্দেশ্য করেই সব বলা হয়েছে। হয়তো আপনারা ‘এবারা’ (অভিব্যক্তি)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হতে পারেন; তাহলে ’ইশারা’ (সূক্ষ্ম ইঙ্গিত)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে তা গৃহীত হোক।”

আল কারী নিজ ’শরহে শিফা’ (১:৫০৫, মক্কা সংস্করণ) গ্রন্থে বলেন,

এ কথাও বলা হয়েছে যে (আয়াতোক্ত) ‘নূর’ এবং ‘কেতাবুম মুবীন’ উভয়ই মহানবী (দ:)-এর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে; কেননা, তিনি যেমন মহৌজ্জ্বল জ্যোতি এবং সকল আলোর উৎসমূল, তেমনি তিনি হলেন মহান কেতাব যা সকল গোপন (রহস্য) জড়ো করে প্রকাশ করে থাকে।

গ্রন্থকার আরও বলেন (১:১১৪, মদীনা সংস্করণ):

দুটো বিশেষ্যকেই মহানবী (দ:)-এর বলে দৃঢ়োক্তি করার প্রতি কী আপত্তি থাকতে পারে, যেহেতু বাস্তবিকই তিনি হলেন সকল আলোর মাঝে তাঁর উৎকৃষ্ট উপস্থিতির কারণে মহৌজ্জ্বল আলো; আর প্রকাশ্য কেতাব তিনি-ই, যেহেতু তিনি সমস্ত ভেদের রহস্য একত্রিত করে সকল (ঐশী) আইন-কানুন, পরিস্থিতি ও বিকল্প (ব্যবস্থা) স্পষ্ট করেছেন।

তথ্যসূত্র