মেরাজ রাতে মহানবী (দঃ) আল্লাহকে দেখেছিলেন

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মিরাজ-অন্যান্য


  • মেরাজ ও আল্লাহ্‌ দর্শন

আল-কুরআনের আলোকে

আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান:

আর তিনি উচ্চাকাশের সর্বোচ্চ দিগন্তে ছিলেন। অতঃপর ওই জ্যোতি নিকটবর্তী হলো। অার খুব নেমে এলো। অতঃপর ওই জ্যোতি ও এ মাহবুব (দ:)-এর মধ্যে দু’হাতের ব্যবধান রইলো; বরং তার চেয়েও কম। তখন (আল্লাহ) ওহী করলেন আপন বান্দার প্রতি যা ওহী করার ছিল। (মহানবীর) অন্তর মিথ্যা বলেনি যা ‍তিনি দেখেছেন। তবে কি তোমরা তাঁর সাথে তিনি যা দেখেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করছো?

— সূরা নজম, ৭-১২ নং আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেবের ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’

ওপরোক্ত সূরার ১২ নং আয়াতে আমাদের প্রভু খোদাতা’লা সারা বিশ্বকে চ্যালেন্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে ‘তবে কি তোমরা তাঁর সাথে তিনি যা দেখেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করছো’; এ যদি হতো শুধু হযরত জিবরীল আমীন (আ:), তাহলে এটি তেমন বড় কোনো চ্যালেন্জ হতো না। কেননা, পূর্ববর্তী আম্বিয়া (আ:)-ও বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ খোদায়ী অনুগ্রহ ও সুবিধা পেয়েছিলেন। যেমন হযরত মূসা (আ:) আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেছিলেন; আর হযরত ইবরাহীম (আ:)-কে বেহেশত-রাজ্য দেখানো হয়েছিল, যা জিবরীল (আ:)-কে দেখার চেয়েও উচ্চ মর্যাদার বিষয় বলে বিবেচিত। অতএব, কুরআনী ‘নস’ তথা দলিল থেকেে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় যে আল্লাহকে দেখার সৌভাগ্য একমাত্র মহানবী (দ:)-এর জন্যেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছিল, যেমনটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও অন্যান্যদের বর্ণিত আহাদীস থেকেও প্রমাণিত হয়।

এক্ষণে আমরা ইমাম ইবনুল জাওযীর কৃত ওপরোক্ত আয়াতগুলোর তাফসীর দেখবো। তিনি ৮ম ও ৯ম আয়াতগুলোকে সহীহ আহাদীস ও আকওয়ালের আলোকে ব্যাখ্যা করেন যে, ‘তিনি নেমে এলেন এবং নিকটবর্তী হলেন’, আল্লাহতা’লার এ কালাম (বাণী) সম্পর্কে তিনটি প্রসিদ্ধ ভাষ্য আছে:

প্রথম

(তিনি) স্বয়ং আল্লাহ পাক, যা বোখারী ও মুসলিম সহিহাইন গ্রন্থগুলোতে হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) হতে শারিক বিন আবি নুমাইরের বর্ণিত একখানা রেওয়ায়াতে জ্ঞাত হয়। হযরত আনাস (রা:) বলেন,

অপ্রতিরোধ্য, সর্বোচ্চ সম্মান ও মহাপরাক্রমশালী প্রভু খোদাতা’লা নেমে আসেন এবং (মাহবুব সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) সন্নিকটবর্তী হন; এতো কাছে আসেন যে ধনুকের দুই বাহু পরিমাণ দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে, বা তারও কম।

— সহীহ আল-বোখারী # ৭৫১৮; মুসলিম # ১৬২

অধিকন্তু, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে আবূ সালামা বর্ণিত রেওয়ায়াতে ‘তিনি নেমে আসেন’ বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘আল্লাহ কাছে আসেন’; এই ভাষ্য মাকাতিল (রা:)-ও গ্রহণ করেছেন, যিনি বলেন: এসরা তথা মে’রাজ রাতে আল্লাহ পাক তাঁর রাসূল মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সন্নিকটবর্তী হন, এতো কাছে যে ধনুকের দুই বাহুর দূরত্ব অবশিষ্ট ছিল, বা তারও কম। তবে ‘আল-মুগনী’ পুস্তকে লেখা আছে, এই কাছে আসা শারীরিক বা দূরত্বের অর্থে নয় যেমনটি হয়ে থাকে সৃষ্টিকুলের ক্ষেত্রে; কেননা মহান আল্লাহর প্রতি আরোপিত এ ধরনের সীমাবদ্ধতা হতে তিনি বহু উর্ধ্বে।

দ্বিতীয়

মহানবী (দ:) স্বয়ং আল্লাহর কাছে যান; এ ভাষ্য হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও কুরযী (রহ:)-এর।

তৃতীয়

এটি জিবরীল (আ) ছিলেন এবং এই কওল বা ভাষ্যে কালাম তথা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিদ্যমান... [এরপর ইমাম ইবনে জাওযী সাইয়্যেদাহ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা‘র মতো সাহাবা-এ-কেরামের মতামত পেশ করেন, যাঁরা বলেন যে মহানবী (দ:) আল্লাহকে দেখেননি। কেন তিনি এই রকম বিশ্বাস করতেন এবং অন্যান্য সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) তাঁর সাথে কীভাবে ভিন্নমত পোষণ করতেন, সে সম্পর্কে পরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হবে, ইনশা’আল্লাহ]। [1]

অতএব, আল-কুরআন ও বোখারী-মুসলিম হাদীসের গ্রন্থগুলো হতে প্রাপ্ত উক্ত সূরা নজমের ৮ম ও ৯ম আয়াতের সর্বোত্তম ব্যাখ্যা দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে মহানবী (দ:) আল্লাহকে দেখেছেন। [হযরত আনাস বিন মালেক (রা:), যাঁর সম্পর্কে দাবি করা হয় যে তিনি আল্লাহকে দেখার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তিনি নিজেই এসব আহাদীসে প্রমাণ করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) অবশ্যঅবশ্য আল্লাহকে দেখেছিলেন। হাদীসের উসূল বা মৌলনীতি হলো, যদি সাহাবা (রা:)-বৃ্ন্দ দুটো পরস্পরবিরোধী কথা বলেন, তাহলে ‘মাসবাত’ (প্রমাণ) প্রাধান্য পাবে ‘নফী’ (না-সূচক বর্জন)-এর ওপর। তাই এই উসূল অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় যে রাসূলুল্লাহ (দ:) অবশ্যই আল্লাহকে দেখেছিলেন, আর এই বিষয়ে নফী তথা না-সূচক বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করতে হবে।]

কুরআন মজীদের অন্যত্র এরশাদ হয়েছে:

এবং যখন মূসা (আ:) আমার ওয়াদার ওপর হাজির হলেন এবং তাঁর সাথে তাঁর রব্ব কথা বল্লেন, (তখন তিনি) আরয করলেন, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে আপন দর্শন দিন! আমি আপনাকে দেখবো।’ (তিনি) বল্লেন, ‘তুমি আমাকে কখনো দেখতে পারবে না [কুরআনের এখানে ‘লান তারানী’ বলা হয়েছে, ‘লান উরা’ বলা হয়নি]; বরং এ পাহাড়ের দিকে তাকাও। এটি যদি স্বস্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে (অবিলম্বে) দেখবে।’ অতঃপর যখন তাঁর রব্ব পাহাড়ের ওপর আপন নূর বিচ্ছুরণ করলেন, তখন তা সেটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলো, আর মূসা (আ:) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো, (তখন) তিনি বল্লেন, পবিত্রতা আপনারই; আমি আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম এবং আমি সবার মধ্যে প্রথম মুসলমান।

— [সূরা আল-আ’রাফ, ১৪৩ নং আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেব রচিত ‘নূরুল এরফান’।

বিশ্বখ্যাত ‘তাফসীরে জালালাইন’ (সর্ব-ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী ও আল-মুহাল্লী রচিত) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে

(তুমি আমাকে কখনো দেখতে পারবে না) আয়াতটির অর্থ হচ্ছে ‘আমাকে দেখার সামর্থ্য তোমার নেই।’ ‘লান উরা’ (আমাকে কখনো দেখা যাবে না বা দেখা সম্ভব নয়) বাক্যটির পরিবর্তে ‘লান তারানী’ বাক্যের ব্যবহারে বোঝা যায় যে আল্লাহকে দেখা সম্ভব। “বরং এ পাহাড়ের দিকে তাকাও। এটি যদি স্বস্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে (অবিলম্বে) দেখবে; নতুবা আমাকে দেখার সামর্থ্য তোমার হবে না। [‘অতঃপর যখন তাঁর রব্ব পাহাড়ের ওপর আপন নূর বিচ্ছুরণ করলেন, তখন তা সেটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলো, আর মূসা (আ:) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন।’ হাকীম বর্ণিত সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই নূর ছিল পরিমাণে হাতের ছোট আঙ্গুলের নখের অর্ধেক মাত্র।

— তাফসীরে জালালাইন শরীফ, ১৬৭ পৃষ্ঠা, দারু ইবনে কাসীর, দামেশক (সিরিয়া) হতে প্রকাশিত।

আয়াতে করীমার শেষাংশে মূসা (আ:) বলেন:

আর মূসা (আ:) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো, (তখন) তিনি বল্লেন, পবিত্রতা আপনারই; আমি আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম এবং আমি সবার মধ্যে প্রথম মুসলমান।

— ৭:১৪৩

তাফসীর আল-কুরতুবী

ইমাম কুরতুবী (রহ:) একে এভাবে ব্যাখ্যা করেন,

ইমামবৃন্দ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে মূসা (আ:)-এর তওবা করা কোনো পাপের কারণে নয়; কেননা, আম্বিয়া (আ:) সবাই মাসূম তথা নিষ্পাপ। অধিকন্তু, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহর দর্শন লাভ সম্ভব।

— তাফসীরুল কুরতুবী, ৭:১৪৩

অতএব, স্বয়ং কুরআন মজীদ থেকে এ কথা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে আম্বিয়া (আ:) অসম্ভব কোনো কিছু কখনো (আল্লাহর দরবারে) প্রার্থনা করেন না। আল্লাহকে দেখা যদি অসম্ভব হতো, তাহলে হযরত মূসা (আ:) তা চাইতেন না; আর আল্লাহতা’লা-ও তাঁর দর্শনের বিষয়টিকে পাহাড়ের স্থির থাকার শর্তের সাথে বেঁধে দিতেন না। তাই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে তাঁর দর্শন একমাত্র মহানবী (দ:)-এর জন্যেই সংরক্ষিত ছিল, মূসা (আ:)-এর জন্যে ছিল না।

হাদীস শরীফের আলোকে

আমাদের হাতে মওজুদ আছে উম্মুল মো’মেনীন (বিশ্বাসীদের মা) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) কওল তথা ভাষ্য এবং তাঁর সাথে এতদসংক্রান্ত বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারী সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মধ্যে তাফসীর-শাস্ত্র বিশারদ ও নেতৃস্থানীয় হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর সিদ্ধান্ত (রায়)। এই মতপার্থক্যকে ‘সালাফী’ গোষ্ঠী ভুল বুঝেছে। অথচ হযরত আয়েশা (রা:)-এর ওই না-সূচক মত বা প্রত্যাখ্যান হচ্ছে ‘এদরাক’ (আল্লাহ-সম্পর্কিত পূর্ণ জ্ঞান)-বিষয়ক। এটি আমরা তথা আহলুস সুন্নাহ-ও নাকচ করে দেই। কিন্তু ‘এদরাক’-এর নাকচ হওয়া মানে এই নয় যে রাসূলুল্লাহ (দ:) আল্লাহকে একেবারেই দেখেননি।

[অনুবাদকের জরুরি নোট: সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মধ্যেও হাকীকত উপলব্ধি নিয়ে তারতম্য ছিল। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর একটি হাদীস এখানে প্রণিধানযোগ্য; তিনি বলেন: ‘যে ব্যক্তি যতোটুকু উপলব্ধি করতে সক্ষম, তাকে ততোটুকু জানাও।’ অতএব, তাসাউফপন্থী আলেমদের উপলব্ধি আর সাধারণ আলেমদের উপলব্ধি এক হবার নয়।]

দ্বিতীয়তঃ ‘এসরা’ বা মে’রাজ যখন সংঘটিত হয়, তখন হযরত আয়েশা (রা:) ছিলেন শিশু। মনে রাখবেন, এটি ঘটেছিল হুযূর পূর নূর (দ:)-এর মক্কী জীবনে, অার হযরত আয়েশা (রা:)-এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল মদীনায় হিজরতের ১ বছরের মাথায়। তাই মে’রাজ সম্পর্কে সিনিয়র বা জ্যেষ্ঠ সাহাবী (রা:)-বৃন্দের মতামত-ই অগ্রগণ্য হবে; কেননা তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অধিক অবহিত ও সমঝদার ছিলেন। আমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট বলতে চাই যে বৈধ ভিন্নমতকে আমরা গ্রহণ বা স্বীকার করি, কিন্তু ওহাবীদের ‘এস্তেদলাল’ এক্ষেত্রে অন্তঃসারশূন্য। কেননা, তারা হলো ‘হাওয়া’ (নফসানী খায়েশ)-বিশিষ্ট লোক এবং তারা কোনো মযহাবের ফেকাহ মানে না; আর তারা আহলুস্ সুন্নাহ’র আকীদা-বিশ্বাসগত আশআরী/মাতুরিদী পথ ও মতকেও গ্রহণ করে না। তাই তারা যদি কোনো সঠিক সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়, তথাপিও আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর দৃষ্টিতে তা নিশ্চিতভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে।

হযরত আয়েশা (রা:)-এর বর্ণিত হাদীসের শরাহ (ব্যাখ্যা) করেছেন মহান ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:), যাঁকে তথাকথিত ‘সালাফী মোকাল্লিদ’-বর্গ অনুসরণ করার দাবি করে থাকে। হযরত ইমামের এই বাণী উদ্ধৃত করেছেন বোখারী শরীফের ভাষ্যকার ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) নিজ ‘ফাতহুল বারী শরহে সহীহ আল-বোখারী’ গ্রন্থে:

মারুযী (রহ:) ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:)-কে জিজ্ঞেস করেন, মানুষেরা বলাবলি করতো যে হযরত আয়েশা (রা:) বলেছিলেন, যে ব্যক্তি এই মত ব্যক্ত করে মহানবী (দ:) আল্লাহকে দেখেছিলেন, সে আল্লাহর প্রতি মিথ্যে আরোপ করে। এই ব্যাপারে জবাব কী হবে? হযরত ইমাম (রহ:) উত্তর দেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) যেখানে হাদীসে এরশাদ ফরমান, ’রায়াইতু রাব্বী’, মানে ‘আমি আমার প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছি’, সেখানে এটি-ই হযরত আয়েশা (রা:)-এর কওল (ভাষ্য)-এর জবাব হবে। কেননা, মহানবী (দ:)-এর বাণী হযরত আয়েশা (রা:)-এর ভাষ্যের চেয়ে বহু ঊর্ধ্বে।

— রেফারেন্স: বোখারী শরীফের সেরা ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী শরহে সহীহ আল-বোখারী, ৮ম খণ্ড, ৪৯৪ পৃষ্ঠা

ইমাম নববী (রহ:) যিনি সহীহ মুসলিম শরীফের ভাষ্যকার, তিনি এই বিষয়ে আরও আলোকপাত করেন নিচে:

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণিত বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে যখন (বিষয়টি) প্রমাণিত হয়েছে, তখন আমরা ধরে নিতে পারি না যে তিনি এসব ভাষ্য নিজ হতে (মনগড়াভাবে) দিয়েছেন; তিনি অবশ্যই এগুলো মহানবী (দ:)-এর কাছ থেকে শুনে বলেছেন। মা’মার বিন রাশীদ (রহ:) সর্ব-হযরত আয়েশা (রা:) ও ইবনে আব্বাস (রা:)-এর মধ্যকার মতপার্থক্য সম্পর্কে বলেন যে হযরত আয়েশা (রা:) এই বিষয়ে পূর্ণ ওয়াকেফহাল ছিলেন না, কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) তা ছিলেন। তাই হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এটি সমর্থন করলে, আর অন্য কেউ তা নাকচ করলেও উসূল তথা (সিদ্ধান্ত গ্রহণের) মৌলনীতি অনুযায়ী ‘মাসবাত’ (হ্যাঁ-সূচক প্রমাণ) ’নফী’ (না-সূচক সিদ্ধান্ত)-এর ওপর প্রাধান্য পাবে।

— শরহে সহীহ মুসলিম শরীফ, কিতাবুল ঈমান; ‘তিনি দ্বিতীয় অবতরণে তাঁকে দেখেন’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য

দলিল নং ১

ইবনে শেহাব (রহ:) বলেন: ইবনে হাযম আমাকে জানান যে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও আবদ হাব্বা আল-আনসারী (রা:) প্রায়ই বলতেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান, অতঃপর তিনি (জিবরীল) আমার সাথে ঊর্ধ্বগমন করেন যতোক্ষণ না আমাকে এতো উচ্চস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে (তাকদীর লেখার) কলমগুলোর খসখস শব্দ শুনতে পাই। ইবনে হাযম ও হযরত আনাস্ (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি বলেন: আল্লাহ আমার উম্মতের জন্যে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয (বাধ্যতামূলক) করেছিলেন। অতঃপর আমি ফেরার পথে মূসা (আ:)-কে অতিক্রম করছিলাম। এমতাবস্থায় হযরত মূসা (আ:) আমাকে বলেন, ‘আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মত এই বোঝা বহন করতে সক্ষম হবে না।’ আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ফিরে যাই এবং তিনি ওর থেকে কিছু অংশ মওকুফ করেন। এরপর আমি আবার মূসা (আ:)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে এ সম্পর্কে জানাই। তিনি বলেন, ‘আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মত এই বোঝা বহন করতে সক্ষম হবে না।’ আমি আবার মহান প্রভুর দরবারে ফিরে গেলে তিনি বলেন, ‘এতে আছে পাঁচ (ওয়াক্ত) যা একই সময়ে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। যা আদিষ্ট হয়েছে, তা আর পরিবর্তন করা হবে না।’ আমি আবার মূসা (আ:)-এর কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান।’ এমতাবস্থায় আমি (তাঁকে) বলি, আমি আমার প্রভুর সামনে লজ্জিত (হায়া-শরমসম্পন্ন)।

— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩১৩ - ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত]

ওপরের হাদীসটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে মহানবী (দ:) আল্লাহ পাককে দেখেছেন, কেননা মূসা (আ:) প্রতিবারই তাঁকে ‘তাঁর প্রভুর কাছে ফিরে যেতে’ বলেছেন এবং অবশেষে মহানবী (দ:) বলেছেন,

আমি আমার প্রভুর সামনে লজ্জিত।

দলিল নং ২

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে হুযূর পূর নূর (দ:) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন। (একরামা) জিজ্ঞেস করেন, ‘আল্লাহ কি বলেননি আঁখি তাঁকে উপলব্ধি করতে অক্ষম?’ এমতাবস্থায় তিনি (ইবনে আব্বাস) উত্তর দেন, ‘আজব ব্যাপার যে তুমি বুঝতে পারো নি। এটি সে সময়-ই ঘটে যখন আল্লাহতা’লা তাঁর নূরের এক ঝলক দেখান (যা উপলব্ধিরও অতীত)। অতএব, মহানবী (দ:) অবশ্যঅবশ্য আল্লাহতা’লাকে দু’বার দেখেছেন।

— সুনান-এ-তিরমিযী, সূরা নজমের তাফসীর, হাদীস নং ৩২০১; ইমাম তিরমিযী (রহ:) এই রেওয়ায়াতকে ‘হাসান’ আখ্যায়িত করেন।

দলিল নং ৩

শায়খ আবদুল হক্ক মোহাদ্দীসে দেহেলভী (রহ:) লেখেন:

হযরত ইবনে উমর (রা:) এই বিষয়ে জানতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর শরণাপন্ন হন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন মহানবী (দ:) আল্লাহতা’লাকে দেখেছেন কি না। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হাঁ-সূচক জবাব দিলে হযরত ইবনে উমর (রা:) তা গ্রহণ করেন এবং আর কখনোই তা প্রত্যাখ্যান করেননি।

— আশআতুল লোমআত, ৪র্থ খণ্ড, ৪৩১ পৃষ্ঠা

এক্ষণে অপর এক মুজতাহিদ সাহাবী, অর্থাৎ, হযরত ইবনে উমর (রা:)-কে পাওয়া গেল যিনি বিশ্বাস করতেন যে মহানবী (দ:) আল্লাহকে (মে’রাজ রাতে) দেখেছিলেন!

দলিল নং ৪

বোখারী শরীফ গ্রন্থের ভাষ্যকার ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ:) বলেন,

হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) হতে শক্তিশালী সনদে ইবনে খুযায়মা (রহ:) বর্ণনা করেন; হযরত আনাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন। একই কথা রেওয়ায়াত করা হয়েছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে; এবং কাঅাব আল-আহবার (রহ:), ‍যুহিরী (রহ:) ও মা’মার (রহ:)-এর মতো তাঁর শিষ্যদের কাছ থেকেও। ইমাম আবদুর রাযযাক (রহ:) মা’মার হতে বর্ণনা করেন, যিনি হযরত হাসান আল-বসরী (রহ:)-এর প্রায়ই উচ্চারিত কথা উদ্ধৃত করেন; হযরত হাসান বসরী (রহ:) বলতেন, আমি শপথ নিয়ে বলছি যে মহানবী (দ:) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন। ইবনে খুযায়মা (রহ:) আল্লাহকে দেখার পক্ষে প্রদত্ত হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়র (রা:)-এর ভাষ্য-ও সাবেত করেছেন।

— উমদাত আল-কারী শরহে সহীহ আল-বোখারী, ১৯তম খণ্ড, ১৯৮ পৃষ্ঠা

ইমাম হাসান বসরী (রহ:)-এর শপথ নেয়াটা কোনো মামুলি ব্যাপার নয়। হাদীস বর্ণনায় তাঁর মর্যাদাপূর্ণ আসন সম্পর্কে যারা অনুধাবন করতে পারে না, তারা হাদীসের বুনিয়াদি বিষয় সম্পর্কেই অজ্ঞ।

দলিল নং ৫

ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ:) আরও ব্যাখ্যা করেন:

ইমাম তাবারানী (রহ:) নিজ ‘আল-আওসাত’ পুস্তকে শক্তিশালী সনদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে রেওয়ায়াত করেন, যিনি বলেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দু’বার দেখেছিলেন; এই ভাষ্যের কারণ হলো তিনি স্বচক্ষেই আল্লাহ পাককে দেখেছিলেন। কেননা, হযরত মূসা (আ:) সরাসরি অাল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন, হযরত ইবরাহীম (আ:)-কে খোদাতা’লার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, আর রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে (তাঁর) দর্শনের জন্যে মনোনীত করা হয়েছিল (অর্থাৎ, অন্য কোনো নবীকে এই মর্যাদা দেয়া হয়নি)। স্পষ্টতঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এখানে যা বলতে চান তা হলো, মহানবী (দ:) নিজ মোবারক চোখে মহান আল্লাহকে দেখেছিলেন।

— ‘উমদাতুল কারী শরহে সহীহ আল-বোখারী’, ১৭তম খণ্ড, ৩০ পৃষ্ঠা

দলিল নং ৬

সর্ব-ইমাম নাসাঈ (রহ:) ও আল-হাকীম (রহ:) সহীহ এসনাদে বর্ণনা করেন:

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বিবৃত করেন, তোমরা কি হযরত ইবরাহীম (আ:)-এর খলীলউল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু) হওয়া, হযরত মূসা (আ:)-এর সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলা, এবং রাসূলে করীম (দ:)-এর (আল্লাহকে) দর্শনের বিষয়গুলোর প্রতি আশ্চর্যান্বিত?

নোট
  • সুনানে নাসাঈ আল-কুবরা,
  • আমল আল-এয়াওম ওয়াল-লায়লাহ অধ্যায়, ৬ষ্ঠ খণ্ড, হাদীস নং ১১৫৩৯;
  • মোস্তাদরাক ’আলা সহিহাইন, ১ম খণ্ড, হাদীস নং ২১৬

ইমাম আল-হাকীম (রহ:) ওপরের বর্ণনাশেষে বলেন:

এটি সহীহ রেওয়ায়াত, আল-বোখারীর সূত্রে।

— প্রাগুক্ত মোস্তাদরাক, হাদীস নং ২১৬

ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:) বলেন:

এই রেওয়ায়াত ইমাম নাসাঈ (রহ:) ‘সহীহ এসনাদ’ সহকারে বর্ণনা করেন এবং ইমাম আল-হাকীম (রহ:)-ও এটিকে ‘সহীহ’ বলেছেন, যার এসনাদে অন্তর্ভুক্ত আছেন হযরত একরামা (রহ:), যিনি স্বয়ং হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন (এবং এই রেওয়ায়াত নিজেই উদ্ধৃত করেছেন)।

— ‘ফাতহুল বারী শরহে সহীহ আল-বোখারী’, ৮ম খণ্ড, ৪৯৩ পৃষ্ঠা

অতএব, ওহে মুসলমান সম্প্রদায়, এই বাস্তবতা সম্পর্কে জানার পর বিস্মিত হবেন না। কেননা, মহানবী (দ:) বাস্তবিক-ই তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছিলেন; আর এই বিষয়টি-ই আমাদের তথা আহলুস্ সুন্নাহ’র সাথে পথভ্রষ্ট মো’তাযেলী গোষ্ঠীর মৌলিক পার্থক্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। তারা এই বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করতো (আজকে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে শিয়া গোষ্ঠী)।

দলিল নং ৭

ইমাম নববী (রহ:) হযরত ইবনে মাসউদ (রা:)-এর বর্ণিত হাদীসের নিচে লেখেন যে ‘মহানবী (দ:)-এর অন্তর তিনি যা দেখেছিলেন সে সম্পর্কে মিথ্যে বলেনি’ আয়াতটির মানে তিনি জিবরীল (আ:)-কে দেখেছিলেন, এই কথা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) ও তাঁর মযহাবের; কিন্তু (হযরত ইবনে আব্বাস সহ) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মোফাস্সেরীন তথা কুরআন ব্যাখ্যাকারী উলামা-মণ্ডলীর মযহাব (পথ ও মত) হলো রাসূলুল্লাহ (দ:) মে’রাজ রাতে আল্লাহ সোবহানাহু ওয়া তা’লাকে দেখেছিলেন।

— শরহে সহীহ মুসলিম, কিতাব আল-ঈমান অধ্যায়, সিদরাত আল-মোনতাহা সম্পর্কে আলোচনা; হাদীস নং ২৫৪

ইমাম নববী (রহ:) আরও বলেন:

(এ যাবত প্রদর্শিত যাবতীয় দলিলের) সামগ্রিক ফলাফল এই যে, বহু উলামা-এ-কেরামের কাছে প্রধানত প্রতিষ্ঠিত (সিদ্ধান্ত) রাসূলুল্লাহ (দ:) মে’রাজ রাতে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছিলেন, যেমনটি ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর এবং অন্যান্যদের রেওয়ায়াতে; এই দালিলিক প্রমাণ স্বয়ং রাসূলে খোদা (দ:) থেকে এসেছে, আর তাই এতে কোনো সন্দেহেরই অবকাশ নেই।

— শরহে সহীহ মুসলিম, কিতাব আল-ঈমান, ‘তিনি দ্বিতীয় অবতরণে তাঁকে দেখেন’ অধ্যায়ের ব্যাখ্যায়

দলিল নং ৮

হযরত আয়েশা (রা:)-এর বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে ইমাম নববী (রহ:) আরও বলেন:

হযরত আয়েশা (রা:)-এর (আল্লাহকে দেখার বিপক্ষে) গৃহীত দলিল (অর্থাৎ, চোখ তাঁকে উপলব্ধি করতে অক্ষম) সম্পর্কে স্পষ্ট জবাব হলো, আল্লাহতা’লার এদরাক হতে পারে না (মানে তাঁর সম্পর্কে সম্পূর্ণ উপলব্ধি অসম্ভব); অতএব, (কোরআনী) নস্ (তথা প্রামাণ্য দলিল) ‘নফী আল-এহা’ত’ (পূর্ণ উপলব্ধি নাকচ) করে, কিন্তু তা ‘এহা’তা-বিহীন দর্শনকে নাকচ করে না।

— প্রাগুক্ত শরহে সহীহ মুসলিম

দলিল নং ৯

ইমাম ইবনে জারির তাবারী (রহ:) ‘মহানবী (দ:)-এর অন্তর তিনি যা দেখেছেন সে সম্পর্কে মিথ্যে বলেনি’ (আল-কুরআন, ৫৩:১১) আয়াতের তাফসীরে লেখেন:

ঈসা ইবনে উবায়দ (রহ:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে মে’রাজ রাতে দেখেছিলেন কি না, এ ব্যাপারে একরামা (রহ:)-কে জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি বলেন, হ্যাঁ, তিনি তাঁর রব্ব আল্লাহকে দেখেছিলেন।

— তাফসীরে তাবারী, ৫৩:১১

দলিল নং ১০

ইমাম তাবারী (রহ:) খোদ রাসূলুল্লাহ (দ:) হতে প্রমাণ পেশ করেন:

হযরত আতা (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান, আমি আল্লাহতা’লাকে সেরা সুরত তথা আকৃতিতে দেখেছি (আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-ই ভাল জানেন)।

— তাফসীরে তাবারী, ৫৩:১১

তথ্যসূত্র

  1. ইমাম ইবনে জাওযী প্রণীত ‘যাদ আল-মাসীর ফী এলম আত্ তাফসীর, ৮ম খণ্ড, ৬৫-৬ পৃষ্ঠা।