মেরাজ

From Sunnipedia
(Redirected from শবে মেরাজ)
Jump to: navigation, search

আরবি অর্থ সিঁড়ি, উর্ধগমন, আরোহণ । ع ر جধাতু হইতে শব্দটির উৎপত্তি, বহুবচনে মা'আরিজ ।

মিরাজ নবী করিম (দঃ) এর মুজিযাসমূহের মধ্যে মেরাজ গমন একটি বিস্ময়কর মোজেজা । এ জন্যই মেরাজের ঘটনা বর্ননা করার আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ্‌ পাক 'সোবহানাল্লাহ্‌' শব্দটি ব্যবহার করেছেন যা আশ্চর্য্যজনক ঘটনার সময়ই ব্যবহার করা হয় । স্বশরীরে মেরাজ গমনের প্রমান স্বরূপ কোরআনের 'বিআব্‌দিহী' শব্দটি তাৎপর্য্যপূর্ন । কেননা 'আব্‌দুন' শব্দটি দ্বারা বুঝানো হয় রুহ ও দেহের সমষ্টিকে । তদুপরি বোরাক প্রেরন ও বোরাক কর্তৃক নবী করিম (দঃ) কে বহন করে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেও স্বশরীরে মেরাজ গমনের প্রমান পাওয়া যায় । স্বপ্নে বা রুহানীভাবে মেরাজের দাবী করা হলে কোরাঈশদের মধ্যে এত হৈ চৈ হতো না । আহ্‌লে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পূর্ববর্তী সকল ইমামগনই স্বশরীরে মেরাজ গমনের কথা স্বীকার করেছেন ।

মিরাজের ঘটনাটি নবীজির জীবনে গুরুত্বপূর্ন এজন্য যে, এর সাথে গতির সম্পর্ক এবং সময় ও স্থানের সঙ্কোচনের তত্ত্ব জড়িয়ে আছে । সূর্যের আলোর গতি সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল । পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে আট মিনিট বিশ সেকেন্ড । এ হিসেবে পৃথিবী হতে সূর্যের দূরত্ব নয় কোটি তিরিশ লক্ষ মাইল । অথচ নবী করিম (দঃ) মূহুর্তের মধ্যে চন্দ্র, সূর্য, সিদরাতুল মোন্তাহা, আরশ-কুরছি ভ্রমন করে লা-মাকানে খোদার দীদার লাভ করে নব্বই হাজার কালাম করে পুনরায় মক্কা শরীফে ফিরে এলেন । এসে দেখলেন বিছানা এখনো গরম রয়েছে । এর চেয়ে আশ্চর্য আর কি হতে পারে ? নবী করিম (দঃ) এর গতি কত ছিল-- এ থেকেই অনূমান করা যায় । কেননা তিনি ছিলেন নূর

মেরাজের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো-- অন্যান্য নবীগনের সমস্ত মোজেজা নবী করিম (দঃ) এর মধ্যে একত্রিত হয়েছিল । হযরত মুছা (আঃ) তূর পর্বতে খোদার নামে কালাম করেছেন । হযরত ঈছা (আঃ) স্বশরীরে আকাশে অবস্থান করেছেন এবং হযরত ইদ্রিছ (আঃ) স্বশরীরে বেহেস্তে অবস্থান করছেন । তাঁদের চেয়েও উন্নত মকামে বা উচ্চমর্যায় আল্লাহ্‌ পাক নবী করিম (দঃ) কে নিয়ে সবার উপরে তাকে মর্যাদা প্রদান করেছেন । মুছা (আঃ) নিজে গিয়েছিলেন তূর পর্বতে । আর আমাদের প্রিয় নবী করিম (দঃ) কে আল্লাহ্‌ তাআলা দাওয়াত করে বোরাকে চড়িয়ে ফেরেস্তাদের মিছিল সহকারে বায়তুল মোকাদ্দাছে নিয়েছিলেন । সেখানে সমস্ত নবীগনকে স্বশরীরে উপস্থিত করে হুজুর করিম (দঃ) এর মোক্তাদী বানিয়েছিলেন । সেদিনই সমস্ত নবীগনের ইমাম হতে নবী করিম (দঃ) 'নবীগনেরও নবী' বাস্তবে প্রমানিত হয়েছিলেন । সমস্ত নবীগন অষ্ট অঙ্গ (দুই হাত, দুই পা, দুই হাটু, নাক ও কপাল) দিয়ে স্বশরীরে নামাজ আদায় করেছিলেন সেদিন । সমস্ত নবীগন স্বশরীরে জীবিত, তারই বাস্তব প্রমান মিলেছিল মেরাজের রাত্রে ।

সমস্ত নবীগণ আপন আপন রওযায় জীবিত আছে

— হাদীস

মেরাজের রাত্রে নবী করিম (দঃ) কে প্রথম সম্বর্ধনা দেয়া হয়েছিল জিব্রাইল, মিকাইল ও ইস্রাফিল ফেরেস্তাত্রয়ের অধীনে সত্তর হাজার ফেরেস্তা দিয়ে । দ্বিতীয় সম্বর্ধনা দেয়া হয়েছিল নবী (আঃ) গনের মাধ্যমে । তৃতীয় সম্বর্ধনা দেয়া হয়েছিল আকাশের ফেরেস্তা ও হুর দিয়ে এবং চতুর্থ ও শেষ সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন স্বয়ং আল্লাহ্‌ তাআলা । সিদ্‌রাতুল মোন্তাহা ও আরশ মোয়াল্লা অতিক্রম করার পর স্বয়ং আল্লাহ তাআলা একশত বার সম্বর্ধনামূলক বাক্য ادن منى يا محمد অর্থাৎ 'হে প্রিয় বন্ধু মোহাম্মদ, আপনি আমার অতি নিকটে আসুন'-- বলে নবী করিম (দঃ) কে সম্মানীত করেছিলেন । কোরআন মজিদে ثُمَّ دَنَا فَتَدَ لَّى আয়াতটি এদিকেই ইঙ্গিতবহ বলে তাফসীরে মুগ্‌নী ও মিরছাদুল ইবাদ গ্রন্থদ্বয়ের বরাত দিয়ে রিয়াজুন্নাছেহীন কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে । উক্ত কিতাবখানা সাত শত বৎসর পূর্বে ফারসি ভাষায় লিখিত । লেখকের নিকট কিতাবখানা সংরক্ষিত আছে ।

মিরাজের ঘটনা ঘটেছিল ১১ বৎসর ৫ মাস ১৫ দিনের মাথায় । অর্থাৎ প্রকাশ্য নবুয়তের ২৩ বৎসর দায়িত্ব পালনের মাঝামাঝি সময়ে । সে সময় হুজুর (দঃ) এর বয়স হয়েছিল ৫১ বৎসর ৫ মাস ১৫ দিন । সন ছিল নবুয়তের দ্বাদশ সাল । তিনটি পর্যায়ে মেরাজকে ভাগ করা হয়েছে । মক্কাশরীফ থেকে বায়তুল মোকাদ্দাছ পর্যন্ত মেরাজের অংশকে বলা হয়ে ইস্‌রা বা রাত্রি ভ্রমন । বায়তুল মোকাদ্দাছ থেকে সিদ্‌রাতুল মোন্তাহা পর্যন্ত অংশকে বলা হয় মেরাজ । সিদ্‌রাতুল মোন্তাহা থেকে আরশ ও লা-মকান পর্যন্ত অংশকে বলা হয় ই'রাজ; কিন্তু সাধারনাভাবে পূর্ন ভ্রমণকেই এক নামে মেরাজ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে । কোরআন, হাদিসে মোতাওয়াতির এবং খবরে ওয়াহে দ্বারা যথাক্রমে এই তিনটি পর্যায়ের মিরাজ প্রমানিত ।

তথ্যসূত্র

  • নূরনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (লেখকঃ অধ্যক্ষ হাফেয মুহাম্মদ আব্দুল জলিল (রহঃ) (এম এম, এম এ, বিসিএস))