শহীদ পরিবারের মদীনা শরীফ প্রত্যাবর্তন

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
কারবালার ইতিহাস






























  • শহীদ পরিবারের মদীনা শরীফ প্রত্যাবর্তন

এরপর ইয়াযীদ হযরত নু’মান বিন বশীর (রহঃ)কে তলব করল, যিনি একজন বিশিষ্ট তাবেঈ ছিলেন। উনাকে ডেকে বলল, আপনার সাথে আরো ত্রিশজন লোক নিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদেরকে বাহনযোগে মদীনা মুনাওওয়ারায় পৌঁছিয়ে দিয়ে আসুন। হযরত নু’মান বিন বশীর (রহঃ) এ প্রস্তাবকে সানন্দে গ্রহণ করলেন এবং নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় মনে করলেন। অতঃপর ত্রিশজন সহকর্মীসহ হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে মদীনা মুনাওওয়ারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম হযরত নু’মান বিন বশীর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে বললেন, আমাদেরকে কারবালার পথ দিয়ে নিয়ে যান। আমরা দেখে যেতে চাই, আমাদের শহীদদের দেহ মুবারক সেইভাবে পড়ে আছে, না কেউ দাফন করেছে। যদি দাফনবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে, প্রথমে আমরা তাঁদেরকে দাফন করবো, এরপর ওখান থেকে রওয়ানা হবো। আর যদি কেউ দাফন করে থাকে, তাহলে তা দেখে অন্ততঃ কিছুটা সান্ত্বনা পাব। হযরত নু’মান বিন বশীর (রহঃ) হযরত যয়নাব (রাঃ)এর কথার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করলেন এবং কারবালার পথ ধরলেন। কারবালায় গিয়ে হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম সেই প্রান্তর যখন দেখলেন, যেই প্রান্তরে তাদের আপনজনদেরকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিল, হঠাৎ উনি অপ্রত্যাশিতভাবে চিৎকার করে উঠলেন এবং অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, এখানে হযরত আলী আছগরের দেহ মুবারক পড়েছিল, ওখানে হযরত আলী আকবরের দেহ মুবারক পড়ে ছিল, এখানে আমার ভাই হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর দেহ মুবারক পড়েছিল। তিনি এভাবে যখন হাতের আঙ্গুল দ্বারা দেখিয়ে দেখিয়ে দেহ মুবারকগুলোর অবস্থানের কথা বলছিলেন, তখন সবারই মুখ থেকে ক্রন্দনের করুণ আওয়াজ বের হচ্ছিল।

কারবালার নিকটবর্তী একটি গ্রাম ছিল, যার নাম ছিল আমরিয়া। ইয়াযীদ বাহিনী চলে যাওয়ার পর ঐ আমরিয়া গ্রামের অধিবাসীরা এসে শহীদদের দেহ মুবারকসমূহ দাফন করেছিল। মদীনা শরীফ থেকেও একটি দল হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর নেতৃত্বে কারবালায় এসে পৌঁছেছিল। শহীদ পরিবারের কাফেলা যখন কারবালার প্রান্তরে পৌঁছল, সেই সময় মদীনা শরীফ থেকে আগত দল ও আমরিয়া গ্রামের অধিবাসীরাও উপস্থিত ছিল। তারা যখন এ মজলুম কাফেলাকে দেখলো তখন আর এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হল। ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল ২০শে সফর অর্থাৎ শহীদদের ‘চেহলামের’ দিন। কাফেলার সবাই সেই রাত সেখানেই অতিবাহিত করেন। সারা রাত তাঁরা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করেন, দুয়া-দুরূদ শরীফ পাঠ করেন এবং খাবারের জন্য খিচুড়ী পাকান। আজকাল সুন্নী মুসলমানদের ঘরে মহররম মাসে যেই খিচুড়ি পাকানো হয় সেটা তাদের স্মৃতিচারণ । একদিন এক রাত সেখানে অবস্থানের পর তারা মদীনা মুনাওওয়ারার পথে রওয়ানা হলেন।

কাফেলা যখন মদীনা মুনাওওয়ারার সন্নিকটে পৌঁছল এবং চোখের সামনে মদীনা শরীফের দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল, তখন সবারই চোখ আবার অশ্রু সজল হয়ে উঠলো এবং একান্ত ধৈর্য ও ছবরের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে অগ্রসর হলেন। এদিকে তাঁদের আগমনের খবর বিদ্যুৎ গতিতে সমগ্র মদীনা মুনাওওয়ারায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর বড় মেয়ে হযরত ফাতিমা (রাঃ) মদীনা শরীফ-এ ছিলেন, যাঁর সাথে হযরত ইমাম হাসান (রাঃ)এর বড় ছেলের বিবাহ হয়েছিল। হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর ভাই হযরত মুহম্মদ বিন হানাফিয়া (রাঃ)ও মদীনা শরীফে ছিলেন, হযরত মুসলিম বিন আকিল (রাঃ)এর মেয়ে ও বোনেরাও তখন মদীনা শরীফে ছিলেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবি উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা (রাঃ)ও মদীনা শরীফে ছিলেন। উনারা সকলেই এবং মদীনা শরীফের প্রতিটি ঘরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রত্যেকেই মজলুম কাফেলাকে এক নজর দেখার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন।

হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর বড় মেয়ে হযরত ফাতিমা (রাঃ) যখন মজলুম কাফেলাকে এগুতে দেখলেন, তখন একান্ত ছবর ও ধৈর্যশীলা হওয়া সত্ত্বেও অজান্তে হু হু করে কেঁদে উঠলেন এবং ফুফু হযরত যয়নাব আলাইহাস সালামকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, ফুফু! আমার আব্বাজানকে কোথায় রেখে এসেছেন? আমার ভাই আলী আছগর ও আলী আকবরকে কোথায় রেখে এসেছেন? আমার চাচাতো ভাই ক্বাসিমকে কোথায় রেখে এসেছেন? আমার আব্বাস চাচাজান কোথায়? আমাদের ভরপুর ঘর কোথায় লুণ্ঠিত হলো? হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা (রাঃ)এর সুশোভিত বাগানকে কারা ছিন্নভিন্ন করলো? এভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করতে লাগলেন তখন এমন এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল যে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অনেকে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন। লোকেরা অনেক সান্তনা দিয়ে, ছবর ও ধৈর্যের কথা বলে কাফেলাকে মদীনা শরীফে নিয়ে আসলেন।

তথ্যসূত্র

  • কারবালা প্রান্তরে(লেখকঃ খতিবে পাকিস্তান হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ শফী উকাড়বী(রহঃ))