হযরত আবদুল্লাহর আশ্চর্য জীবন, বিবাহ এবং পবিত্র মাতৃগর্ভে আল্লাহর হাবীব (সা)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ 1
  • হযরত আবদুল্লাহর আশ্চর্য জীবন, বিবাহ এবং পবিত্র মাতৃগর্ভে আল্লাহর হাবীব (সা)





























মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ
  • মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ 1


আবদুল মুত্তালিব বিলুপ্ত যমযম কূপের স্থানটি স্বপ্নে দেখলেন। তিনি এটাকে আল্লাহর ইশারা মনে করে যমযম খননের উদ্যোগ নেন। কুরায়শ গোত্রের লোকারা তাদেরকে এ কাজে অংশীদার করার দাবিতে বাধা হয়ে দাঁড়াল। এ সময় তিনি নিজের আপন লোকজন কম থাকায় কারণে অন্তরে দুঃখ বোধ করলেন। মানত করলেন যদি তাঁর দশটি সন্তান হয় তবে একটি সন্তানকে কাবার পাশে আল্লাহর নামে কুরবানী করবেন।

আল্লাহর মর্জি, দেখতে দেখতে তাঁর সন্তান সংখ্যা দশ পূর্ণ হলো। সবাই বড় হলো। মানত পুরা করার জন্য সব সন্তানই নিজকে পেশ করলেন। শেষ পর্যন্ত লটারী করলে আবদুল্লাহর নাম বের হলো। কিন্তু সমগ্র কুরায়শ এবং আবদুল মুত্তালিবের অন্য সন্তানেরা আবদুল্লাহর কুরবানীর ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আবল্লাহ্ তাঁর অনুপম চরিত্র ও অপূর্ব দেহশ্রীর জন্য সকলের কাছেই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ভাইয়েরাও তাঁকে প্রাণধিক ভালবাসত।

শেষ পর্যন্ত হেযাযের মহিলা জ্যোতিষী ‘কুতবা’র পরামর্শেমতে একদিকে রক্তপণের নির্দিষ্ট হার মতে দশটি উট অন্যদিকে আবদুল্লাহর নাম, এভাবে লটারী করা হলো। এমনি করে একশ উটের বিনিময়ে আবদুল্লাহর প্রাণ রক্ষা পেল। আবদুল মুত্তালিব আবদুল্লাহর প্রাণের পরিবর্তে একশ উট কুরবানী দিলেন।

ইব্ন হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী অনেকের মতে একশ উটের নাম আবদুল্লাহর পরিবর্তে যখন লটারীতে এলো, তাতে তিনি সন্তষ্ট না হয়ে তিনবার লটারির তীর টানলেন। তিনবারই যখন একশ উটের কথাই উঠে এলো তিনি সন্তষ্ট হয়ে ঐ পরিমাণ উট কুরবানী করলেন।

এরপর আবদুল মুত্তালিব প্রিয়পুত্র আবদুল্লাহর হাত ধরে কাবা শরীফ থেকে বের হলেন। চলার পথে বনু আসাদের এক মহিলা রুকাইয়া বিনতে নাওফালের পাশ দিয়ে তাঁরা যাচ্ছিলেন। দূরদর্শী রুকাইয়ার দৃষ্টি আবদুল্লাহর চেহারায় আটকে গেল। আবদুল্লাহর ললাটে নূরে মুহাম্মদী তখন তীব্র জ্যোতির মতো চমকাচ্ছিল।

রুকাইয়া ওরফে উম্মে কেতাব বলল, হে আবদুল্লাহ্ ! তুমি কোথায় যাও ?

আবদুল্লাহ্ বললেনঃ “দেখতেই পাচ্ছ, বাবার সাথে যাচ্ছি।”

রুকাইয়া বলল-“তুমি এই মুহূর্তে আমাকে বিবাহ কর।” তোমার জন্য এইমাত্র যেরকম একশত উট কুরবানী দেওয়া হয়েছে তেমনি একশ উট আমি তোমাকে দেব।”

আবদুল্লাহ্ বললেনঃ এখন আমি বাবার সাথে আছি। তাঁর মতামত ছাড়া কিছু করতে পারব না। আর এ মুহূর্তে তাঁর থেকে আলাদা হতে পারব না।

কথিত আছে, এ যাত্রায় ‘ফাতিমা বিনতে র্মুরা নান্মী আরবের প্রখ্যাত সুন্দরী ও সতী মহিলা আবদুল্লাহর ললাটে নূর মুহাম্মদীর অদৃষ্টপূর্ব জ্যেতি চমকাতে দেখে প্রচন্ডভাবে আসক্ত হয়ে পড়ল, এবং ঐ জ্যোতি লাভের আশায় ব্যাকুল হয়ে তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিল। আবদুল্লাহ্ তা প্রত্যাখান করেন। এর পর পরই আবুল মুত্তালিব বনু যুহরার গোত্রপ্রধান ওয়াহাব ইব্ন আবদে মানাফের সুন্দরী ও বিদুষী কন্যৃা আমিনার সাথে আবদুল্লাহর বিয়ে দেন। তাঁদেও প্রথম মিলনেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমিনার গর্ভে আসেন এবং আবদুল্লাহর ললাট থেকে ঐ জ্যোতি তিরোহিত হয়ে যায়।

ফাতিমা বিনতে মুররা তখন গভীর হতাশায় নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেনঃ

আমি একটি অদৃষ্টপূর্ব অবস্থা দর্শন করেছিলাম

যা জন্ম নিয়েছিল দিগন্তে

এবং ঝিকমিক করছিল

আল্লাহর কসম, তোমার অজান্তেই তোমার কাছ থেকে

বনু যুহরার ঐ মহিলাটি ছিনিয়ে নিরেয়ছে তা।

ইব্ন আব্বাস (রা)- এর রেওয়ায়েত মতে, এ ফাতেমা ছিল ইয়াহুদী জ্যোতিষী। কারো মতে নবী আদী গোত্রের লায়লা নান্মী এক মহিলাও আবদুল্লাহর প্রতি ঐ নূর দর্মন করে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনুরুপ প্রস্তাব প্রদান করে। কিন্ত আবদুল্লাহ্ তা প্রত্যাখ্যান করেন।

আমিনার সাথে মিলনের পর আবদুল্লাহ্ বেন হয়ে আসেন। পরদিন রুকাইয়া বিনতে নাওফেলের সাথে দেথা করেন। কিন্ত– তিনি লক্ষ করলেন রুকাইয়ার মাঝে আজ আর তেমন কোন উৎসাহ নেই।

আবদুল্লাহ্ বললেনঃ “ব্যাপার কি ? গতকালের ন্যায় কোনও প্রস্তাব যে এখন দিচ্ছ না ?”

রুকাইয়া বলল, “তোমার ব্যাপারে আর আমার কেনও উৎসাহ নেই। কাল তোমর মাঝে যে জ্যোতি ছিল, সে কারণেই আমি ঐ প্রস্তাব করেছিলাম। আজ তা নেই।”

বস্ততঃ রুহাইয়ার ভাই ওয়ারাকা ইব্ন নাওফেল ছিলেন খৃষ্টধর্মের সে যুগের বড় পন্ডিত। শেষ নবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই তাঁর জানা ছিল। ত৭ার কাছ থেকেই রুকাইয়া এ জ্যোতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছিল। [1]

এ প্রসঙ্গে হযরত শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী বর্ণনা করেন, হযরত আবদুল্লাহর রুপ ও সৌন্দর্যের খ্যাতি তো ছিলই, তার উপর তাঁর ‘জবীহ’ হওয়ার ঘটনায় তাঁর খ্যাতি এরুপ বেড়ে গেল যে, তৎকালীন কুরায়শের প্রখ্যাত সুন্দরী ও বিদুষী যুবতীরা তাঁর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল। এমনকি তাদের কেউ কেউ আবদুল্লাহর প্রতি প্রচন্ডভাবে আসক্ত হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আবদুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যেত এবং তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের তৎপর হতো। কিন্ত আল্লাহ্ পাক হযরত আবদুল্লাহকে যাবতীয় স্থলন থেকে রক্ষা করলেন।

মক্কার ইহুদী ও খৃষ্টানরা ছিল আসমনী কিতাবধারী। ওরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)- এর আগমন সম্পর্কে অনেক তথ্যাদি জানতো। ওরা হযরত আবদুল্লাহর মাঝে এমন অনেক লক্ষণ পরিষ্কার দেখতে পায় যাতে ওদের মাঝে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেল যে, শেষ নবীর আগমনের সাথে আবদুল্লাহ্ কোন না কোনভাবে অবশ্যই সম্পৃক্ত আছেন। ওরা তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহন করল এবং সেই চেষ্টায় অত্মনিয়োগ করল।

একবার আবদুল্লাহ্ দুরবর্তী এক জঙ্গলে শিকার করতে গেলেন। টের পেয়ে আহলে কিতবরা তাঁকে ঘিরে ফেলল। তিনি তখন সম্পূর্ণ একা এবং অসহায়। ওরা ছিল সশস্ত্র। ঘটনাক্রমে এ সময় হযরত আমিনার পিতা ওয়াহাব ইব্ন আবদে মানাফ ঐ জঙ্গলে ছিলেন। তিনি দেখলেন, হঠাৎ অদৃশ্য থেকে একটি দল আবির্ভূত হলো এবং আবদুল্লাহ্কে ঘিরে ফেলা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের দলটিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল। ওয়াহাব বিস্মিত ও চমৎকৃত হলেন।

ওয়াহাব বাড়ি গিয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে ঘটনা বিবৃত করলেন এবং বললেন, “আমার বড় ইচ্ছা যে, আমার প্রিয় কন্যা আমিনার বিবাহ আবদুল্লাহর সাথে দেই।” তিনি তাঁর এ ইচ্ছার কথা তাঁর বন্ধু-বান্ধব দ্বারা আবদুল মুত্তালিবের কাছেও বলে পাঠালেন। আবদুল মুত্তালিবও এ সময় হযরত আবদুল্লাহর বিয়ে নিয়ে খুব ভাবছিলেন। তিনি বংশ কৌলীন্যে, রুপে-গুণে অনন্যা এক কন্যা আবদুল্লাহর জন্য তালাশ করছিলেন। ওয়াহাবের প্রস্তাবের মাঝে এসব কিছুই তিনি তাঁর মনের মত পেলেন এবং তিনি হযরত আমিনার সাথে হযরত আবদুল্লাহর বিয়ে দিলেন।

তথ্যসূত্র

  1. ইব্ন হিশাম
  • মাদারেজুন নাবুওয়াত (লেখকঃ আব্দুল হক মুহাদ্দেসে দেহলবী (রহঃ))
  • রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)