এই সুন্নিপিডিয়া ওয়েবসাইট পরিচালনা ও উন্নয়নে আল্লাহর ওয়াস্তে দান করুন
বিকাশ নম্বর ০১৯৬০০৮৮২৩৪

ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) * কারবালার ইতিহাস * পিস টিভি * মিলাদ * মাযহাব * ইলমে গায়েব * প্রশ্ন করুন

বই ডাউনলোড

হুযুর (দঃ) ভূমিষ্ঠ হলেন কীভাবে ?

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিস্তারিত জীবনী










  • হুযুর (দঃ) ভূমিষ্ঠ হলেন কীভাবে ?








আল্লাহর প্রিয় হাবীব (দঃ) পিতা-মাতার মাধ্যমে নূর হিসাবেই দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর আগমনের ধরন ছিল ভিন্ন রকম। সাধারণ মায়েরা গর্ভকালীন ব্যথা অনুভব করে থাকেন এবং প্রসবকালীন সময়ে প্রচণ্ড কষ্ট ও ব্যথা পেয়ে থাকেন। কিন্তু বিবি আমেনা (রাঃ) গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সময়ে কোনো ওজন অথবা ব্যথা-বেদনা কিছুই অনুভব করেননি। অন্যান্য মায়ের প্রসবকালীন সময়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু নবীজীর মায়ের এ অবস্থা ছিলনা, বরং বের হয়েছিল একটি নূর-যা মক্কাভূমি থেকে সিরিয়া পর্যন্ত আলোকিত করেছিল। সে নূর ছিল নবী করিম (দঃ)-এ নূর মোবারক।

অন্যান্য সন্তান মায়ের নাভির মাধ্যমে গর্ভে খাদ্য গ্রহণ করে এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নাভি কাটা হয়। কিন্তু নবী করিম (দঃ) মায়ের নাভির সাথে যুক্ত ছিলেন না, বরং নাভি কর্তিত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। অন্যান্য সন্তান রক্তমাখা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়, কিন্তু নবী করিম (দঃ) পবিত্র অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। অন্যান্য সন্তান উলঙ্গ ও খতনাবিহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু নবী করিম (দঃ) বেহেস্তি লেবাছ পরিহিত, সুরমা মাখা চোখ ও খতনাকৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন।

নবী করিম (দঃ) এরশাদ করেছেন,

জন্মকালে কেউ আমার ছতর দেখেনি।

— বেদায়া নেহায়া ২য় খন্ড ২৬১ পৃষ্ঠা

মাদারিজুন্নবুয়ত কিতাবে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। অন্যান্য সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে ওয়া (হুয়া) করে চিৎকার দেয়। কিন্তু নবী করিম (দঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েই প্রথমে সিজদা করেন এবং পরে শুদ্ধ আরবি ভাষায় আশহাদু আল-লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নী রাসুলুল্লাহ কালেমা শরীফ পাঠ করেছিলেন ।(আল্লামা দিয়ার বিকরীর তারিখুল খামিছ ও সুয়ুতির খাছায়েছে কুবরা) । সুতরাং নবী করিম (দঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রকৃতি ভিন্ন ধরনের হওয়াই স্বাভাবিক। আল্লাহ যাকে যেভাবে ইচ্ছা-সৃষ্টি করতে পারেন।

আল্লাহ তায়ালা আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ) কে পিতামাতা ছাড়াই সরাসরি পয়দা করেছেন। একজনকে মাটি দিয়ে, অন্যজনকে বাম পাঁজরের হাড় দিয়ে। হযরত ঈসা (আঃ) কে পিতার বীর্য ছাড়া শুধু রুহ দিয়ে বিবি মরিয়মের গর্ভে পয়দা করেছেন। সাধারণ মানুষ পয়দা হয় পিতা মাতার নুৎফা বা বীর্য থেকে, সরাসরি মাটি দিয়ে নয়। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী (দঃ) কে আল্লাহ পয়দা করেছেন নূরের দ্বারা। এই নূর কোন্ পদ্ধতিতে পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে গেলেন এবং কোন্ পদ্ধতিতে মায়ের গর্ভ হতে দুনিয়াতে পদার্পন করলেন-তা গবেষণার বিষয় নয়-বরং কুদরতের উপর বিশ্বাস স্থাপনই এর একমাত্র সমাধান।

মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরীর ফতোয়াঃ

এবার আসুন, এ ব্যাপারে ওলামাগণের মতামত কী-তা আলোচনা করি। হাদীয়ে বাঙ্গাল ও আসাম নামে পরিচিত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেবের সাহেবজাদা মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী সাহেব আরবিতে একখানা কিতাব রচনা করেছেন। উক্ত কিতাবের নাম- “নবী করিম (দঃ)-এর বেলাদত শরীফের ধরন সম্পর্কে উত্তম রেওয়ায়াত ও দলীল”।

উক্ত কিতাবে তিনি কয়েকখানা বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাবের এবারত উদ্ধৃত করে অবশেষে নিজের মতামত বা ফতোয়া প্রদান করেছেন। আমরা উক্ত কিতাবের ফতোয়ার এবারত হুবহু পাঠকের সামনে উপস্থাপন করছি। উক্ত কিতাবের ফটোকপি অধম লেখকের নিকট সংরক্ষিত আছে।

আল্লামা আবদুল্লাহ শাব্রাভী (রাঃ) স্বীয় আল আতহাফ বিহুব্বিল আশরাফ গ্রন্থে নবী করিম (দঃ)-এর পবিত্র দেহ থেকে বহির্গত যাবতীয় বর্জ্য বস্তুর পবিত্রতা শীর্ষক আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লামা তিলিমসানী কর্তৃক একটি ফতোয়ার উল্লেখ করে বলেন, উক্ত আল্লামা তিলিমসানী ফতোয়া দিয়েছেন যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) ব্যতিত প্রত্যেক মানব সন্তান মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে। অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েছেন মায়ের নাভি ও প্রস্রাবের রাস্তায় মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে এবং আমাদের প্রিয়নবী (দঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েছেন বিবি আমেনার (রাঃ)-এর বাম উরুদেশ দিয়ে-যা বাম পাঁজরের হাড়ের নিচে অবস্থিত। তারপর উক্ত স্থান সাথে সাথেই জোড়া লেগে যায়। এই বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ভূমিষ্ঠ হওয়া নবী করিম (দঃ)-এর একক বৈশিষ্ট্য। কোনো নবী (আঃ) মায়ের প্রস্রাবের স্থান দিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার বর্ণনাটি সঠিক নয়। একারণেই মালেকী মাযহাবের মুফতী ও উলামাগণ ফতোয়া দিয়েছেন যে,

যে ব্যক্তি বলবে-নবী করিম (দঃ) মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, তাকে কতল করা ওয়াজিব

— উদম্দাতুন নুকুল ফী কাইফিয়াতে বিলাদাতির রাসূল-মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী এবং মূল গ্রন্থ আল আতহাফ-বি-হুব্বিল আশরাফ-আল্লামা শাবরাভী


উক্ত ফতোয়া উল্লেখ করে মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী সাহেব নিজের মন্তব্য ও ফতোয়া এভাবে পেশ করেছেন-

আল্লাহর নিকট তৌফিক চেয়ে আমি (আবদুল আউয়াল জৌনপুরী) বলছি- নবী করিম (দঃ) ছিলেন আপাদমস্তক দেহধারী নূর।

যেমন কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে একজন সম্মানীত নূর ও একটি স্পষ্ট কিতাব এসেছে”।

পবিত্র হাদীসেও রাসুল (দঃ)কে নূর বলে প্রমাণ করা হয়েছে। যেমন- হযরত যাকওয়ান (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে- “চন্দ্র সূর্যের আলোতে নবী করিম (দঃ)-এর ছায়া পড়তনা” (কেননা নূরের ছায়া হয় না)। উক্ত হাদীস হাকিম তিরমিজী নিজ কিতাবে সংকলন করেছেন।

হযরত ইবনে ছাব বর্ণনা করেন- “নবী করিম (দঃ) ছিলেন আপাদমস্তক নূর। কেননা যখন তিনি দিবাকরের আলোতে কিংবা চন্দ্রিমা নিশিতে চলাফেরা করতেন, তখন তাঁর ছায়া দেখা যেতনা”।

নূরের প্রমাণবহ আর একখানা হাদীস অন্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবী করিম (দঃ) উক্ত হাদীসে এরশাদ করেছেন, “হে আল্লাহ! আমাকে নূর হিসেবে গণ্য কর” (মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া)। নবী করিম (দঃ) যে মায়ের গর্ভেও নূর হিসেবেই বিরাজমান ছিলেন- এ মর্মে আবু যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া কর্তৃক বর্ণিত হাদীসও ইহার সত্যতা প্রমাণ করে। সুতরাং নবী করিম (দঃ) অন্যান্য মানব সন্তানের জন্মের চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রমধর্মী স্থান দিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছেন- এটা কোনো অসম্ভব ব্যাপারই নয় । আল্লাহ যখন কিছু সৃষ্টির ইচ্ছা করেন, তখন পূর্ববর্তী চিরাচরিত যে কোনো নিয়ম ও রীতি ভঙ্গ করে নূতন পন্থায় সম্পূর্ণ নূতন নিয়মে সৃষ্টি করতে পারেন। তোমরা কি জাননা- কীভাবে আদম হাওয়াকে চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রমধর্মী নিয়মে পয়দা করেছেন? হযরত ঈসা (আঃ)কেও চিরাচরিত নিয়মের বিপরীত ব্যবস্থায় শুধু মায়ের গর্ভে বীর্য ছাড়া পয়দা করেছেন । সুতরাং নবী করিম (দঃ)কে ভিন্ন নিয়মে ভূমিষ্ঠ করানো অসম্ভব হবে কেন?

— আবদুল আউয়াল জৌনপুরী।

তিনি তো হায়াতুন্নবী! তিনি উম্মতের ভালমন্দ কর্ম ও চিন্তা-ধারণা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। হাদীসে পাকে এসেছে-

তোমাদের ভালমন্দ সব আমলই আমার নজরে আনা হয়।

সুতরাং নবী করিম (দঃ)-এর ব্যতিক্রমধর্মী বেলাদাত শরীফ সম্পর্কে কোনো ঈমানদারের মনে আর সন্দেহ থাকতে পারে না। কিতাবে প্রমাণ পাওয়া গেলে মানতে অসুবিধা কোথায়? আসলে এক ধরনের জ্ঞান পাপীরা সব সময়ই নবী করিম (দঃ) কে সাধারণ মানুষের সাথে তুলনা করতে আনন্দ বোধ করে, যেমন আনন্দবোধ করতো মক্কার কাফেরগণ। তারা বলতো “মুহাম্মদ (দঃ) তো আমাদের মতই একজন মানুষ”। এ ধরনের উক্তি কাফেররাই করে, কোনো মোমেন করতে পারে না। নবীজী বিনয়মূলক বলতে পারেন- “আমি তোমাদের ন্যায় মানুষ”- কিন্তু উম্মত একথা বলতে পারবে না, “তিনি আমাদের মতো মানুষ”।

সার কথা হলো- সাধারণ সন্তানগনের ভূমিষ্ঠ হওয়ার ধরন এক রকমের। অন্যান্য নবীগণের (আঃ) ভূমিষ্ঠ হওয়ার ধরন আরেক রকমের এবং আমাদের নবী করিম (দঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার ধরন অন্য নবীগণ থেকেও ভিন্ন।

সাধারণ ডাক্তারগণ বর্তমানকালে নরমাল ও সিজারিয়ান- এই দুই পদ্ধতিতেই সন্তান ভূমিষ্ঠ করাতে সক্ষম। সৃষ্টিকর্তার কুদরত কি এতই অক্ষম হয়ে গেলো? (নাউযুবিল্লাহ!) নবীগণের জন্ম-মৃত্যু ও জীবন পদ্ধতি সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত ধরনের হওয়াই যুক্তিযুক্ত। সব কিছুই যদি সাধারণ মানুষের ন্যায় হতো- তাহলে তাঁদেরকে মহামানব বলা হতো না। আল্লামা শরফুদ্দীন বছিরী-যিনি নবীজীর শানে কাছিদায়ে বুরদা লিখে দূরারোগ্য প্যারালাইসিস থেকে আশ্চর্যজনকভাবে মুক্তিলাভ করেছিলেন- তিনি তাঁর কাসিদায় বলেছেন-

মোহাম্মদ (দঃ) মানব জাতি হয়েও কোনো মানুষের মতই নন।

যেমন ‘ইয়াকুত’ পাথর জাতীয় হয়েও কোনো পাথরের মতই নয়

— কাসিদা বুরদা শরীফ

নবীজীর হাকীকত পরিচয় দিয়ে জনৈক উর্দু কবি বলেছেনঃ

হে প্রিয় রাসুল! আপনি তো খোদা নন যে- খোদা বলবো। আপনিই বলে দিন- আপনাকে কি নামে আখ্যায়িত করবো? কেননা, ঊর্ধ্বজগতেও আপনার মতো কেউ নেই এবং জমিনেও আপনার মতো কেউ নেই।

অর্থাৎ আপনার উদাহরণ আপনিই। নূরের ফেরেস্তা যে সীমায় গেলে জ্বরে পুড়ে যায়- সেখানে আপনি নিরাপদে বিচরণ করেছেন। বুঝা গেল- তিনি মাটির দেহধারী ছিলেন না- বরং নূরানী মহামানব।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)